জাহেলি যুগে কোরাইশরা তাদের ধর্মপালনে কঠোরতা আরোপ করত। মিনার দিনগুলোতে তারা ছাওনিতে যেত না, ইহরাম অবস্থায় তারা ঘরের দরজা দিয়ে প্রবেশ করত না, তারা ঘি-মাখন গ্রহণ করত না, যুদ্ধে ব্যবহৃত তির খুঁজে নিত না।
তারা বলত, ‘আমরা আল্লাহর পরিবারের লোক, আমরা হারাম থেকে বের হব না।’ তারা আরাফায়ও অবস্থান করত না; বরং মুজদালিফায় অবস্থান করত। (ইবনে মানজুর, লিসানুল আরব)
জুবাইর ইবনে মুতয়িম (রা.) আরাফায় গিয়েছিলেন তাঁর হারানো একটি উটের খোঁজে এবং সেখানে নবীজি (সা.)–এর উপস্থিতি দেখে বিস্মিত হন। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ১৫৫৯)
আরাফাহ অর্থ জানা, চেনা, পরিচয় লাভ করা, অবহিত হওয়া, স্বীকার করা, স্বীকৃতি দান করা। হজের বিধান অনুযায়ী প্রত্যেক হাজিকে আরাফাতের ময়দানে উপস্থিত হয়ে নিজের কৃত অপরাধ স্বীকার করে আল্লাহর নিকট ক্ষমার জন্য প্রার্থনা করতে হয়, তাই এর নাম ‘আরাফাত’।
আরাফা আদম ও হাওয়া (আ.)–এর স্মৃতিবিজড়িত স্থান। পৃথিবীতে আগমনকালীন দীর্ঘ বিচ্ছেদের পর আরাফার মাঠে তাঁদের পরিচয় ঘটেছিল, তাই স্থানটির ঐতিহাসিক নাম ‘আল-আরাফাত’।
আল-আরাফাত ‘ওয়াদি নুমান’-এর ক্ষুদ্র অংশ। এটি সেই স্থান যেখানে আল্লাহ–তাআলা সমগ্র মানবসন্তানকে একসঙ্গে তাঁর রবুবিয়াতের বিষয়ে প্রশ্ন করেছিলেন।
ইবনে আব্বাস (রা.) বলেন, ‘নুমান উপত্যকা তথা আরাফায় আল্লাহ–তাআলা আদম-সন্তান হতে অঙ্গীকার নিয়েছিলেন। তারপর তিনি আদমের পৃষ্ঠদেশ হতে সব সন্তানকে বের করলেন এবং তাদের পিঁপড়ের আকারে ছড়িয়ে দিলেন ও তাদের সঙ্গে সম্মুখে কথা বললেন।’ (মুসনাদে আহম, হাদিস: ২৩৫৭)
আরাফা আদম ও হাওয়া (আ.)–এর স্মৃতিবিজড়িত স্থান। পৃথিবীতে আগমনকালীন দীর্ঘ বিচ্ছেদের পর আরাফার মাঠে তাঁদের পরিচয় ঘটেছিল, তাই স্থানটির ঐতিহাসিক নাম ‘আল-আরাফাত’।
জিবরাইল ও নবি ইব্রাহিম (আ.)–এর কথোপকথনের স্মৃতিবিজড়িত স্থান এটি। ইবরাহিম (আ.) আল্লাহর আদেশে হজের ঘোষণা দিয়েছেন আর মানুষেরা লাব্বায়িক বলে সাড়া দিয়েছেন। আল্লাহ তাঁকে আরাফায় আসতে আদেশ দিলেন এবং অবস্থানের বৈশিষ্ট্য বলে দিলেন।
তিনি যখন আল-আকাবায় বৃক্ষটির নিকট পৌঁছালেন, শয়তান সামনে আবির্ভূত হলো এবং তাঁকে অগ্রসর হতে বাধা দিল। তিনি তাকে পাথর নিক্ষেপ করলেন এবং তাকবির দিলেন। সে শূন্যে মিলিয়ে গেল।
তাঁর দিকে তাকিয়ে তিনি এখানে পথ ভুলে সামনে-পেছনে আসলেন। সেই থেকে স্থানটির নাম ‘জুল-মাজাজ’। তারপর তিনি অগ্রসর হলেন এবং আরাফাতে অবতীর্ণ হলে বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত স্থানটি চিনতে পারেন।
আরাফাতের ময়দান মক্কা থেকে ২০ কিমি দক্ষিণ-পূর্বে হারামের সীমানার বাইরে অবস্থিত একটি সমতল অঞ্চল। দৈর্ঘ্য ও প্রস্থে দুই কিলোমিটার। পূর্ব-পশ্চিম ও উত্তর দিক থেকে পাহাড়বেষ্টিত আর দক্ষিণে ‘মক্কা হাদাহ তায়েফ রিং রোড’।
তখন জিবরাইল জিজ্ঞেস করেন, ‘আরাফতা?’ মানে ‘আপনি কি চিনতে পেরেছেন?’ ইব্রাহিম (আ.) বলেন, ‘আরাফতু’ মানে ‘চিনতে পেরেছি’। সেখান থেকে এ স্থানের নাম আরাফাহ। (ইবনে কাসির)
