উম্মে সালাম (রা.): মদিনার প্রাজ্ঞ ফকিহা
আবদুর রহমান ইবনে আউফ। প্রখ্যাত সাহাবি। নবীজির যে বিশেষ ১০ জন সহচর জীবদ্দশাতেই জান্নাতের সুসংবাদপ্রাপ্ত হয়েছেন, আবদুর রহমান ইবনে আউফ তাদের অন্যতম। আল্লাহ তার সম্পদে প্রাচুর্য দান করেছিলেন। সাহাবিদের দলে তিনি ছিলেন বিশেষ বিত্তবান।
তার সম্পদের আধিক্য তাকে ভীষণ উদ্বিগ্ন করে তোলে—এত সম্পদ আল্লাহ দান করেছেন, জান্নাতের নেয়ামত দুনিয়াতেই দিয়ে দিচ্ছেন না তো! সম্পদের ফেতনা যে অত্যন্ত কঠিন ফেতনা—তার অজানা ছিল না। সারাক্ষণ ভয়ে থাকতেন, বিপুল বিত্তের কারণে আখেরাতে আবার বিপদে পড়ে যান কি না!
মনস্তাপ নিয়ে হাজির হলেন উম্মে সালামার দুয়ারে। তাঁকে খুলে বলেন নিজের তাবৎ পেরেশানির কথা। ‘আম্মাজান, আশঙ্কা হয়, সম্পদের প্রাচুর্য পাছে আমাকে বরবাদ না করে ফেলে আবার! কোরাইশের সবচেয়ে বিত্তবান মানুষটি আমি।’
কেবল ধর্মীয় বিধানাবলিরই সমাধান নয়; সাহাবিরা কোরআনের সঠিক পাঠও তাঁর থেকে রপ্ত করে নিতেন। উম্মে সালামা তেলাওয়াত করে একদম সঠিক উচ্চারণটি শুনিয়ে দিতেন।
তার এমন উদ্বেগের চিকিৎসা বাতলে দেন উম্মে সালামা। বলেন, ‘সমস্যা কী? সম্পদ আপনাকে দান করেছেন মহান আল্লাহ। তা তাঁর রাস্তাতেই খরচ করতে থাকুন, তাহলে কোনো সমস্যা থাকবে না। তবে আপনার যে শঙ্কা, তা থাকা ভালো। কেননা, আমি নবীজিকে বলতে শুনেছি, তিনি বলেছেন, ‘আমার ইন্তিকালের পর আমার কতক সাহাবি আমাকে দেখতে পাবে না।’
মানে, তাঁর পথ থেকে বিচ্যুত হয়ে যাবে। সুতরাং সাহাবি হলেই যে হেদায়াতের ওপর তার মৃত্যু নিশ্চিত, এমনটা নয়। সুতরাং এই শঙ্কা থাকা খারাপ নয়। আপনি সম্পদ আল্লাহর রাস্তায় খরচ করতে থাকুন। আশা করি, আল্লাহ আপনাকে নিরাশ করবেন না।’ (মুসনাদে আহমাদ, ৬/২৯০)
কেবল ধর্মীয় বিধানাবলিরই সমাধান নয়; সাহাবিরা কোরআনের সঠিক পাঠও তাঁর থেকে রপ্ত করে নিতেন। উম্মে সালামা তেলাওয়াত করে একদম সঠিক উচ্চারণটি শুনিয়ে দিতেন তাদের, যাতে করে প্রশ্নকর্তার কোনো সমস্যাই আর থেকে না যায়।
শাহর ইবনে হাওশাব একবার উম্মে সালামাকে জিজ্ঞেস করলেন ‘ইন্নাহু আমালুন গইরু সালিহ’ সম্পর্কে; নবীজি আয়াতটি কীভাবে পাঠ করতেন? উম্মে সালামা আয়াতটি উচ্চারণ করে তাকে নবীজির পাঠপদ্ধতি শিখিয়ে দিলেন। (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস: ৩৯৮৩)
আরেকবারের কথা। উম্মে সালামা সুরা ফাতিহার প্রতিটি আয়াত পৃথক পৃথকভাবে পাঠ করে তাঁর শিক্ষার্থীদের বলে দিলেন, ‘নবীজি সুরা ফাতিহা এমন করে পৃথকভাবে পাঠ করতেন।’ (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস: ৪০০১)
ধর্মীয় কোনো বিধি–বিধান নিয়ে সাহাবিদের মধ্যে যখন মতবিরোধ দেখা দিত, তার মীমাংসার জন্য তারা উম্মে সালামার শরণাপন্ন হতেন।
আবু সালামা ইবনে আবদুর রহমান ও ইবনে আব্বাস একবার এলেন আবু হোরাইরার কাছে। জনৈকা নারীর স্বামী মারা গেছেন অল্প ক’দিন হলো। স্বামী মারা যাবার পরপরই তিনি সন্তান প্রসব করেছেন। এখন এই নারী ইদ্দত পালন করবেন স্বামী মৃত্যুর হিসেবে, নাকি সন্তান প্রসবের হিসেবে?
