মদিনা মুনাওয়ারা—যে মাটির ধূলিকণায় রাসুল (সা.) ও তাঁর মহান সাহাবিদের পদচিহ্ন আঁকা, যে নগরী থেকে বিশ্বময় ছড়িয়ে পড়েছিল তাওহিদের আলো, সেই মদিনায় উপস্থিত হওয়া একজন মুমিনের জীবনে পরম সৌভাগ্যের বিষয়। কেউ মক্কায় গেলে রাসুলের পবিত্র রওজা জিয়ারতের সুযোগ হাতছাড়া করা অত্যন্ত বেদনার।
হাদিসে রাসুল (সা.) জিয়ারতের গভীর গুরুত্ব তুলে ধরে ইরশাদ করেছেন, ‘যে ব্যক্তি আমার রওজা জিয়ারত করল, তার জন্য আমার শাফায়াত অবধারিত হয়ে গেল’ (সুনানে দারাকুতনি, হাদিস: ২৬৯৫)
রওজার সামনে কোনো ধরনের উচ্চবাচ্য করা, ছবি বা সেলফি তোলার উন্মাদনায় মগ্ন হওয়া কিংবা পেছনে থাকা মানুষকে ঠেলে ভিড় তৈরি করা কঠোরভাবে পরিহার করতে হবে।
ভালোবাসার সফর
মদিনার পথে যাত্রা শুরু করার পর থেকেই অন্তরে নবীপ্রেম ও শ্রদ্ধা জাগ্রত রাখা বাঞ্ছনীয়। পথের পুরোটা সময় অধিক পরিমাণে দরুদ শরিফ পাঠ, ইস্তিগফার ও আত্মশুদ্ধির ভাব বজায় রাখা এই সফরের প্রধান পাথেয়।
ইসলামের মনীষীরা এই পুণ্যভূমিতে প্রবেশের সময় গভীর বিনম্রতা বজায় রাখতেন। বর্তমান সময়ে উড়োজাহাজ, দ্রুতগতির ট্রেন বা বাসে চড়ে যাতায়াত স্বাভাবিক বিষয়; তবে বাহন যা–ই হোক না কেন, অন্তরের অবস্থান যেন সর্বদা শ্রদ্ধা, বিনয় ও সমর্পণে পূর্ণ থাকে।
মসজিদে নববি ও ‘রিয়াজুল জান্নাহ’
মদিনায় পৌঁছার পর দুনিয়াবি অনর্থক কথাবার্তা ও কোলাহল এড়িয়ে অন্তরকে আল্লাহর জিকির ও দরুদে নিবিষ্ট রাখা উচিত। উত্তম ও পরিচ্ছন্ন পোশাকে মসজিদে নববিতে প্রবেশ করা সুন্নাহ।
মসজিদে নববির অনন্য মর্যাদা সম্পর্কে রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘আমার এই মসজিদে এক রাকাত নামাজ আদায় করা অন্য যেকোনো মসজিদে এক হাজার রাকাত নামাজ আদায়ের চেয়েও উত্তম; কেবল মসজিদে হারাম ছাড়া।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ১১৯০)
মসজিদে নববির ভেতরে রয়েছে পৃথিবীর বুকে বেহেশতের এক টুকরা অংশ—‘রিয়াজুল জান্নাহ’। রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘আমার ঘর ও আমার মিম্বরের মধ্যবর্তী স্থানটি বেহেশতের একটি অন্যতম বাগান।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ১১৯৬)
আমার ঘর ও আমার মিম্বরের মধ্যবর্তী স্থানটি বেহেশতের একটি অন্যতম বাগান।
