দেহ ও মন সুস্থ রাখতে ইসলামের ৫টি মৌলিক শিক্ষা

ছবি: পেক্সেলস


আল্লাহ–তাআলা মানবজাতিকে সৃষ্টি করেছেন একমাত্র তাঁর ইবাদত-বন্দেগি করার জন্য। আর এই ইবাদত যথাযথভাবে সম্পাদন করার জন্য শারীরিক ও মানসিকভাবে সুস্থ থাকা জরুরি।

সুস্থ না থাকলে মানুষ ঠিকমতো পার্থিব কাজ যেমন করতে পারে না, তেমনি ধর্মীয় দায়িত্বও পালন করতে পারে না। নিজেকে সুস্থ রাখার প্রথম শর্ত হলো স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা।

সুস্বাস্থ্য বজায় রাখতে এবং রোগব্যাধি প্রতিরোধ করতে শরিয়ত কিছু মৌলিক নিয়মনীতি নির্ধারণ করেছে, যা মানবজীবনের জন্য অপরিহার্য।

১.. পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা

ব্যক্তিগত, পারিবারিক ও সামাজিক জীবনে সুস্বাস্থ্য বজায় রাখতে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার ভূমিকা অপরিসীম। শরীর, পোশাক, বাসস্থান ও আশপাশের পরিবেশ পরিষ্কার রাখলে জীবাণুর বিস্তার রোধ হয় এবং বিভিন্ন সংক্রামক রোগ থেকে সুরক্ষা পাওয়া যায়।

পরিচ্ছন্নতা মানুষের শারীরিক সুস্থতার পাশাপাশি মানসিক প্রশান্তি ও কর্মক্ষমতাও বৃদ্ধি করে। দৈহিক পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতাকে ইসলাম স্বভাবজাত বিষয় হিসেবে আখ্যায়িত করেছে।

হাদিসে বলা হয়েছে, ‘দশটি বিষয় মানুষের স্বভাবজাত (ফিতরাত)। ১. গোঁফ ছোট করা, ২. দাড়ি বৃদ্ধি করা, ৩. মিসওয়াক করা, ৪. নাকে পানি দিয়ে পরিষ্কার করা, ৫. নখ কাটা, ৬. আঙুলের গিঁট ও ভাঁজে জমে থাকা ময়লা পরিষ্কার করা, ৭. বগলের লোম উপড়ে ফেলা, ৮. নাভির নিচের অবাঞ্ছিত লোম অপসারণ করা, ৯. পানি দ্বারা পবিত্রতা অর্জন করা এবং ১০. (বর্ণনাকারী বলেন) দশম বিষয়টি আমি ভুলে গেছি; তবে সম্ভবত তা ছিল কুলি করা।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২৬১)

আরও পড়ুন

২. হালাল ও স্বাস্থ্যকর খাদ্য আহার করা

আল্লাহ–তাআলাই ভালো জানেন মানুষের স্বাস্থ্যের জন্য কোনটি উপকারী এবং কোনটি অপকারী। তাই যাবতীয় উপকারী ও স্বাস্থ্যকর খাদ্য তিনি আমাদের জন্য হালাল করেছেন, আর যা স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর তা করেছেন হারাম।

কোরআনে বলেছেন, ‘তাদের জন্য যাবতীয় সুস্বাদু ও স্বাস্থ্যকর বস্তু হালাল ঘোষণা করেন এবং যাবতীয় ঘৃণ্য ও ক্ষতিকর বস্তু হারাম করে দেন।’ (সুরা আরাফ, আয়াত: ১৫৭)

হালাল খেলে মানুষের শরীর সুস্থ থাকে এবং মন শক্তিশালী হয়। আর হারামটা খেলে স্বাস্থ্য নষ্ট হয় এবং আত্মিক পবিত্রতা ক্ষুণ্ন হয়।

তাই ইসলাম আমাদের জন্য গরু, মহিষ ও ভেড়ার গোশত হালাল করেছে, যা স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী। আর শূকর, কুকুর ও অন্যান্য হিংস্র প্রাণী হারাম করেছে, যা স্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর।

সুতরাং হালাল-হারামের বিধান কেবল ইবাদতের বিষয়ই নয়; বরং মানবজীবনের শারীরিক ও মানসিক সুস্থতা নিশ্চিত করার এক মহান ঐশী ব্যবস্থা।

৩. নেশাজাতীয় দ্রব্য বর্জন করা

স্বাস্থ্যকে অটুট রাখতে হলে মাদকদ্রব্য পুরোপুরি পরিহার করতে হবে। মদ্যপান ও মাদক গ্রহণের ফলে ধীরে ধীরে মানুষের হজমশক্তি বিনষ্ট হয়, খাওয়ার রুচি কমে যায়, চেহারা বিকৃত হয়ে পড়ে এবং স্নায়বিক ও শারীরিক শক্তি দুর্বল হয়ে আসে।

