অনেক সময় দেখা যায়, সুস্থ-সবল শিশু হঠাৎ করে রাতে অস্থির হয়ে উঠছে, ঘুমের মধ্যে চমকে উঠছে কিংবা দীর্ঘক্ষণ ধরে অহেতুক কাঁদছে।
চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় এর বিভিন্ন শারীরিক কারণ থাকতে পারে, তবে ইসলামের আধ্যাত্মিক ও মনস্তাত্ত্বিক দর্শনে এর নেপথ্যে কিছু সূক্ষ্ম কারণ এবং তার কার্যকর প্রতিকার বর্ণিত হয়েছে।
শিশুদের সুরক্ষায় যে দোয়া ও জিকিরের ঢাল প্রয়োজন, অনেক ক্ষেত্রে অভিভাবকরা তা দিতে ভুলে যান। ফলে শিশুরা শয়তানের কুপ্রভাবের (আসর) শিকার হয়।
শিশুদের অস্থিরতার আধ্যাত্মিক কারণসমূহ
যখন কোনো ঘরে নিয়মিত পবিত্র কোরআন তেলাওয়াত করা হয় না, যেখানে নামাজ ও দোয়ার চর্চা নেই, সেখানে এক ধরনের আধ্যাত্মিক শূন্যতা তৈরি হয়, ফেরেশতাদের আগমন রহিত হয়ে যায়।
ইসলামে নিষিদ্ধ নানাবিধ অনুষঙ্গ যেমন—গান-বাজনা, প্রাণীর ছবি ও মূর্তির প্রদর্শন এবং অপ্রয়োজনে কুকুর পোষার ফলেও সেই ঘরে শয়তানের প্রভাব বৃদ্ধি পায়।
শিশুদের সুরক্ষায় যে দোয়া ও জিকিরের ঢাল প্রয়োজন, অনেক ক্ষেত্রে অভিভাবকরা তা দিতে ভুলে যান। ফলে শিশুরা শয়তানের প্ররোচনা বা কুপ্রভাবের (আসর) শিকার হয়। এর ফলে তাদের মধ্যে অনিদ্রা, ভয় পাওয়া এবং অতিরিক্ত কান্নার প্রবণতা দেখা দেয়।
শিশু সুরক্ষায় আল্লাহর রাসুলের সুন্নাহ
আল্লাহর রাসুল (সা.) হাসান ও হুসাইনকে নিচের দোয়ার মাধ্যমে আল্লাহর আশ্রয়ে দিতেন এবং বলতেন, তোমাদের আদি পিতা (ইব্রাহিম আলাইহিস সালাম) এই দোয়ার মাধ্যমেই ইসমাইল ও ইসহাককে আল্লাহর আশ্রয়ে রাখতেন:
উচ্চারণ: আউজু বিকালি মাতিল্লাহিত তাম্মাতি, মিন কুল্লি শায়তানিওঁ ওয়া হাম্মাহ, ওয়া মিন কুল্লি আইনিল লাম্মাহ।
অর্থ: আমি আল্লাহর নিখুঁত কালিমাসমূহের আশ্রয়ে নিচ্ছি প্রতিটি শয়তান ও বিষধর জন্তু থেকে এবং প্রতিটি ক্ষতিকর নজর থেকে। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৩৩৭১)
যখন রাত শুরু হয় অথবা তোমরা সন্ধ্যায় উপনীত হও, তখন তোমাদের শিশুদের ঘরের ভেতর আটকে রাখো। কারণ এই সময়ে শয়তানরা ছড়িয়ে পড়ে।সহিহ বুখারি, হাদিস: ৩৩০৪
এই দোয়ায় ‘কালিমাতুল্লাহ’ বা আল্লাহর বাণী দ্বারা উদ্দেশ্য হলো তাঁর কালাম বা সিদ্ধান্ত। ‘তাম্মাহ’ বা পূর্ণাঙ্গ বলতে এমন শক্তিশালী বাক্য বোঝানো হয়েছে যার কোনো ত্রুটি নেই এবং যা মানুষের জন্য শেফা ও বরকতস্বরূপ।
দোয়াটিতে 'হাম্মাহ' দ্বারা বিষধর প্রাণীর অনিষ্ট এবং 'আইনিল লাম্মাহ' দ্বারা মানুষের অশুভ দৃষ্টি বা বদনজর থেকে বাঁচার প্রার্থনা করা হয়েছে। শিশুদের ওপর বদনজরের প্রভাব একটি বাস্তব সত্য, যা তাদের অসুস্থ ও অস্থির করে তোলে।
গোধূলি লগ্নে সতর্কবার্তা
শিশুদের অহেতুক কান্নার অন্যতম কারণ হলো সন্ধ্যার সময় তাদের ঘরের বাইরে রাখা।
হাদিসে এই সময়ে বিশেষ সতর্কতা অবলম্বনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, “যখন রাত শুরু হয় অথবা তোমরা সন্ধ্যায় উপনীত হও, তখন তোমাদের শিশুদের ঘরের ভেতর আটকে রাখো। কারণ এই সময়ে শয়তানরা ছড়িয়ে পড়ে।” (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৩৩০৪)
রাতের প্রথম প্রহর পার হয়ে গেলে শিশুদের ছাড় দেওয়া যেতে পারে, তবে ঘরের দরজা আল্লাহর নাম নিয়ে বন্ধ করতে হবে। (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২০১২)
শয়তান বা জিনদের এই বিচরণ ও ছিনিয়ে নেওয়ার (খতফাহ) ক্ষমতা থেকে শিশুদের রক্ষা করতে ঠিক সূর্যাস্তের সময় তাদের বাইরে খেলতে দেওয়া বা চিৎকার করতে দেওয়া অনুচিত।
অনিদ্রা ও রাতের ভয়ের দোয়া
যদি কোনো শিশু ঘুমের মধ্যে চমকে ওঠে বা ভয় পায়, তবে তার জন্য বিশেষ দোয়ার কথা হাদিসে এসেছে। রাসুল (সা.) ঘুমের ঘোরে ভয়ের চিকিৎসার জন্য এই দোয়াটি শেখাতেন,
উচ্চারণ: আউজু বিকালি মাতিল্লাহিত তাম্মাতি মিন গাদাবিহি ওয়া শাররি ইবাদিহি, ওয়া মিন হামাজাতিল শায়াতিনি ওয়া আইঁ ইয়াহদুরুনি।
অর্থ: আমি আল্লাহর পরিপূর্ণ কালিমাসমূহের আশ্রয় প্রার্থনা করছি তাঁর ক্রোধ থেকে, তাঁর বান্দাদের অনিষ্ট থেকে, শয়তানের কুমন্ত্রণা থেকে এবং তাদের উপস্থিতি থেকে। (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস: ৩৮৯৩)
আবদুল্লাহ ইবনে আমর (রা.) তাঁর সন্তানদের মধ্যে যারা বুদ্ধিমান ছিল তাদের এই দোয়াটি মুখস্থ করাতেন, আর যারা ছোট ছিল তাদের কাগজে লিখে গলায় ঝুলিয়ে দিতেন। (সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ৩৫২৮)
আধুনিক চিকিৎসাবিদ্যার পাশাপাশি যদি সুন্নাহসম্মত এই আমলগুলো করা হয়, তবে ইনশাআল্লাহ শিশুরা অনিদ্রা, অহেতুক ভয় ও কান্নার হাত থেকে রক্ষা পাবে।
অভিভাবকদের করণীয়
শিশুর অস্থিরতা নিরসনে বাবা-মায়ের কিছু করণীয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ:
১. দোয়া: বাবা তার হাত শিশুর মাথায় রেখে সুরা ফাতিহা, সুরা ইখলাস, সুরা ফালাক ও সুরা নাস পড়ে ফুঁ দেবেন। আল্লাহর রাসুল (সা.) নিজের দুই হাতে ফুঁ দিয়ে শরীর মুছতেন, শিশুদের ক্ষেত্রেও এই আমলটি কার্যকর। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৫০১৭)
২. আয়াতুল কুরসি: যে শিশু কথা বুঝতে পারে, তাকে ঘুমানোর আগে আয়াতুল কুরসি ও শেষ দুই সুরা পড়ার অভ্যাস করাতে হবে। আর শিশু ছোট হলে অভিভাবক নিজে তা পড়ে শিশুর গায়ে ফুঁ দেবেন।
৩. বদনজরের চিকিৎসা: শিশু যদি দীর্ঘক্ষণ ধরে কাঁদতে থাকে এবং কোনো শারীরিক রোগ ধরা না পড়ে, তবে বুঝতে হবে সে বদনজরের শিকার হতে পারে।
একবার আল্লাহর রাসুল (সা.) একটি শিশুর কান্নার শব্দ শুনে বললেন, “তোমাদের এই শিশুটি কেন কাঁদছে? তোমরা কেন তাকে বদনজর থেকে রক্ষার জন্য ‘রুকইয়াহ’ চিকিৎসা করাচ্ছ না?” (মুসনাদে আহমদ, হাদিস: ২৪৪৪৭)
শিশুদের লালন-পালন কেবল শারীরিক যত্নের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, বরং তাদের আত্মিক ও আধ্যাত্মিক সুরক্ষাও বাবা-মায়ের দায়িত্ব। আধুনিক চিকিৎসাবিদ্যার পাশাপাশি যদি সুন্নাহসম্মত এই আমলগুলো করা হয়, তবে ইনশাআল্লাহ শিশুরা অনিদ্রা, অহেতুক ভয় ও কান্নার হাত থেকে রক্ষা পাবে।