ঋণের বোঝা থেকে মুক্ত হতে মহানবী (সা.) যে উপায় দেখিয়েছেন

ছবি: প্রথম আলো
প্রথম আলোকে নির্ভরযোগ্য সূত্র হিসেবে পেতে হলেএখানে ক্লিক করুন

ইসলামে ঋণ করাকে নিরুৎসাহিত করা হয়েছে; এমনকি একজন শহীদের সব পাপ মাফ হয়ে গেলেও তার ঋণের দায় মাফ হয় না, যতক্ষণ না তা পরিশোধ করা হয়। তবে অভাব, অসুস্থতা বা ব্যবসায়িক ক্ষতির কারণে মানুষ বাধ্য হয়ে অনেক সময় ঋণের ফাঁদে পড়ে যায়।

এই দুর্বিষহ অবস্থা থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য মহানবী (সা.) উম্মতকে চমৎকার কিছু মানসিক, আধ্যাত্মিক ও প্রায়োগিক পথ দেখিয়েছেন।

১. ঋণ পরিশোধের সংকল্প

ঋণমুক্তির প্রথম ও প্রধান শর্ত হলো—যেকোনো মূল্যে পাওনাদারের টাকা পরিশোধ করার দৃঢ় মানসিক সংকল্প (নিয়ত) থাকা। অনেকেই ঋণ নেওয়ার পর তা পরিশোধ করার কথা ভুলে যান বা গড়িমসি করেন।

অথচ অন্তরে যদি পরিশোধের সত্যিকারের তাগিদ থাকে, তবে আল্লাহ গায়েবিভাবে তাকে সাহায্য করেন।

মহানবী (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি মানুষের সম্পদ (ঋণ হিসেবে) গ্রহণ করে তা পরিশোধ করার উদ্দেশ্যে, আল্লাহ তার পক্ষ থেকে তা পরিশোধের ব্যবস্থা করে দেন। আর যে ব্যক্তি তা গ্রহণ করে বিনষ্ট করার উদ্দেশ্যে, আল্লাহ তাকে ধ্বংস করে দেন।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ২৩৮৭)

যে ব্যক্তি মানুষের সম্পদ (ঋণ হিসেবে) গ্রহণ করে তা পরিশোধ করার উদ্দেশ্যে, আল্লাহ তার পক্ষ থেকে তা পরিশোধের ব্যবস্থা করে দেন। আর যে ব্যক্তি তা গ্রহণ করে বিনষ্ট করার উদ্দেশ্যে, আল্লাহ তাকে ধ্বংস করে দেন।
সহিহ বুখারি, হাদিস: ২৩৮৭
আরও পড়ুন

২. নবীজির শেখানো বিশেষ দোয়া পাঠ

দুশ্চিন্তা ও ঋণের পাহাড় থেকে মুক্তির জন্য নবীজি সাহাবিদের কিছু দোয়া শিখিয়েছেন। একবার হজরত আবু উমামা (রা.) ঋণের দায়ে অত্যন্ত বিষণ্ণ অবস্থায় মসজিদে বসে ছিলেন। নবীজি তাঁকে সকালে ও সন্ধ্যায় একটি বিশেষ দোয়া পড়ার নির্দেশ দেন।

দোয়া: আল্লাহুম্মা ইন্নি আউজু বিকা মিনাল হাম্মি ওয়াল হাযানি, ওয়া আউজু বিকা মিনাল আজযি ওয়াল কাসালি, ওয়া আউজু বিকা মিনাল বুখলি ওয়াল জুবনি, ওয়া আউজু বিকা মিন গালাবাতুদ দাইনি ওয়া কহরির রিজাল।

অর্থ: হে আল্লাহ, নিশ্চয়ই আমি আপনার আশ্রয় প্রার্থনা করছি দুশ্চিন্তা ও বেদনা থেকে, আপনার আশ্রয় প্রার্থনা করছি অক্ষমতা ও অলসতা থেকে, আপনার আশ্রয় প্রার্থনা করছি কৃপণতা ও ভীরুতা থেকে এবং আপনার আশ্রয় প্রার্থনা করছি ঋণের বোঝা ও মানুষের দমন–পীড়ন বা আধিপত্য থেকে। (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস: ১৫৫৫)

এ ছাড়া আলী (রা.) এক চুক্তিবদ্ধ দাসকে ঋণমুক্তির জন্য নবীজির শেখানো আরেকটি চমৎকার দোয়া শিখিয়েছিলেন।

দোয়া: আল্লাহুম্মাকফিনি বিহালালিকা আন হারামিকা, ওয়া আগনিনি বিফাদলিকা আম্মান সিওয়াকা।

অর্থ: হে আল্লাহ, আপনার হারাম বস্তুর বদলে হালাল রিজিক দিয়ে আমাকে অভাবমুক্ত করুন এবং আপনার অনুগ্রহ দিয়ে আপনি ছাড়া অন্য সবার থেকে আমাকে অমুখাপেক্ষী করে দিন। (সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ৩৫৬৩)

৩. জীবনযাত্রায় পরিমিতিবোধ

আধ্যাত্মিক দোয়ার পাশাপাশি বাস্তবমুখী পদক্ষেপ গ্রহণ করা অপরিহার্য। ঋণগ্রস্ত ব্যক্তির উচিত তার দৈনন্দিন জীবনের সব ধরনের অপচয় ও বিলাসিতা পরিহার করা।

ঋণগ্রস্ত ব্যক্তির ওপর তার সামর্থ্য অনুযায়ী দ্রুত ঋণ পরিশোধ করা ওয়াজিব (আবশ্যক); এ জন্য তার নিজের ও পরিবারের মৌলিক প্রয়োজন (অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান) মেটানোর পর উদ্বৃত্ত সব সম্পদ বা আয় দিয়ে আগে ঋণ পরিশোধ করা উচিত। (আল-ফতোয়া আল-হিন্দিয়া, ৫/৩৬৬, দারুল কুতুবিল ইলমিয়্যাহ, বৈরুত, ২০০০)

আয়ের চেয়ে ব্যয় বেশি হলেই মানুষ ঋণের চক্রে পড়ে।

আরও পড়ুন
ঋণগ্রস্ত ব্যক্তি অনেক সময় পাওনাদারের ভয়ে পালিয়ে বেড়ান বা মিথ্যা কথা বলেন, যা ইসলামে সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। ঋণগ্রস্ত ব্যক্তির উচিত পাওনাদারের সঙ্গে বিনীত আচরণ করা এবং নিজের অক্ষমতার কথা সততার সঙ্গে তুলে ধরে তার কাছে সময় চাওয়া।

৪. হালাল উপার্জনে কঠোর পরিশ্রম

ঋণ পরিশোধের জন্য অলসতা ঝেড়ে ফেলে হালাল পথে উপার্জনের সর্বোচ্চ চেষ্টা করতে হবে। ইসলামে কর্মবিমুখতার কোনো স্থান নেই।

নিজের সাধ্যমতো পরিশ্রম করে আয় করতে থাকলে আল্লাহ সেই উপার্জনে বরকত দান করেন। কোনো কাজকেই ছোট করে দেখার সুযোগ নেই।

৫. পাওনাদারের সঙ্গে উত্তম আচরণ ও সময় প্রার্থনা

ঋণগ্রস্ত ব্যক্তি অনেক সময় পাওনাদারের ভয়ে পালিয়ে বেড়ান বা মিথ্যা কথা বলেন, যা ইসলামে সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। ঋণগ্রস্ত ব্যক্তির উচিত পাওনাদারের সঙ্গে বিনীত আচরণ করা এবং নিজের অক্ষমতার কথা সততার সঙ্গে তুলে ধরে তার কাছে সময় চাওয়া।

পবিত্র কোরআনেও পাওনাদারকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, ‘আর ঋণগ্রহীতা যদি অভাবগ্রস্ত হয়, তবে সচ্ছলতা আসা পর্যন্ত তাকে অবকাশ দেওয়া উচিত।’ (সুরা বাকারা, আয়াত: ২৮০)

পরিশেষে, ঋণ কোনো স্থায়ী অভিশাপ নয়, বরং এটি জীবনের একটি পরীক্ষামাত্র। উপার্জনে কঠোর পরিশ্রম, জীবনযাপনে পরিমিতিবোধ এবং আল্লাহর কাছে কায়মনোবাক্যে দোয়ার মাধ্যমে পাহাড়সম ঋণের বোঝাও একসময় ধীরে ধীরে নেমে যায়।

আল্লাহর ওপর ভরসা রাখলে তিনিই এমন পথ থেকে রিজিকের ব্যবস্থা করেন, যা মানুষের কল্পনারও অতীত।

আরও পড়ুন