এটি মানুষের লিভার ও কিডনিকে সম্পূর্ণ অকেজো করে ফেলে, শ্বাসনালিতে সংক্রমণ ঘটায় এবং জ্ঞান-বুদ্ধি লোপ করে দেয়। তাই স্বাস্থ্য, শরীর ও মেধাকে সুরক্ষায় ইসলাম মাদকদ্রব্য বর্জনের কঠোর নির্দেশ দিয়েছে।

কোরআনে বলা হয়েছে, ‘হে মুমিনগণ, নিশ্চয়ই মদ, জুয়া, প্রতিমা ও ভাগ্যনির্ধারক শরসমূহ অপবিত্র, শয়তানি কাজ। সুতরাং এসব পরিহার করো, যাতে তোমরা কল্যাণপ্রাপ্ত হও।’ (সুরা মায়েদা, আয়াত: ৯০)

আরও পড়ুন

৪. পরিমিত খাদ্য গ্রহণ

স্বাস্থ্য সুরক্ষায় নিয়ন্ত্রিত খাদ্যাভ্যাস গড়ে তোলা জরুরি। মাত্রাতিরিক্ত খাদ্য গ্রহণ স্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। পাকস্থলীর একটি নির্দিষ্ট ধারণক্ষমতা আছে; যখন তা অতিরিক্ত খাবারে পূর্ণ হয়ে যায়, তখন তার হজমক্ষমতা দুর্বল হয়ে পড়ে। ফলে বদহজমসহ পেটের নানা রোগ সৃষ্টি হয়।

তাই হাদিসে পরিমিত খাবারের প্রতি উৎসাহ প্রদান করা হয়েছে এবং এর চমৎকার বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিও বর্ণনা করে দেওয়া হয়েছে।

বলা হয়েছে, ‘উদর অপেক্ষা নিকৃষ্টতর কোনো পাত্র মানুষ পূর্ণ করে না। আদম সন্তানের জন্য ততটুকু খাদ্যই যথেষ্ট, যতটুকুতে তার পিঠ সোজা থাকে। আর যদি এর চেয়ে বেশি খেতেই হয়, তবে সে যেন তার পেটের এক-তৃতীয়াংশ আহারের জন্য, এক-তৃতীয়াংশ পানির জন্য এবং অন্য আর এক-তৃতীয়াংশ শ্বাস-প্রশ্বাসের জন্য রাখে।’ (সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদিস: ৩৩৪৯)

ভরা পেটে না খাওয়া, ক্ষুধা নিয়ে খেতে বসা এবং কিছুটা ক্ষুধা থাকতেই খাবার শেষ করা হলো ইসলামের দৃষ্টিতে সর্বোত্তম স্বাস্থ্যবিধি।

৫. পর্যাপ্ত ঘুম ও বিশ্রাম

ঘুম মানুষের দেহ ও মস্তিষ্ককে বিশ্রাম দেয়, কর্মক্ষমতা বৃদ্ধি করে এবং রোগ প্রতিরোধে সহায়তা করে। আল্লাহ–তাআলা ঘুমকে তাঁর একটি বিশেষ নেয়ামত হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, ‘আর আমি তোমাদের ঘুমকে করেছি বিশ্রামের মাধ্যম।’ (সুরা নাবা, আয়াত: ৯)

এই আয়াত থেকে বোঝা যায়, ঘুম মানুষের ক্লান্তি দূর করে দেহ-মনকে পুনরায় সতেজ করে তোলে।

নবীজি (সা.) বলেন, ‘নিশ্চয়ই তোমার ওপর তোমার চক্ষুর হক বা অধিকার রয়েছে।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ১১৫৩)

এই বাক্যের মনস্তাত্ত্বিক মর্ম হলো—চোখ ও শরীরকে তার প্রাপ্য বিশ্রাম দিতে হবে, অতিরিক্ত জাগরণ বা কষ্টের মধ্যে ফেলা যাবে না; বরং ইবাদত, কাজ ও বিশ্রামের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখতে হবে।

তাই সুস্বাস্থ্য, কর্মক্ষমতা ও ইবাদতে একাগ্রতা অর্জনের জন্য প্রত্যেক মুসলিমের উচিত নিয়মিত ও পর্যাপ্ত ঘুমের অভ্যাস গড়ে তোলা।

ইসলামের নির্দেশিত এসব স্বাস্থ্যবিধি অনুসরণ করলে মানুষ একটি সুস্থ, কর্মক্ষম ও সুশৃঙ্খল জীবন যাপন করতে পারে। শরীর ও মন ভালো থাকলে তবেই সুন্দরভাবে দুনিয়াবি কাজকর্ম এবং পরকালীন পাথেয় অর্জন সম্ভব।

  • মুফতি ইউসুফ এমদাদী : শিক্ষক, মারকাযু ফয়জিল কুরআন আল ইসলামী, ঢাকা

আরও পড়ুন