বৃষ্টি মহান আল্লাহর এক অপার মহিমা ও জীবনের স্পন্দন। পবিত্র কোরআনে বৃষ্টি কেবল একটি প্রাকৃতিক ঘটনা নয়, বরং এটি আল্লাহর কর্মকুশলতার এক অনন্য নিদর্শন।
কোথাও বৃষ্টি এসেছে মৃত ভূমিকে পুনর্জীবিত করার রহমত হিসেবে, আবার কোথাও তা অবাধ্য জাতির ওপর নেমে এসেছে আজাব বা শাস্তি হয়ে। কোরআনের এই আয়াতগুলো নিয়ে গভীর চিন্তা করলে আল্লাহর অসীম ক্ষমতা ও হিকমতের পরিচয় পাওয়া যায়।
‘মাতার’ ও ‘গাইস’: শব্দের পার্থক্য
পবিত্র কোরআনে বৃষ্টির বর্ণনায় ভিন্ন ভিন্ন শব্দ ব্যবহৃত হয়েছে, যার অর্থ অত্যন্ত সূক্ষ্ম ও গভীর।
মাতার: এই শব্দটি অধিকাংশ ক্ষেত্রে শাস্তি বা আজাবের প্রেক্ষাপটে ব্যবহৃত হয়েছে। যেমন, “আমি তাদের ওপর পাথর বৃষ্টি বর্ষণ করলাম, অতঃপর সতর্ককৃতদের সেই বৃষ্টি কতই না মন্দ ছিল!” (সুরা শুয়ারা, আয়াত: ১৭৩)
গাইস: এই শব্দটি ব্যবহৃত হয় রহমত, সাহায্য এবং কঠিন খরা বা হতাশার পর নেমে আসা বৃষ্টির বর্ণনায়। যেমন, “তিনিই সেই সত্তা, যিনি মানুষের হতাশার পর ‘গাইস’ (বৃষ্টি) বর্ষণ করেন এবং তাঁর রহমত ছড়িয়ে দেন।” (সুরা শুরা, আয়াত: ২৮)
কোরআনে বৃষ্টির বিভিন্ন রূপ
পবিত্র কোরআনে বৃষ্টির প্রায় ১১টি সরাসরি উল্লেখ ছাড়াও আল-মাজল (মেঘ), আল-ওয়াদাক (বৃষ্টির ফোঁটা), আল-ওয়াবিল (প্রবল বৃষ্টি) ও আল-তাল (হালকা বৃষ্টি) এর মতো শব্দে বৃষ্টির বিভিন্ন রূপ বর্ণিত হয়েছে।
রহমতের বৃষ্টি
আল্লাহ–তাআলা আকাশ থেকে বৃষ্টি বর্ষণ করে পৃথিবীকে সুশোভিত করেন। বলা হয়েছে, “আমি আকাশ থেকে বরকতময় পানি (বৃষ্টি) বর্ষণ করি, অতঃপর তা দ্বারা বাগান ও শস্যরাজি উৎপন্ন করি।” (সুরা ক্বাফ, আয়াত: ৯)
এই বৃষ্টি মানুষের তৃষ্ণা মেটায় এবং গবাদি পশুর খাদ্য জোগায়। (সুরা নাহল, আয়াত: ১০)
শাস্তির বৃষ্টি
অবাধ্য কওমে লুত (আ.)-এর ওপর আল্লাহ–তাআলা কঙ্কর বা পাথর বৃষ্টি বর্ষণ করেছিলেন। কোরআনে বলা হয়েছে, “অতঃপর যখন আমার আদেশ আসল, তখন আমি সেই জনপদকে উল্টে দিলাম এবং তাদের ওপর স্তরে স্তরে সিজ্জিলের (পোড়ানো মাটির) পাথর বর্ষণ করলাম।” (সুরা হুদ, আয়াত: ৮২)
বৃষ্টির সময় নবীজির দোয়া
বৃষ্টির সময়টি দোয়া কবুলের অন্যতম শ্রেষ্ঠ সময়। রাসূলুল্লাহ (সা.) বৃষ্টির সময় আল্লাহর প্রতি মুখাপেক্ষী হতেন এবং নির্দিষ্ট কিছু দোয়া পড়তেন:
বৃষ্টি শুরু হলে: আল্লাহুম্মা সয়্যিবান নাফিআ” (হে আল্লাহ, আমাদের ওপর উপকারী বৃষ্টি বর্ষণ করুন)। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ১০৩২)
বজ্রপাতের শব্দ শুনলে: সুবহানাল্লাজি ইউসাব্বিহুর রা’দু বিহামদিহি ওয়াল মালাইকাতু মিন খয়ফাতিহ (পবিত্র সেই সত্তা, যাঁর প্রশংসা বজ্র ও ফেরেশতারা তাঁর ভয়ে পাঠ করে)। (মুয়াত্তা ইমাম মালিক, হাদিস: ৩৬৪১)
বৃষ্টিতে ক্ষতির আশঙ্কা হলে: আল্লাহুম্মা হাওয়ালাইনা ওয়ালা আলাইনা (হে আল্লাহ, আমাদের আশপাশে বর্ষণ করুন, আমাদের ওপর নয়)। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ১০১৪)
মৃত ভূমিকে জীবন দান
কোরআন মাজিদ বৃষ্টির মাধ্যমে একটি চমৎকার বৈজ্ঞানিক ও আধ্যাত্মিক উদাহরণ পেশ করে। শুকনো ও মৃত ভূমি যেভাবে বৃষ্টির স্পর্শে পুনরায় জীবিত ও সবুজ হয়ে ওঠে, আল্লাহ–তাআলা কিয়ামতের দিন মৃত মানুষকে এভাবেই কবর থেকে জীবিত করবেন।
বলা হয়েছে, “আমি আকাশ থেকে পরিমিত পানি বর্ষণ করি এবং তা দ্বারা মৃত জনপদকে সঞ্জীবিত করি। এভাবেই তোমাদের বের করা (পুনরুত্থিত করা) হবে।” (সুরা জুখরুফ, আয়াত: ১১)
সারকথা
পবিত্র কোরআনের বৃষ্টির আয়াতগুলো আমাদের শেখায় যে, প্রকৃতি ও আবহাওয়া কেবল জড় কোনো বস্তু নয়; বরং এর প্রতিটি পরতে পরতে আল্লাহর নিয়ন্ত্রণ বিদ্যমান।
বৃষ্টি দেখে মুমিন যেমন তাঁর শুকরিয়া আদায় করে, তেমনি আজাব থেকে পানাহ চায়। বৃষ্টির প্রতিটি ফোঁটা আমাদের অন্তরে আল্লাহর মহত্ত্বের বীজ বপন করে দেয়। (সুরা আনআম, আয়াত: ৯৯)