আরাফাতের ময়দান মক্কা থেকে ২০ কিমি দক্ষিণ-পূর্বে হারামের সীমানার বাইরে অবস্থিত একটি সমতল অঞ্চল। দৈর্ঘ্য ও প্রস্থে দুই কিলোমিটার। পূর্ব-পশ্চিম ও উত্তর দিক থেকে পাহাড়বেষ্টিত আর দক্ষিণে ‘মক্কা হাদাহ তায়েফ রিং রোড’। সড়কের দক্ষিণ পাশে আবেদি উপত্যকায় রয়েছে ‘জামিয়া উম্মুল কুরা’।
বছরের অধিকাংশ সময়ে বিরান থাকা মাঠটি জিলহজ মাসের ৯ তারিখ থাকে লোকে লোকারণ্য। সেদিন পুরো পৃথিবীর প্রতিটি মুমিনের দুচোখ মাঠের হাজিদের ওপর নিবদ্ধ থাকে।
প্রতিটি কলব ‘মসজিদ আন-নিমরার’ সঙ্গে ঝুলে থাকে আর প্রতিটি হৃদয়ে গুঞ্জরিত হয়—‘লাব্বায়িক, আল্লাহুম্মা লাব্বায়িক, লাব্বায়িক লা শারিকা লাকা, ইন্নাল হামদা, ওয়ান-নি’মাতা, লাকা ওয়াল মুলক, লা শারিকা লাকা।’
এই মাঠে হাজিরা জোহরের ওয়াক্তে জোহর ও আসর নামাজ একসঙ্গে আদায় করে থাকেন এবং আল্লাহর নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করতে থাকেন।
জাবালু রহমতের পাদদেশে দাঁড়িয়ে নবীজি (সা.) ঐতিহাসিক খুতবাটি দিয়েছিলেন। মানবেতিহাসের শ্রেষ্ঠ বক্তৃতাটি হৃদয়ের আয়নায় বিম্বিত হয় বারবার। গুরুগম্ভীর ভাষণটির সমাপ্তি প্রায়। তাঁর চেহারা মোবারক উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে। তিনি করুণভাবে আকাশ পানে তাকালেন এবং করুণ স্বরে বললেন, ‘হে প্রভু, আমি কি তোমার দিনের দাওয়াত পরিপূর্ণভাবে মানুষের কাছে পৌঁছাতে পেরেছি?’
সমবেত জনতার সম্মিলিত কণ্ঠে ধ্বনিত হলো, ‘নিশ্চয়ই আপনি দায়িত্ব সঠিকভাবে আঞ্জাম দিয়েছেন।’ তিনি আকাশের দিকে শাহাদাতের আঙুলি তুলে ধরলেন, ‘হে রব আমার! আপনি শুনুন এবং সাক্ষী থাকুন।’
জাবালে রহমতের ঢালে এক সময় মসজিদটির নাম ছিল ‘মাসজিদুশ শুকরাহ’। কখনো এটার নাম ‘মসজিদু ইব্রাহিম খলিল’, কখনো ‘মাসজিদু আরাফা’ ছিল। এখন ‘মসজিদ আন-নামিরা’।
হাজার বছর ধরে সেখানে উপস্থিত হয়েছেন উম্মাহর কত মুফাসসির, কত মুহাদ্দিস, কত ইমাম, কত মুজতাহিদ, কত অলি-আউলিয়া! কত কান্না ছড়িয়ে আছে আরাফার বাতাসে!
আরাফার মাঠে প্রতি বছর এখান থেকে খুতবা পাঠ করা হয়। খুতবা শোনার সময় নবীজির (সা.) সেই খুতবাটির স্মৃতিই কেবল ভাসতে থাকে। আবু বকর, উমর আর বিলালের চোখের পানি যেন দেখতে পাচ্ছি!
হাজার বছর ধরে সেখানে উপস্থিত হয়েছেন উম্মাহর কত মুফাসসির, কত মুহাদ্দিস, কত ইমাম, কত মুজতাহিদ, কত অলি-আউলিয়া! কত কান্না ছড়িয়ে আছে আরাফার বাতাসে! কত অশ্রু মিশে আছে আরাফার মাটি ও পাথরে! ইসরাফিলের শিঙায় ফুঁক দেওয়ার আগে আরও কত জনতার মিলন হবে সেখানে?
কয়েকবার ওমরাহ পালন করতে পবিত্র মক্কায় হাজির হলেও আরাফায় হাজির হইনি, খুব কাছ থেকে দেখেছি, কিন্তু তার সীমানায় প্রবেশ করিনি। সেখানে প্রথমবার উপস্থিত হব হৃদয়ের পূর্ণ আবেগ নিয়ে শ্বেতশুভ্র ইহরামের সঙ্গে—সেই আশায়। আল্লাহ–তাআলা ২০২৪ সালের হজের বরকতময় সফরে সেই প্রত্যাশা পূরণ করেছেন। আলহামদুলিল্লাহ।
ড. মুহাম্মদ তাজাম্মুল হক: অধ্যাপক, ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা