‘যার আমানতদারি নেই তার ইমান নেই’

যে তোমার কাছে আমানত রেখেছে তার আমানত আদায় করোছবি: ফ্রিপিক

ইসলামি জীবনদর্শনে যে কয়টি চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যকে ইমানের মাপকাঠি হিসেবে ধরা হয়েছে, তার মধ্যে ‘আমানত’ বা আমানতদারি অন্যতম। এটি কেবল কারো গচ্ছিত সম্পদ ফেরত দেওয়ার নাম নয়, বরং জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে অর্পিত দায়িত্ব ও কর্তব্য যথাযথভাবে পালন করার এক মহান অঙ্গীকার।

আমানতদারির অভাব মানেই ইমানের অপূর্ণতা। আল্লাহর রাসুল (সা.) যখনই খুতবা দিতেন, প্রায়শই একটি কথা বলতেন, “যার আমানতদারি নেই তার ইমান নেই, আর যার অঙ্গীকারের ঠিক নেই তার ধর্ম নেই।” (মুসনাদে আহমাদ, হাদিস: ১২৪০৬)

পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা মুমিনদের সতর্ক করে বলেছেন, “হে মুমিনগণ, তোমরা জেনে-শুনে আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের সঙ্গে খেয়ানত করো না এবং তোমাদের পরস্পরের আমানতসমূহেরও খেয়ানত করো না” (সুরা আনফাল, আয়াত: ২৭)।

এই আয়াতের আলোকে আমানতের পরিধি যে কত বিস্তৃত, তা অনুধাবন করা জরুরি।

শরীরকে ইবাদতের উপযুক্ত রাখা এবং ব্যায়াম ও সুষম খাদ্যের মাধ্যমে একে রোগমুক্ত রাখার চেষ্টা করা আমানতদারির অংশ।

আমানতের বিচিত্র রূপ ও প্রকারভেদ

১. সঠিক নেতৃত্ব বাছাই: রাষ্ট্রীয় বা সামাজিক যেকোনো প্রক্রিয়ায় নিজের প্রতিনিধি নির্বাচন করা একটি বিশাল আমানত। ব্যক্তি যখন তার ভোটাধিকার প্রয়োগ করেন, তখন তিনি জাতির আমানত রক্ষা করেন। এখানে স্বজনপ্রীতি বা বন্ধুত্বের চেয়ে প্রার্থীর যোগ্যতা ও আমানতদারিকে প্রাধান্য দেওয়া আবশ্যক।

শক্তি ও সততা—এই দুটির সমন্বয় যেখানে নেই, সেখানে আমানত ক্ষুণ্ণ হয়।

আবু জর গিফারি (রা.) যখন নেতৃত্বের পদ চেয়েছিলেন, আল্লাহর রাসুল (সা.) তাঁর কাঁধে হাত রেখে বলেছিলেন, “হে আবু জর, তুমি দুর্বল, আর পদমর্যাদা হলো একটি আমানত। কেয়ামতের দিন এটি লজ্জিত ও অনুতপ্ত হওয়ার কারণ হবে; তবে ওই ব্যক্তির জন্য নয়, যে হকের সঙ্গে তা গ্রহণ করেছে এবং তার ওপর অর্পিত দায়িত্ব পালন করেছে।” (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১৮২৫)

আরও পড়ুন

২. মজলিস ও গোপনীয়তা: পারস্পরিক আলাপ-আলোচনা ও মজলিসের কথাগুলো আমানত। আল্লাহর রাসুল (সা.) বলেছেন, “যখন কোনো ব্যক্তি কথা বলার সময় (গোপনীয়তা রক্ষার জন্য) এদিক-ওদিক তাকায়, তবে তার সেই কথাটি আমানত।” (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস: ৪৮৬৮)

কোনো মজলিসের কথা অনুমতি ছাড়া বাইরে প্রচার করা খেয়ানতের শামিল। প্রখ্যাত তাবেয়ি মাকহুল (রহ.) বলতেন, কেউ কথা বলার সময় আশপাশে কেউ শুনছে কি না তা যাচাই করলে সেই কথাটি গোপন রাখা আপনার ওপর ফরজ হয়ে যায়। (ইমাম বাগাভি, শারহুস সুন্নাহ, ১৩/৪৬, আল-মাকতাবুল ইসলামি, বৈরুত, ১৯৮৩)

৩. শরীর ও স্বাস্থ্যের আমানত: আমাদের এই দেহ মহান আল্লাহর দেওয়া একটি বড় আমানত। চোখ, কান, অন্তকরণ—প্রতিটি অঙ্গ সম্পর্কে কেয়ামতের দিন জবাবদিহি করতে হবে। (সুরা ইসরা, আয়াত: ৩৬)

