বৃষ্টি: ব্যবহারিক উপকারিতা ও নবীজির সুন্নাহ

নতুন বৃষ্টির পানি গায়ে লাগানো সুন্নতছবি: পেক্সেলস

ছোটবেলায় বৃষ্টি নামলেই বড়রা সতর্ক করতেন, ‘খবরদার, ভিজিস না; ঠান্ডা লাগবে, জ্বর হবে।’ অথচ কাজের প্রয়োজনে সেই মুরব্বিদেরই বৃষ্টি মাথায় নিয়ে ছুটতে হতো।

গ্রামীণ জীবনের কিষান-কিষানিরা রোদে পুড়ে, বৃষ্টিতে ভিজেই জীবন কাটিয়েছেন। প্রকৃতির সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে থাকায় কেবল বৃষ্টিতে ভিজে তাঁরা বারবার অসুস্থ হচ্ছেন—এমন দৃশ্য খুব একটা দেখা যেত না।

শৈশবের সেই দিনগুলোয় মায়েদের বৃষ্টির পানি ধরে রাখার এক অদ্ভুত তাগিদ দেখা যেত। টিনের চালার নিচে হাঁড়ি, পাতিল, গামলা পেতে পানি জমিয়ে রাখা হতো রান্নাবান্নার জন্য।

তখন হয়তো এর পেছনে বৈজ্ঞানিক যুক্তি জানা ছিল না, তবে অভিজ্ঞতালব্ধ জ্ঞানে সবাই বুঝতেন, বৃষ্টির পানির নিজস্ব একটি বিশুদ্ধতা ও বিশেষ গুণ রয়েছে।

বর্তমান শিল্পায়িত ও জনবহুল নগরে বাতাসে ধুলাবালি, ধোঁয়া ও রাসায়নিক দূষণ অনেক বেশি। ফলে আকাশ থেকে নামার সময় বৃষ্টির ফোঁটা সেই দূষিত উপাদানগুলোর কিছু অংশ সঙ্গে নিয়ে আসে।

বৃষ্টির পানি কি সম্পূর্ণ নিরাপদ?

বিজ্ঞানীদের মতে, বৃষ্টির পানি প্রাকৃতিকভাবে বিশুদ্ধ (সফ্‌ট ওয়াটার)। এতে মাটির নিচের পানির মতো অতিরিক্ত ক্ষতিকর খনিজ, অতিরিক্ত আয়রন কিংবা ক্লোরিন থাকে না।

তবে বর্তমান শিল্পায়িত ও জনবহুল নগরে বাতাসে ধুলাবালি, ধোঁয়া ও রাসায়নিক দূষণ অনেক বেশি। ফলে আকাশ থেকে নামার সময় বৃষ্টির ফোঁটা সেই দূষিত উপাদানগুলোর কিছু অংশ সঙ্গে নিয়ে আসে।

ঢাকার মতো বড় শহরে বৃষ্টি শুরুর প্রথম ১৫-২০ মিনিটের পানি পান বা রান্নায় ব্যবহারের জন্য সংগ্রহ না করাই শ্রেয়। প্রথম পশলা বৃষ্টিতে বাতাসের ভাসমান দূষিত কণাগুলো ধুয়ে যাওয়ার পর পরিষ্কার পাত্রে পানি সংগ্রহ করা উচিত।

এরপরও তা ফুটিয়ে বা যথাযথভাবে ফিল্টার করে ব্যবহার করা সবচেয়ে নিরাপদ।

আরও পড়ুন

কোরআনে বৃষ্টির পবিত্রতার কথা

পবিত্র কোরআনে বৃষ্টির পানিকে ‘মা-আন মুবারাকা’ (বরকতময় পানি) এবং ‘মা-আন তহুরা’ (পবিত্রকারী পানি) হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছে। বলা হয়েছে, ‘আর আমি আকাশ থেকে বরকতময় পানি বর্ষণ করি, অতঃপর তা দিয়ে উদ্যান ও কর্তনযোগ্য শস্যদানা উৎপন্ন করি।’ (সুরা কাফ, আয়াত: ৯)।

অন্যত্র বলা হয়েছে, ‘এবং তিনি আকাশ থেকে তোমাদের ওপর পানি বর্ষণ করেন, যেন তা দিয়ে তোমাদের পবিত্র করতে পারেন এবং তোমাদের থেকে শয়তানের অপবিত্রতা দূর করতে পারেন।’ (সুরা আনফাল, আয়াত: ১১)

বোঝা যায়, বৃষ্টির পানি আত্মিক ও বাহ্যিক উভয় দিক থেকেই পবিত্র ও কল্যাণময়।

তিনিই বৃষ্টির পূর্বে সুসংবাদস্বরূপ বাতাস প্রেরণ করেন... অতঃপর আমি তা দ্বারা মৃত মাটিকে সজীব করি। এভাবেই আমি মৃতদের জীবিত করব, যাতে তোমরা শিক্ষা গ্রহণ করো।
সুরা আরাফ, আয়াত: ৫৭

বৃষ্টির সময় নবীজির আমল

রাসুল (সা.) বৃষ্টির আগমনকে আল্লাহর সান্নিধ্যের এক বিশেষ মুহূর্ত হিসেবে গ্রহণ করতেন। বৃষ্টির সময় বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ সুন্নাহ প্রমাণিত রয়েছে:

শরীরে বৃষ্টির ছোঁয়া লাগানো: নতুন বৃষ্টির পানি স্পর্শ করা সুন্নত। একবার বৃষ্টি শুরু হলে নবীজি তাঁর গায়ের চাদর সরিয়ে শরীরের কিছু অংশ উন্মুক্ত করে বৃষ্টিতে ভেজান। সাহাবিরা কারণ জানতে চাইলে তিনি বললেন, ‘কারণ, এটি এইমাত্র আমার প্রতিপালকের পক্ষ থেকে নবসৃষ্ট হয়ে এসেছে।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ৮৯৮)

উপকারী বৃষ্টির দোয়া পাঠ: বৃষ্টি শুরু হলে নবীজি (সা.) দোয়া করতেন, ‘আল্লাহুম্মা সায়্যিবান নাফিআ’ (হে আল্লাহ, এই বৃষ্টিকে আমাদের জন্য ফলপ্রসূ ও উপকারী করে দিন)। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ১০৩২)

দোয়া কবুলের সুযোগ গ্রহণ: বৃষ্টি বর্ষণের সময়কে দোয়া কবুলের বিশেষ মুহূর্ত হিসেবে হাদিসে উল্লেখ করা হয়েছে। রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘দুইটি সময়ের দোয়া কখনো ফিরিয়ে দেওয়া হয় না অথবা খুব কম প্রত্যাখ্যাত হয়—আজানের সময়ের দোয়া এবং যখন বৃষ্টির ধারা বর্ষিত হতে থাকে।’ (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস: ২৫৪০)

আরও পড়ুন

মেঘের গর্জনে দোয়া ও ভয়: আকাশ মেঘাচ্ছন্ন হলে বা বিজলি চমকালে নবীজি (সা.) পূর্ববর্তী জাতির ওপর আসা আজাবের কথা স্মরণ করে চিন্তিত হতেন এবং দোয়া পড়তেন, ‘সুবহানাল্লাজি ইউসাব্বিহুর রা’দু বিহামদিহি ওয়াল মালাইকাতু মিন খিফাতিহ’ (পবিত্র সেই সত্তা, যাঁর প্রশংসার তাসবিহ পাঠ করে বজ্র এবং ফেরেশতাগণ তাঁর ভয়ে কম্পিত হয়)। (আল-আদাবুল মুফরাদ, হাদিস: ৭২৩)

অতিবৃষ্টির সময় দোয়া: বৃষ্টি যদি ক্ষতির কারণ বা অতিবৃষ্টির রূপ নেয়, তবে নবীজি (সা.) দোয়া করতেন, ‘আল্লাহুম্মা হাওয়ালাইনা ওয়ালা আলাইনা’ (হে আল্লাহ, আমাদের আশপাশে বর্ষণ করুন, আমাদের ধ্বংসের জন্য আমাদের ওপর নয়)। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ১০১৪)

বৃষ্টি শেষে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ: বৃষ্টি থেমে যাওয়ার পর আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে বলা সুন্নত, ‘মুতিরনা বিফাদলিল্লাহি ওয়া রাহমাতিহ’ (আমরা আল্লাহর দয়া ও অনুগ্রহের মাধ্যমে বৃষ্টিপ্রাপ্ত হয়েছি)। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৮৪৬)

অজু, গোসল কিংবা দৈনন্দিন পবিত্রতা অর্জনের ক্ষেত্রে বৃষ্টির পানি সম্পূর্ণ শুদ্ধ। অতীতে নবীজি ও সাহাবিদের যুগে উন্মুক্ত জলাশয়ে কিংবা পাত্রে বৃষ্টির পানি ধরে রেখে ব্যবহার করার রেওয়াজ ছিল।

বৃষ্টির পানি সংগ্রহ

ইসলামি ফিকহের দৃষ্টিতে বৃষ্টির পানি স্বয়ং সম্পূর্ণ পবিত্র এবং অন্য বস্তুকে পবিত্র করার গুণসম্পন্ন। অজু, গোসল কিংবা দৈনন্দিন পবিত্রতা অর্জনের ক্ষেত্রে বৃষ্টির পানি সম্পূর্ণ শুদ্ধ। অতীতে নবীজি ও সাহাবিদের যুগে উন্মুক্ত জলাশয়ে কিংবা পাত্রে বৃষ্টির পানি ধরে রেখে ব্যবহার করার রেওয়াজ ছিল।

তবে বর্তমান যুগে শহরের বাতাসে ধুলা ও ধোঁয়া বেশি থাকায় প্রথম কিছু সময়ের বৃষ্টি এড়িয়ে পরবর্তীতে পরিষ্কার পাত্রে পানি সংরক্ষণ করে ব্যবহার করা পরিচ্ছন্নতার দিক থেকেও উত্তম।

পুনরুত্থানের জীবন্ত পাঠ

বৃষ্টির সবচেয়ে বড় ধর্মীয় দর্শন হলো মৃত মাটির পুনরুজ্জীবন দেখে আখেরাতের ওপর বিশ্বাস দৃঢ় করা। শুষ্ক ও প্রাণহীন মাটি যেমন সামান্য বৃষ্টির ছোঁয়ায় সজীব হয়ে ওঠে, তেমনি কেয়ামতের দিন সব মানুষকে কবর থেকে পুনরায় জীবিত করা হবে।

আল্লাহ বলেন, ‘তিনিই বৃষ্টির পূর্বে সুসংবাদস্বরূপ বাতাস প্রেরণ করেন... অতঃপর আমি তা দ্বারা মৃত মাটিকে সজীব করি। এভাবেই আমি মৃতদের জীবিত করব, যাতে তোমরা শিক্ষা গ্রহণ করো।’ (সুরা আরাফ, আয়াত: ৫৭)

আরও পড়ুন