মহানবী (সা.)-এর প্রিয় একটি উট ছিল, যা কেবল তাঁর যাতায়াতের বাহন ছিল না, বরং ছিল নবুয়তের বহু গুরুত্বপূর্ণ ঘটনার সাক্ষী। হিজরত থেকে শুরু করে মক্কা বিজয়—নবীজির জীবনের বাঁক বদলানো মুহূর্তগুলোতে এই উটটি বিশেষ ভূমিকা পালন করেছে।
সিরাত ও হাদিসের কিতাবগুলোতে কাসওয়া নামের এই উটটির বর্ণনা অত্যন্ত মর্যাদার সঙ্গে করা হয়েছে।
নবীজির উটের নাম
মহানবী (সা.)-এর সবচেয়ে বিখ্যাত উটটির নাম ‘কাসওয়া’। তবে কোনো কোনো বর্ণনায় ‘আদবা’ ও ‘জাদআ’ নামের উটেরও উল্লেখ পাওয়া যায়। অনেক ঐতিহাসিকের মতে, কাসওয়া ও আদবা একই উটের দুটি ভিন্ন নাম।
আরবি ভাষায় ‘কাসওয়া’ শব্দের আভিধানিক অর্থ হলো যার কানের অগ্রভাগ কাটা।
তবে অধিকাংশ গবেষকের মতে, নবীজির উটটির কান আসলে কাটা ছিল না; বরং এর দ্রুতগতি ও আভিজাত্যের কারণে রূপকভাবে একে এই নামে ডাকা হতো। (ইবনে হাজার আসকালানি, ফাতহুল বারি, ৬/৬৯, দারুল মারিফাহ, বৈরুত, ১৩৭৯ হিজরি)
উটটি চলতে চলতে মদিনার একটি খালি জায়গায় গিয়ে বসে পড়ে। যেখানে উটটি বসেছিল, সেখানেই পরবর্তীকালে মসজিদে নববী নির্মিত হয়।
হিজরতের সেই ঐতিহাসিক মুহূর্ত
মক্কা থেকে মদিনায় হিজরতের সময় কাসওয়াই ছিল নবীজি (সা.)-এর সফরসঙ্গী। মদিনায় পৌঁছানোর পর নবীজিকে বরণ করে নিতে আনসার সাহাবিদের মধ্যে প্রতিযোগিতা শুরু হয়। প্রত্যেকেই চাইছিলেন নবীজি (সা.) তাঁর বাড়িতে অবস্থান করুন।
তখন নবীজি (সা.) বলেছিলেন, “উটকে ছেড়ে দাও, এটি আল্লাহর পক্ষ থেকে আদিষ্ট।” (ইবনে হিশাম, আস-সিরাহ আন-নাবাবিয়্যাহ, ২/৪৯৪, মোস্তফা আল-বাবি আল-হালাবি, মিসর, ১৯৫৫)
উটটি চলতে চলতে মদিনার একটি খালি জায়গায় গিয়ে বসে পড়ে। যেখানে উটটি বসেছিল, সেখানেই পরবর্তীকালে মসজিদে নববী নির্মিত হয়। এই ঘটনাটি প্রমাণ করে, কাসওয়ার গতিবিধিও ছিল মহান আল্লাহর বিশেষ ইশারার অধীন।
হোদাইবিয়ার সন্ধিতে কাসওয়ার ভূমিকা
হোদাইবিয়ার সন্ধির সময়ও কাসওয়ার এক অলৌকিক আচরণ প্রকাশ পায়। মক্কার উপকণ্ঠে পৌঁছানোর পর উটটি হঠাৎ বসে পড়ে এবং আর নড়াচড়া করতে চায় না। সাহাবিরা তখন বলতে লাগলেন, ‘কাসওয়া ক্লান্ত হয়ে থেমে গেছে’।
কিন্তু নবীজি (সা.) বললেন, “কাসওয়া ক্লান্ত হয়নি, আর এটি তার স্বভাবও নয়; বরং তাকে সেই সত্তা রুখে দিয়েছেন, যিনি হস্তিবাহিনীকে মক্কায় প্রবেশ থেকে রুখে দিয়েছিলেন।” (সহিহ বুখারি, হাদিস: ২৭৩১)
এরপরই হোদাইবিয়ার সেই ঐতিহাসিক সন্ধি সম্পাদিত হয়।
সাহাবিদের কাছেও কাসওয়া ছিল অত্যন্ত প্রিয় ও বরকতময়। তাঁরা এই উটটিকে কেবল একটি পশু হিসেবে নয়, বরং আল্লাহর নির্দেশের বাহক ও নবীজির ছায়াসঙ্গী হিসেবে সম্মান করতেন।
উটটির শেষ বিদায় যেভাবে হলো
পশু-পাখির প্রতি নবীজি (সা.)-এর দয়া ও সহমর্মিতার এক উজ্জ্বল উদাহরণ ছিল কাসওয়ার প্রতি তাঁর আচরণ। তিনি কাসওয়ার খাবারের ব্যাপারে যত্নশীল ছিলেন এবং সফরের ক্লান্তি বুঝতে পারতেন। হাদিসের বর্ণনা অনুযায়ী, নবীজির ইন্তেকালের পর কাসওয়া শোকাতুর হয়ে পড়েছিল।
নবীজির বিয়োগব্যথা সহ্য করতে না পেরে উটটি খাবার ও পানি গ্রহণ বন্ধ করে দেয় এবং কয়েকদিন পরেই মারা যায়। (ইবনে সাদ, আত-তাবাকাতুল কুবরা, ১/৪৯৬, দারু সাদির, বৈরুত, ১৯৬৮)
সাহাবিদের চোখে কাসওয়া
সাহাবিদের কাছেও কাসওয়া ছিল অত্যন্ত প্রিয় ও বরকতময়। তাঁরা এই উটটিকে কেবল একটি পশু হিসেবে নয়, বরং আল্লাহর নির্দেশের বাহক ও নবীজির ছায়াসঙ্গী হিসেবে সম্মান করতেন। বদর যুদ্ধেও নবীজি (সা.) এই উট ব্যবহার করে যুদ্ধের ময়দান পরিদর্শন ও তদারকি করেছিলেন।
মহানবী (সা.)-এর উট কাসওয়ার জীবন থেকে মুসলিম উম্মাহর জন্য বড় শিক্ষা হলো আল্লাহর সিদ্ধান্তের ওপর পূর্ণ আস্থা রাখা। নবীজির জীবনাচারের প্রতিটি ক্ষুদ্র অনুষঙ্গও যে কতটা গুরুত্ববহ ও তাৎপর্যপূর্ণ, কাসওয়ার ইতিহাস তারই এক জীবন্ত উদাহরণ।