এই বরকতময় স্থানে নফল নামাজ ও দোয়া করার সুযোগ পাওয়া পরম সৌভাগ্যের। তবে এই সুযোগ পেতে গিয়ে কোনোভাবেই ধাক্কাধাক্কি করা বা অন্য কোনো মুসল্লিকে সামান্যতম কষ্ট দেওয়া যাবে না। কারণ, ইবাদতের মূল সৌন্দর্যই হলো স্থিরতা, বিনম্রতা ও পারস্পরিক সম্মান।
মসজিদে নববিতে নিয়মিত জামাতে নামাজ আদায়ের বিশেষ ফজিলত রয়েছে। হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, ‘যে ব্যক্তি আমার মসজিদে একাধারে চল্লিশ ওয়াক্ত নামাজ জামাতের সঙ্গে আদায় করবে এবং কোনো ওয়াক্ত ছুটে যাবে না, তার জন্য জাহান্নাম ও আজাব থেকে মুক্তি এবং মুনাফেকি থেকে নিষ্কৃতি লিখে দেওয়া হবে।’ (মুসনাদে আহমাদ, হাদিস: ১২৫৮৩)
রওজার পাশে দাঁড়ানোর আদব
রওজা মুবারকের সামনে দাঁড়ানোর মুহূর্তটি প্রত্যেক মুমিনের জীবনের সবচেয়ে আবেগঘন ও স্পর্শকাতর সময়। সেখানে দাঁড়িয়ে চরম ভাবগাম্ভীর্য ও নিম্নস্বরে রাসুলের প্রতি দরুদ ও সালাম পেশ করতে হবে।
পবিত্র কোরআনে নববি দরবারের আদব শিক্ষা দিতে গিয়ে আল্লাহ–তাআলা নির্দেশ দিয়েছেন, ‘হে মুমিনগণ, তোমরা নবীর কণ্ঠের ওপর নিজেদের কণ্ঠ উঁচু কোরো না...’ (সুরা হুজুরাত, আয়াত: ২)
অতএব রওজার সামনে কোনো ধরনের উচ্চবাচ্য করা, ছবি বা সেলফি তোলার উন্মাদনায় মগ্ন হওয়া কিংবা পেছনে থাকা মানুষকে ঠেলে ভিড় তৈরি করা কঠোরভাবে পরিহার করতে হবে।
রাসুলকে সালাম পেশ করার পর পাশে শায়িত ইসলামের প্রথম খলিফা আবু বকর সিদ্দিক ও দ্বিতীয় খলিফা ওমর ইবনুল খাত্তাবের (রা.) প্রতিও সম্মান ও সালাম জানানো জিয়ারতের অন্তর্ভুক্ত।
মদিনা সফরের প্রকৃত সার্থকতা কেবল আবেগ প্রকাশ বা স্মৃতি রোমন্থনে সীমাবদ্ধ নয়; বরং এই সফরের মূল লক্ষ্য হলো জীবনকে রাসুলের আদর্শে নতুন করে ঢেলে সাজানো।
মদিনা সফরের প্রকৃত সার্থকতা
মদিনা সফরের প্রকৃত সার্থকতা কেবল আবেগ প্রকাশ বা স্মৃতি রোমন্থনে সীমাবদ্ধ নয়; বরং এই সফরের মূল লক্ষ্য হলো জীবনকে রাসুলের আদর্শে নতুন করে ঢেলে সাজানো।
মদিনা থেকে ফিরে আসার পর যদি কারও চরিত্রে বিনম্রতা না আসে, নামাজে অবহেলা দূর না হয় এবং তাঁর আচরণে সুন্নাহর প্রতিফলন না ঘটে, তবে সেই সফরের আত্মিক উদ্দেশ্য অপূর্ণই থেকে যায়।
মদিনা আমাদের শেখায়, নবীপ্রেম নিছক কথার ফুলঝুরি নয়, নবীপ্রেম হলো সুন্নতের পরিপূর্ণ অনুবর্তন। রওজার সামনে দাঁড়িয়ে চোখে অশ্রু ঝরার চেয়েও বড় প্রমাণ হলো ঘরে ফিরে নববি আখলাকে নিজের ব্যক্তিগত, পারিবারিক ও সামাজিক জীবনকে পরিচালিত করা।
আহমাদ সাব্বির: লেখক ও গবেষক