নবুয়তপ্রাপ্তির আগে নবীজির পবিত্র চরিত্র, সততা ও জাহেলি যুগের মূর্তিপূজাসহ যাবতীয় পাপাচার থেকে দূরে থাকার গুণাবলি তাঁর সন্তানদের গভীরভাবে প্রভাবিত করেছিল।
ফলে ইসলামের দাওয়াত পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে নবীপত্নী খাদিজার মতো তাঁর চার কন্যা—জয়নব, উম্মে কুলসুম, ফাতিমা ও রুকাইয়া ইমান আনেন।
এভাবেই মহানবীর ঘর হয়ে ওঠে ইসলামের ইতিহাসে প্রথম মুমিন ও অনুগত পরিবার।
নবীর ঘরের অনন্য মর্যাদা
ইসলামের ইতিহাসে এই প্রথম পরিবারের গুরুত্ব অপরিসীম। মহান আল্লাহ এই ঘরকে ইমান, কোরআন তেলাওয়াত ও নামাজ কায়েমের ক্ষেত্রে অগ্রগণ্য হওয়ার অনন্য মর্যাদা দিয়েছেন। এই ঘরের বিশেষত্ব হলো:
হেরা গুহার পর এটিই প্রথম স্থান, যেখানে আসমানি ওহি পাঠ করা হয়েছে।
এটিই সেই ঘর, যা ইসলামের প্রথম মুমিন নারী খাদিজাকে আগলে রেখেছিল।
এই ঘরেই ইসলামের প্রথম নামাজ আদায় করা হয়েছে।
ইসলামের প্রথম তিন অগ্রপথিক—খাদিজা, আলী ও জায়েদ ইবনে হারিসা (রা.) এই ঘরেই একত্র হয়েছিলেন।
বড় থেকে ছোট, এই পরিবারের কোনো সদস্যই ইসলামের সহযোগিতায় পিছপা হননি।
তিনিই তোমাদের এক ব্যক্তি থেকে সৃষ্টি করেছেন এবং তার থেকে তার জোড়া সৃষ্টি করেছেন, যাতে সে তার কাছে শান্তি পায়।
এই পরিবারটি তাই কেয়ামত পর্যন্ত আসা মুসলিম উম্মাহর জন্য এক জীবন্ত আদর্শ। এখানে স্ত্রী ছিলেন পবিত্র ও বিশ্বস্ত পরামর্শদাতা; আশ্রিত ভ্রাতুষ্পুত্র আলী (রা.) ছিলেন একনিষ্ঠ সহযোগী; আর পালকপুত্র জায়েদ (রা.) ছিলেন একনিষ্ঠ সাহায্যকারী।
সামাজিক সংস্কারের ভিত্তি
ইসলামি দাওয়াতের আসমানি পদ্ধতি বলে যে সমাজ সংস্কারের প্রথম ধাপ হলো যোগ্য ব্যক্তি ও আদর্শ পরিবার গঠন করা। ব্যক্তি হলো একটি সামাজিক কাঠামোর ভিত্তিপ্রস্তর। যেহেতু একটি শিশু জন্মের পর পরিবারেই বেড়ে ওঠে, তাই পরিবারই তার ব্যক্তিত্ব ও চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য নির্ধারণ করে দেয়।
পরিবার হলো ব্যক্তি ও সমাজের মধ্যবর্তী সেতুবন্ধ। এই সেতুটি যদি মজবুত ও সুস্থ হয়, তবে ব্যক্তি ও সমাজ উভয়ই শক্তিশালী হয়। এ কারণে ইসলাম পরিবার গঠনের ওপর সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়েছে।
আল্লাহ–তাআলা বলেছেন, “তিনিই তোমাদের এক ব্যক্তি থেকে সৃষ্টি করেছেন এবং তার থেকে তার জোড়া সৃষ্টি করেছেন, যাতে সে তার কাছে শান্তি পায়।” (সুরা আরাফ, আয়াত: ১৮৯)
প্রতিটি নবজাতকই স্বভাবজাত ধর্মের ওপর জন্মগ্রহণ করে। এরপর তার বাবা-মা তাকে ইহুদি, খ্রিষ্টান বা অগ্নিপূজারি হিসেবে গড়ে তোলে।
একটি হাদিসে মহানবী (সা.) বলেছেন, “প্রতিটি নবজাতকই স্বভাবজাত ধর্মের (ফিতরাত) ওপর জন্মগ্রহণ করে। এরপর তার বাবা-মা তাকে ইহুদি, খ্রিষ্টান বা অগ্নিপূজারি হিসেবে গড়ে তোলে।” (সহিহ বুখারি, হাদিস: ১৩৫৮; সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২৬৫৮)
নবীজির কন্যাদের দ্রুত ইমান আনয়ন ছিল এই সুশিক্ষার প্রতিফলন।
ইসলাম প্রচারের সূচনা
ইসলামের সূচনালগ্নে প্রথম মুমিন হিসেবে একজন নারী (খাদিজা), একজন কিশোর (আলী) এবং একজন মুক্তদাসের (জায়েদ) অন্তর্ভুক্তি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। এটি প্রমাণ করে যে ইসলাম প্রচার কেবল নির্দিষ্ট কোনো শ্রেণির জন্য নয়, বরং নারী-পুরুষ, ছোট-বড়, মনিব-ভৃত্য সবার জন্য।
নারীর মর্যাদা ও সমাজের নতুন প্রজন্মের গুরুত্ব ইসলাম শুরু থেকেই প্রতিষ্ঠিত করেছে। একটি সুস্থ পরিবার থেকে শুরু করে একটি মানবিক সভ্যতা বিনির্মাণে সমাজের প্রতিটি স্তরের মানুষের যে ভূমিকা রয়েছে, নবীগৃহের সেই প্রথম সদস্যরাই তার শ্রেষ্ঠ উদাহরণ।
আজকের অস্থির সময়ে পারিবারিক শান্তি ও সামাজিক সংহতি ফিরিয়ে আনতে নবীগৃহের এই আদর্শ অনুসরণ করাই আমাদের প্রধান দায়িত্ব।