কোরআনের ব্যাখ্যায় এআই ব্যবহারে সতর্কতা

ছবি: পেক্সেলস

দৈনন্দিন নানা কাজে আমরা এই প্রযুক্তির ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছি। কিন্তু প্রশ্ন জাগে, ইসলামের সবচেয়ে সংবেদনশীল জায়গা—পবিত্র কোরআনের ব্যাখ্যা বা তাফসিরের ক্ষেত্রে কি আমরা এই প্রযুক্তির ওপর নির্ভর করতে পারি?

বিশেষজ্ঞ আলেমরা মনে করেন, পবিত্র কোরআনের আয়াত থেকে অর্থ বা বিধান আহরণের ক্ষেত্রে স্বাধীনভাবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ওপর নির্ভর করা ইসলামি শরিয়ত অনুযায়ী অনুমোদিত নয়।

এটি কেবল ভুলই নয়, বরং এর ফলে পবিত্র কালামের অপব্যাখ্যা এবং বিকৃত অর্থ ছড়িয়ে পড়ার চরম ঝুঁকি রয়েছে।

একটি এআই মডেল কেবল ইন্টারনেটে থাকা তথ্যের ওপর ভিত্তি করে শব্দ সাজায়। তার কোনো আধ্যাত্মিক সচেতনতা বা শরিয়াহর সূক্ষ্ম প্যাঁচগুলো বোঝার ক্ষমতা নেই।

পাণ্ডিত্য বনাম যান্ত্রিক মেধা

কোরআনের তাফসির বা ব্যাখ্যা করা কোনো সাধারণ কাজ নয়। এটি একটি বিশাল তাত্ত্বিক ও গবেষণামূলক দায়িত্ব, যা সুপ্রতিষ্ঠিত ইসলামি জ্ঞান-বিজ্ঞানের শাখাগুলোর সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত।

মিসরের ফতোয়াবিষয়ক সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান ‘দার আল-ইফতা আল-মিসরিয়াহ’-এর অফিশিয়াল বিবৃতিতে উল্লেখ করেছে যে কোরআনের সঠিক মর্ম অনুধাবনের জন্য নির্ধারিত কিছু স্বীকৃত যোগ্যতা ও পদ্ধতির প্রয়োজন। একজন মুফাসসির বা ব্যাখ্যাকারীকে আরবি ভাষা, ব্যাকরণ (নাহু-সরফ), অলংকারশাস্ত্র (বালাগাত), হাদিস শাস্ত্র এবং ফিকাহ বা আইনশাস্ত্রের গভীর জ্ঞান রাখতে হয়।

আরও পড়ুন

কিন্তু একটি এআই মডেল কেবল ইন্টারনেটে থাকা তথ্যের ওপর ভিত্তি করে শব্দ সাজায়। তার কোনো আধ্যাত্মিক সচেতনতা বা শরিয়াহর সূক্ষ্ম প্যাঁচগুলো বোঝার ক্ষমতা নেই। ফলে এআই যখন কোনো আয়াতের ব্যাখ্যা দেয়, তখন তা অনুমাননির্ভর হওয়ার সম্ভাবনা থাকে শতভাগ।

এ প্রসঙ্গে কোরআনে সতর্ক করা হয়েছে, ‘যে বিষয়ে তোমার কোনো জ্ঞান নেই, তার অনুসরণ করো না। নিশ্চয়ই কান, চোখ ও হৃদয়—এগুলোর প্রতিটি সম্পর্কেই তোমাদের জবাবদিহি করতে হবে।’ (সুরা বনি ইসরাইল, আয়াত: ৩৬)

ইসলামি জ্ঞানার্জনের মূল ভিত্তি হলো ‘সনদ’ বা নির্ভরযোগ্য পরম্পরা। যুগ যুগ ধরে আলেমরা এক প্রজন্মের কাছ থেকে অন্য প্রজন্মে এই জ্ঞান নির্ভুলভাবে পৌঁছে দিয়েছেন।