ইবনে আব্বাস বলেন—‘সব থেকে দীর্ঘ হবে যার হিসাব, তার অনুসারে এই নারীর ইদ্দত পূর্ণ হবে।’ কিন্তু আবু সালামা তার অভিমত ব্যক্ত করেন, ‘এই নারীর ইদ্দত পূর্ণ হয়ে গেছে।’
আবু সালামা আর ইবনে আব্বাসের মধ্যে মতপার্থক্য হয়ে যায় বিষয়টি নিয়ে। এর মধ্যে আবু হোরাইরা আবার আবু সালামার পক্ষ নিয়ে ইবনে আব্বাসের দলটি হালকা করে দেন।
আমি রাসুলকে বললাম, আপনি তো আসরের পর অন্য কোনো নামাজ আদায় করতে নিষেধ করেছেন, তাহলে কি হুকুমে কোনো পরিবর্তন এল?’
অবশেষ নিষ্পত্তির জন্য লোক পাঠানো হয় উম্মে সালামার কাছে। ইবনে আব্বাসের মুক্ত দাস কুরাইব গিয়ে বিষয়টির খোলাসা করেন উম্মে সালামার কাছে।
সব শুনে উম্মে সালামা সমাধান দিয়ে বলেন, ‘রাসুলের জীবদ্দশায় সুবাইআ আসলামিয়ার স্বামী ইন্তিকাল করেন। স্বামীর ইন্তিকালের ক’দিন পরই তাঁর কোল আলো করে সন্তান আসে দুনিয়াতে। রাসুলের কাছে সন্তান প্রসবের সংবাদ পৌঁছামাত্র তিনি তাকে বিবাহের অনুমতি দেন।
সুতরাং সন্তান প্রসব করলেই স্বামী বিয়োগ-হওয়া নারী নতুন বিবাহ-বন্ধনে আবদ্ধ হতে পারবে।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ৩৬১৫; সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ১১৯৪)
এরকমই আরেকটা ঘটনা। এবারে মতপার্থক্য হয়েছে ইবনে আব্বাস, মাসরুর এবং আবদুর রহমান ইবনে আজহারের মধ্যে। এবারের বিষয় আসরের নামাজান্তে দুই রাকাআত আদায়।
ইবনে আব্বাস তার মুক্ত দাস ও ছাত্র কুরাইবকে পাঠালেন আয়েশা (রা.)–এর কাছে। কুরাইব গিয়ে তার উস্তাদের শেখানো কথা উচ্চারণ করল আয়েশার সামনে।
আমরা জানতে পেরেছি, আপনি আসরের নামাজান্তে দুই রাকাআত আদায় করেন; অথচ আল্লাহর রাসুল আসরের নামাজের পর কোনো নামাজ আদায় করতে নিষেধ করেছেন। আয়েশা সব শুনে বললেন, ‘এ বিষয়ে উম্মে সালামা আছেন, যিনি যথার্থ বলতে পারবেন। আপনারা তাঁর কাছে যান।’
কুরাইব আয়েশার অলিন্দ পেরিয়ে উম্মে সালামার ঘরের দুয়ারে হাজির হলেন। উম্মে সালামা বলেন, ‘হ্যাঁ, আপনারা ঠিকই শুনেছেন। আল্লাহর রাসুল আসরের নামাজের পর আর কোনো নামাজ আদায় করতে নিষেধ করেছেন।
তবে একদিনের কথা। আমি ঘরে বসে আছি। কথাবার্তা বলছি আমার কাছে আগত নারীদের সঙ্গে। দেখলাম, নবীজি ঘরে ফিরেই নামাজে দাঁড়িয়ে গেলেন, অথচ তিনি মসজিদ থেকে আসরের নামাজ শেষ করেই ঘরে এসেছেন।
তখন আমি রাসুলকে বললাম, আপনি তো আসরের পর অন্য কোনো নামাজ আদায় করতে নিষেধ করেছেন, তাহলে কি হুকুমে কোনো পরিবর্তন এল?’
নবীজি আমাকে বলেন, ‘উম্মে সালামা, আমার কাছে বনু আবদুল কায়েসের ক’জন লোক এসেছিল। তাদের সঙ্গে কথা বলায় এমন ব্যস্ত হয়ে পড়েছিলাম যে, জোহরের পরের দুই রাকাআত আমি আদায় করে উঠতে পারিনি। সেই দুই রাকাআতই এখন পড়লাম।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ১২৩৩ )
আমি উম্মে সালামার শরণাপন্ন হলাম। তাঁকে এও জানালাম, আমার সঙ্গীরা বলছে, হজ-ওমরাহ দুটোই যে ব্যক্তি এক সফরে আদায় করতে চায়, তাকে অবশ্যই হজের কাজ আগে সম্পন্ন করতে হবে।
ঘটনাটি আমাদের জানাচ্ছেন আবু ইমরান। তিনি বলছেন, ‘একবার হজ পালন করবার ইচ্ছে হলো আমার। আমার ইচ্ছে ছিল, একই সফরে হজ ও ওমরাহ পালন করব। কিন্তু আমার স্পষ্ট জানা ছিল না, হজ-ওমরাহ একসঙ্গে আদায়ের পদ্ধতি কী। কিছুটা দিধান্বিত ছিলাম আমি। আমার প্রধান সংশয় ছিল, হজ আগে পালন করব, নাকি ওমরাহ।
আমি উম্মে সালামার শরণাপন্ন হলাম। তাঁকে এও জানালাম, আমার সঙ্গীরা বলছে, হজ-ওমরাহ দুটোই যে ব্যক্তি এক সফরে আদায় করতে চায়, তাকে অবশ্যই হজের কাজ আগে সম্পন্ন করতে হবে। তারপর ওমরাহ, নতুবা ওমরাহ সম্পন্ন হবে না।’
তিনি আমার সমস্ত সংশয় মুহূর্তেই দূর করে দিয়ে বলেন, ‘চাইলে আগে ওমরাহর কাজ সম্পন্ন করে পরে হজ করতে পারো। আবার চাইলে হজ করবার পরেও ওমরাহ করত পারো। মোটকথা আগে-পরে করাটা কোনো বিষয় নয়। একসঙ্গে করাটাই মুখ্য। নবীজি বলেছেন, ‘তোমরা হজের সঙ্গে ওমরাহ পালন করো।’ (মুসনাদে আহমাদ, ৬/২৯৭)
এ ঘটনাটি আমাদের জানাচ্ছে উম্মে সালামার প্রজ্ঞার কথা। সঙ্গে আমরা এও জানতে পারছি, ইলমের প্রকাশে তিনি কুণ্ঠিত হতেন না। তার যথার্থ বিচার তিনি প্রশ্নকর্তার সামনে হাজির করতেন।
সব দিক থেকেই চেষ্টা করতেন, যেন প্রশ্নকর্তার জানবার মতো আর কিছু বাকি না রয়ে যায় এবং প্রদত্ত সমাধানে কোনো সংশয়ও যেন তার আর থেকে না যায়। সব দিক থেকে পরিপূর্ণ সমাধান দিতে আমরা দেখে উঠি ফকিহা উম্মে সালামাকে। রাদিয়াল্লাহু আনহা।