বেপরোয়া গাড়ি চালানো বা নেশাদ্রব্য গ্রহণের মাধ্যমে নিজের শরীরকে ঝুঁকির মুখে ফেলা এই আমানতের খেয়ানত। শরীরকে ইবাদতের উপযুক্ত রাখা এবং ব্যায়াম ও সুষম খাদ্যের মাধ্যমে একে রোগমুক্ত রাখার চেষ্টা করা আমানতদারির অংশ।

৪. দাম্পত্য জীবনের আমানত: বিবাহের মাধ্যমে একজন স্বামী তার স্ত্রীর শরীর, আত্মা, সম্মান ও সম্পদের আমানত গ্রহণ করে। আল্লাহর রাসুল (সা.) বিদায় হজের ভাষণে বলেছিলেন, “তোমরা নারীদের ব্যাপারে আল্লাহকে ভয় করো, কেননা তোমরা তাদেরকে আল্লাহর আমানতের মাধ্যমে গ্রহণ করেছ।” (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১২১৮)

স্বামী-স্ত্রীর ব্যক্তিগত সম্পর্কের কথা প্রচার করাকে ইসলামের ইতিহাসে নিকৃষ্টতম খেয়ানত হিসেবে গণ্য করা হয়েছে। আল্লাহর রাসুল (সা.) বলেছেন, “কেয়ামতের দিন আল্লাহর কাছে মর্যাদার দিক থেকে নিকৃষ্টতম ব্যক্তি হবে সে, যে তার স্ত্রীর সঙ্গে মিলিত হয় এবং স্ত্রীও তার সঙ্গে মিলিত হয়, অতঃপর সে স্ত্রীর গোপনীয়তা ফাঁস করে দেয়।” (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১৪৩৭)

যে তোমার কাছে আমানত রেখেছে তার আমানত আদায় করো, আর যে তোমার সঙ্গে খেয়ানত করেছে তুমি তার সঙ্গে খেয়ানত করো না।
সুনানে আবু দাউদ, হাদিস: ৩৫৩৫
আরও পড়ুন

৫. সন্তানের আমানত: সন্তানরা মা-বাবার কাছে আল্লাহর পক্ষ থেকে গচ্ছিত আমানত। তাদের কেবল ভালো খাবার বা দামি পোশাক দিলেই দায়িত্ব শেষ হয় না। তাদের নৈতিক ও আদর্শিক শিক্ষা দেওয়া এবং ইবাদতে অভ্যস্ত করা মা-বাবার প্রধান আমানত।

আল্লাহর রাসুল (সা.) বলেছেন, “প্রত্যেক তত্ত্বাবধায়ককেই তার অধীনস্থদের সম্পর্কে জবাবদিহি করতে হবে; এমনকি একজন ব্যক্তি তার স্ত্রী ও সন্তান সম্পর্কেও জিজ্ঞাসিত হবে।” (মুসনাদে আবু আওয়ানা, হাদিস: ৪৮৮৭)

‘খেয়ানতকারীর সঙ্গেও খেয়ানত নয়’

ইসলামের উদারতা ও মহানুভবতা এখানেই যে কেউ আপনার সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করলেও আপনি তার সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করতে পারেন না।

আল্লাহর রাসুল (সা.) বলেছেন, “যে তোমার কাছে আমানত রেখেছে তার আমানত আদায় করো, আর যে তোমার সঙ্গে খেয়ানত করেছে তুমি তার সঙ্গে খেয়ানত করো না।” (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস: ৩৫৩৫)

এটি কেবল একটি চারিত্রিক গুণ নয়, বরং এটি মন্দের বিপরীতে ভালো দিয়ে জয় করার একটি খোদায়ী কৌশল। (সুরা ফুসসিলাত, আয়াত: ৩৪)।

আমানতদারি কেবল ব্যক্তিগত গুণ নয়, বরং এটি একটি সুসভ্য ও নিরাপদ সমাজ গঠনের মূল ভিত্তি। যেখানে আমানতদারি নেই, সেখানে অবিশ্বাস, দুর্নীতি ও বিশৃঙ্খলা বাসা বাঁধে।

একজন প্রকৃত মুমিন হিসেবে আমাদের জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে—ব্যবসায়, চাকরিতে, পরিবারে এবং রাষ্ট্রীয় দায়িত্বে—আমানতদারির পরাকাষ্ঠা প্রদর্শন করতে হবে। আমানত রক্ষার মাধ্যমেই আমরা আল্লাহর সন্তুষ্টি এবং কেয়ামতের দিন লাঞ্ছনা থেকে মুক্তি পেতে পারি।

আরও পড়ুন