অনুমান ও বিকৃতির ঝুঁকি

গ্র্যান্ড মুফতি সতর্ক করে বলেছেন যে বিশেষজ্ঞের যাচাই ছাড়া কোরআনের আয়াতের অর্থ নির্ধারণ করা ঐশ্বরিক বাণীর পবিত্রতা ও অখণ্ডতাকে ক্ষুণ্ন করে। বর্তমান সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তথ্যের অবাধ প্রবাহের ফলে অনেক অনির্ভরযোগ্য ও বিভ্রান্তিকর ব্যাখ্যা ছড়িয়ে পড়ছে। এআই যদি ভুল উৎস থেকে তথ্য নিয়ে কোরআনের অর্থ প্রদান করে, তবে সাধারণ মানুষ বিভ্রান্ত হতে পারে।

ইসলামি জ্ঞানার্জনের মূল ভিত্তি হলো ‘সনদ’ বা নির্ভরযোগ্য পরম্পরা। যুগ যুগ ধরে আলেমরা এক প্রজন্মের কাছ থেকে অন্য প্রজন্মে এই জ্ঞান নির্ভুলভাবে পৌঁছে দিয়েছেন। (আল-ইতকান ফি উলুমিল কুরআন, জালালুদ্দিন সুয়ুতি, ২/২৫০)

এআইয়ের ক্ষেত্রে এই বিশ্বস্ততার শৃঙ্খল অনুপস্থিত।

আরও পড়ুন

নির্ভরযোগ্য পদ্ধতি কোনটি

কোরআনের কোনো আয়াতের মর্মার্থ বুঝতে চাইলে সুপ্রতিষ্ঠিত ও নির্ভরযোগ্য তাফসির গ্রন্থগুলোর সাহায্য নিতে হবে। এ ছাড়া কোনো বিষয়ে সন্দেহ বা জিজ্ঞাসার উদয় হলে সরাসরি আলেমদের সঙ্গে অথবা স্বীকৃত ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যোগাযোগ করতে হবে।

পবিত্র কোরআনে আল্লাহ–তাআলা এই পদ্ধতির কথাই নির্দেশ করেছেন, ‘সুতরাং তোমরা যদি না জানো, তবে জ্ঞানীদের নিকট জিজ্ঞাসা করো।’ (সুরা আন-নাহল, আয়াত: ৪৩)

আধুনিক প্রযুক্তি আমাদের শেখার কাজে সাহায্য করতে পারে—যেমন শব্দার্থ খোঁজা বা আয়াতের দ্রুত তল্লাশি চালানো। কিন্তু যখনই ব্যাখ্যা বা কোনো জটিল বিধানের প্রশ্ন আসবে, তখন এই প্রযুক্তি কখনোই একজন যোগ্য আলেমের বিকল্প হতে পারবে না।

এআই বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে টুল হিসেবে ব্যবহার করা যেতে পারে, কিন্তু একে শিক্ষক বা ব্যাখ্যা প্রদানকারী হিসেবে গ্রহণ করা বিপজ্জনক।

শেষ কথা

প্রযুক্তির ব্যবহার ইসলামে নিষিদ্ধ নয়, তবে তার একটি যুক্তিশীল সুনির্দিষ্ট সীমা থাকা জরুরি। পবিত্র কোরআনের অর্থ রক্ষার জন্য প্রয়োজন বিনয়, শৃঙ্খলা এবং বংশপরম্পরায় প্রাপ্ত বিশুদ্ধ জ্ঞানের ওপর নির্ভরতা। এআই বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে টুল হিসেবে ব্যবহার করা যেতে পারে, কিন্তু একে শিক্ষক বা ব্যাখ্যা প্রদানকারী হিসেবে গ্রহণ করা বিপজ্জনক।

আল্লাহর রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি না জেনে কোরআন সম্পর্কে নিজের রায় বা মত প্রদান করে, সে যেন তার ঠিকানা জাহান্নামে বানিয়ে নেয়।’ (সুনান তিরমিজি, হাদিস: ২,৯৫১)

তাই প্রযুক্তির এই স্বর্ণযুগেও আমাদের শিকড়ের দিকে তাকাতে হবে এবং পবিত্র কোরআনের সঠিক দিশা পেতে নির্ভরযোগ্য আলেম ও প্রামাণ্য কিতাবগুলোর দ্বারস্থ হতে হবে।

আরও পড়ুন