কোরআন যেভাবে জীবনের কথা বলে

ছবি: এআই / প্রথম আলো

ইমান, কুফর কিংবা আমলের প্রতিদান—দুনিয়ার জীবনে এসবের প্রকৃত রূপ বিষয় চোখে দেখা সম্ভব নয়। অথচ কোরআন এই বিমূর্ত বিষয়গুলো আমাদের চোখের সামনে পরিচিত দৃশ্যের মতো তুলে ধরেছে।

কখনো শস্যের মাধ্যমে দানের প্রতিদান, কখনো জমির মাধ্যমে অন্তরের অবস্থা, আবার কখনো মাকড়সার জাল ও বই বহনকারী গাধার মাধ্যমে মানুষের ভুল পথকে স্পষ্ট করেছে। এবার এমনই কয়েকটি উপমার মধ্য দিয়ে আমরা কোরআনকে বোঝার চেষ্টা করব।

১২. দানকারীর সওয়াবের উপমা

আল্লাহ-তাআলা বলেন, ‘যারা নিজেদের ধনসম্পদ আল্লাহর পথে ব্যয় করে, তাদের উপমা একটি বীজের মতো—যা সাতটি শিষ উৎপাদন করে, প্রতিটি শিষে ১০০ শস্যদানা। আর আল্লাহ যাকে ইচ্ছে বহু গুণে বৃদ্ধি করে দেন। আর আল্লাহ সর্বব্যাপী প্রাচুর্যময়, সর্বজ্ঞ।’ (সুরা বাকারা, আয়াত ২৬১)

যার অন্তর ভালো ও নরম, সে আল্লাহর কথা শুনে সহজেই ভালো কাজের দিকে এগিয়ে যায়। আর যার অন্তর শক্ত ও খারাপ, তাকে যতই ভালো কথা বলা হোক, তাতে খুব বেশি লাভ হয় না।

একটি বীজের মধ্যে যেমন বিপুল ফলনের সম্ভাবনা লুকিয়ে থাকে, আল্লাহর পথে ব্যয় করা সম্পদের মধ্যেও তেমনই রয়েছে বহুগুণ প্রতিদানের সম্ভাবনা।

এই আয়াতে দানকারীর সওয়াবকে একটি বীজের সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে, যা থেকে সাতটি শিষ জন্মে এবং প্রতিটি শিষে ১০০টি করে দানা থাকে। অর্থাৎ একটি দানের প্রতিদান ৭০০ গুণ পর্যন্ত হতে পারে; আল্লাহ চাইলে এর চেয়েও বহুগুণ বাড়িয়ে দিতে পারেন।

১৩. মানুষের অন্তরের উপমা

আল্লাহ-তাআলা বলেন, ‘উৎকৃষ্ট ভূমি তার প্রতিপালকের নির্দেশে ফসল উৎপন্ন করে, আর যে ভূমি নিকৃষ্ট, তাতে কঠোর পরিশ্রম না করলে কিছুই জন্মে না। এভাবে আমরা কৃতজ্ঞ সম্প্রদায়ের জন্য আমার আয়াতসমূহ বিভিন্নভাবে বর্ণনা করে থাকি।’ (সুরা আরাফ, আয়াত ৫৮)

এই আয়াতে আল্লাহ-তাআলা মানুষের অন্তরের অবস্থাকে জমির সঙ্গে তুলনা করেছেন। যার অন্তর ভালো ও নরম, সে আল্লাহর কথা শুনে সহজেই ভালো কাজের দিকে এগিয়ে যায়। আর যার অন্তর শক্ত ও খারাপ, তাকে যতই ভালো কথা বলা হোক, তাতে খুব বেশি লাভ হয় না।

যেমন উর্বর জমি অল্প বৃষ্টিতেই ফসল ফলায়, তেমনই ভালো মন অল্প উপদেশেই ভালো হয়ে যায়। অন্যদিকে অনুর্বর জমিতে অনেক মেহনত করলেও খুব সামান্য ফলন পাওয়া যায়।

আরও পড়ুন

১৪. জীবনের ক্ষণস্থায়িত্বের উপমা

আল্লাহ-তাআলা বলেন, ‘তাদের কাছে পার্থিব জীবনের এই উপমাও পেশ করুন যে তা বৃষ্টির পানির মতো—যা আমি আকাশ থেকে বর্ষণ করি, যা দ্বারা জমিনে গাছগাছড়া ঘন হয়ে উদ্‌গত হয়, অতঃপর তা এমন শুষ্ক খড়কুটায় পরিণত হয়, যা বাতাস উড়িয়ে নিয়ে যায়। আল্লাহ সব বিষয়ে পরিপূর্ণ ক্ষমতা রাখেন।’ (সুরা কাহফ, আয়াত ৪৫)

শুকনো জমিতে বৃষ্টি হলে যেমন অল্প সময়ের মধ্যেই গাছগাছড়া ঘন হয়ে ওঠে, কিছুদিন পর সেই গাছপালাই আবার শুকিয়ে খড়কুটায় পরিণত হয়। এই আয়াতে আল্লাহ-তাআলা দুনিয়ার জীবনকে উদ্ভিদের এই জীবনচক্রের সঙ্গে তুলনা করেছেন।

মানুষও শৈশব পেরিয়ে যৌবনে শক্তি ও সৌন্দর্যের পূর্ণতা লাভ করে; কিন্তু সময়ের সঙ্গে তা কমে আসে, একদিন মৃত্যু সবকিছুর সমাপ্তি ঘটায়। তাই ক্ষণস্থায়ী জীবনের সৌন্দর্যে মুগ্ধ না হয়ে স্থায়ী জীবনের জন্য প্রস্তুত হওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ।

মানুষ আল্লাহ ছাড়া অন্য কাউকে অভিভাবক ধারণা করে, তাদের এই ধারণা মাকড়সার জালের মতোই দুর্বল। তারা মনে করে, বিপদে সেই মিথ্যা অভিভাবক তাদের সাহায্য করে, তাদের রক্ষা করবে।

১৫. মিথ্যা আশ্রয়ের উপমা

আল্লাহ-তাআলা বলেন, ‘যারা আল্লাহ ছাড়া অন্যকে অভিভাবকরূপে গ্রহণ করে, তাদের উদাহরণ মাকড়সার মতো, যে ঘর বানায়। আর ঘরের মধ্যে মাকড়সার ঘরই তো দুর্বলতম, যদি তারা জানত।’ (সুরা আনকাবুত, আয়াত ৪১)

এই আয়াতে আল্লাহ ছাড়া অন্যের ওপর নির্ভর করাকে মাকড়সার দুর্বল ঘরের সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে। মাকড়সা নিজের জন্য ঘর বানায়, কিন্তু সেই ঘর সামান্য আঘাতেই ছিঁড়ে যায়।

একইভাবে যেসব মানুষ আল্লাহ ছাড়া অন্য কাউকে অভিভাবক ধারণা করে, তাদের এই ধারণা মাকড়সার জালের মতোই দুর্বল। তারা মনে করে, বিপদে সেই মিথ্যা অভিভাবক তাদের সাহায্য করে, তাদের রক্ষা করবে; কিন্তু যখন সত্যিই বিপদ আসে, তখন সেই আশ্রয়ের অসারতা স্পষ্ট হয়ে যায়।

১৬. কাফেরের জীবনযাপনের উপমা

‘আর যারা কুফরি করেছে, তারা ভোগ-বিলাসে মত্ত থাকে এবং আহার করে, যেমন আহার করে চতুষ্পদ জন্তু; আর জাহান্নামই তাদের আবাসস্থল।’ (সুরা মুহাম্মদ, আয়াত ১২)

ইসলাম মানুষের জীবনকে উদ্দেশ্যময় করে তোলে। তার ইহজীবনকে পরজীবনের সঙ্গে এমনভাবে সম্পৃক্ত করে—তার ভোগ-বিলাস ও মৌজ-মাস্তির কোনো ফুরসত থাকে না। তার প্রতিটি পদক্ষেপই হয় তাকওয়ার সঙ্গে।

আরও পড়ুন

অন্যদিকে কাফেরদের জীবনযাপন একেবারে আলাদা। চতুষ্পদ প্রাণীর যেমন কাজ শুধু খাওয়া, ঘুমানো আর প্রজন্ম টিকিয়ে রাখা; তাদেরও কাজ ঠিক তেমনই।

তাদের সামনে পরজীবন নেই, তাই ইহজীবনকে ভোগ-বিলাস ছাড়া আর কোনো কাজে লাগাতে পারে না। তারা ঠিকই আল্লাহর নেয়ামত ভোগ করে, কিন্তু জীবনের উদ্দেশ্য ও পরিণতি নিয়ে ভাবে না।

১৭. ইসলামের বিকাশের উপমা

আল্লাহ-তাআলা বলেন, ‘মুহাম্মদ আল্লাহর রাসুল; আর তার সহচরগণ কাফেরদের প্রতি কঠোর, নিজেদের মধ্যে পরস্পর সহানুভূতিশীল। তুমি তাদেরকে আল্লাহর অনুগ্রহ ও সন্তুষ্টি কামনায় রুকু ও সেজদায় অবনত দেখতে পাবে। তাদের আলামত হলো, তাদের মুখমণ্ডলে সেজদার প্রভাব থাকবে। তাওরাতে তাদের বিবরণ এমনই। আর ইঞ্জিলে তাদের দৃষ্টান্ত হলো এমন একটি চারাগাছের মতো, যা থেকে প্রথমে কচি পাতা বের হয়, তারপর তা শক্ত ও পুষ্ট হয় এবং পরিশেষে নিজের কাণ্ডের ওপর দৃঢ়ভাবে দাঁড়ায়, যা চাষির মন ভরিয়ে দেয়—যাতে এদের মাধ্যমে কাফেরদের অন্তর্জ্বালা সৃষ্টি করা যায়। তাদের মধ্যে যারা ইমান আনে ও সৎকর্ম করে, আল্লাহ তাদের জন্য ক্ষমা ও মহাপুরস্কারের ওয়াদা করেছেন।’ (সুরা ফাতহ, আয়াত: ২৯)

একটি চারা গাছ প্রথমে খুবই ছোট ও কোমল থাকে। সময়ের সঙ্গে তার কচি পাতা বের হয়, কাণ্ড শক্ত হয় এবং একসময় তা দৃঢ়ভাবে দাঁড়িয়ে যায়। এই আয়াতে সাহাবিদের মাধ্যমে ইসলামের বিকাশকে সেই চারা গাছের সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে।

শুরুতে মুসলমানরা ছিলেন অল্পসংখ্যক ও দুর্বল; কিন্তু ইমান, আমল ও পারস্পরিক ভালোবাসার মাধ্যমে তারা ধীরে ধীরে শক্তিশালী হয়ে উঠেছেন।

গাধার পিঠে যত বইয়ের বোঝাই চাপানো হোক, সে বইয়ের ভেতরের কথা কিছুই জানে না; তার কাছে সবই শুধু বোঝা। কিতাবের জ্ঞান অর্জন করেও যারা সে অনুযায়ী আমল করে না, তাদের এমন গাধার সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে।

১৮. গাধা দিয়ে কিতাবি এলেমের উপমা

আল্লাহ-তাআলা বলেন, ‘যাদেরকে তাওরাতের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল, কিন্তু তারা তা বহন করেনি, তাদের দৃষ্টান্ত সেই গাধার মতো, যে বহু বইয়ের বোঝা বহন করে। কতই না নিকৃষ্ট সেই জাতির দৃষ্টান্ত, যারা আল্লাহর আয়াতসমূহকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করেছে! আর আল্লাহ জালেম সম্প্রদায়কে সঠিক পথ প্রদর্শন করেন না।’ (সুরা জুমুআ, আয়াত ৫)

এখানে মূলত ইহুদিদের কথা বলা হয়েছে। তাদের তাওরাতের এলেম ও দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল, কিন্তু তারা সেই কিতাবের শিক্ষা অনুযায়ী জীবন পরিচালনা করেনি। গাধার পিঠে যত বইয়ের বোঝাই চাপানো হোক, সে বইয়ের ভেতরের কথা কিছুই জানে না; তার কাছে সবই শুধু বোঝা।

এই আয়াতে কিতাবের জ্ঞান অর্জন করেও যারা সে অনুযায়ী আমল করে না, তাদের এমন গাধার সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে। অর্থাৎ শুধু কিতাব পড়া, মুখস্থ করা বা জ্ঞান অর্জন করাই যথেষ্ট নয়; সেই জ্ঞান জীবনে কাজে লাগানোই আসল। এলেম যদি মানুষকে আমলের দিকে না নেয়, তাহলে তা তার জন্য শুধু বোঝা হয়েই থাকে।

  • মওলবি আশরাফ: আলেম, লেখক ও অনুবাদক

    [email protected]

আরও পড়ুন