মন ভেঙে গেলে যে প্রার্থনা শান্তি দেবে

ছবি: পেক্সেলস

হাত থেকে অসাবধানতাবশত কাচ, মাটি বা সিরামিকের কোনো পাত্র মেঝেতে পড়ে ভেঙে গেলে সাধারণত আমরা কী করি? প্রিয় জিনিসটি নষ্ট হওয়ার বেদনায় কিছুক্ষণ হয়তো মন খারাপ থাকে, তারপর ভাঙা টুকরাগুলো জড়ো করে ডাস্টবিনে ফেলে দিই।

কিন্তু জাপানি সংস্কৃতির একটি ঐতিহ্যবাহী দৃষ্টিভঙ্গি একেবারেই ভিন্ন। তারা কোনো ভাঙা পাত্রের টুকরা ফেলে দেয় না; বরং তার প্রতিটি ফাটল ও জোড়ামুখ সোনা বা রুপার গুঁড়া মেশানো বিশেষ রেজিন দিয়ে নিখুঁতভাবে জুড়ে দেয়। একে বলে ‘কিনৎসুকুরোই’ (সোনার প্রলেপে মেরামত)।

পাত্রটিতে ফাটল যত বেশি থাকে, সোনার প্রলেপ সেখানে তত বেশি লাগে। রূপ নেয় এক অনন্য শিল্পকর্মে। ভাঙনচিহ্ন আড়াল করার বদলে তারা সেটিকে গর্বের সঙ্গে দৃশ্যমান করে তোলে। একজন বিশ্বাসী মানুষের দৃষ্টিতে এটি মানবজীবনের এক চিরন্তন আধ্যাত্মিক সত্যের রূপক।

দুঃখ-কষ্টই মানুষকে অহমিকা ভেঙে আল্লাহর সামনে সমর্পিত হওয়ার সুযোগ করে দেয়। যখন সব অবলম্বন ব্যর্থ প্রমাণিত হয়, তখন সেজদায় অশ্রুসিক্ত চোখে সে বলে, ‘আল্লাহ, আপনি ছাড়া তো আমার আর কোনো আশ্রয় নেই।’

জীবনের ফাটল ও মানবিক ভাঙন

জীবনচলার পথে কতবার যে আমাদের অন্তর ভেঙে চুরমার হয়ে যায়! কোনো বড় ব্যর্থতা, প্রিয়জনকে হারানো, সম্পর্কের বিচ্ছেদ, তীব্র মানসিক একাকিত্ব কিংবা অতীতের ভুলের অনুশোচনা আমাদের মনকে ক্ষতবিক্ষত করে। মানুষ ভাবে, ‘আমার সবকিছু বুঝি শেষ হয়ে গেল?’

কিন্তু জীবনসংগ্রামের সেই দুঃসহ বেদনার মুহূর্তেও পরম করুণাময় আল্লাহ বান্দাকে পরিত্যাগ করেন না। বরং এই দুঃখ-কষ্টই মানুষকে অহমিকা ভেঙে আল্লাহর সামনে সমর্পিত হওয়ার সুযোগ করে দেয়। যখন সব অবলম্বন ব্যর্থ প্রমাণিত হয়, তখন সেজদায় অশ্রুসিক্ত চোখে সে বলে, ‘আল্লাহ, আপনি ছাড়া তো আমার আর কোনো আশ্রয় নেই।’

প্রকৃতির দিকে তাকান। আকাশে ঘন মেঘ জমাট বাঁধে, তারপর ভেঙে বৃষ্টি হয়ে ঝরে পড়ে। মেঘের আত্মবিসর্জনই শুষ্ক মৃত জমিনে নতুন প্রাণের স্পন্দন এনে দেয়। জীবনের কিছু কিছু ভাঙন তাই ধ্বংসের শেষ অধ্যায় নয়; বরং নতুন দিগন্তের উন্মোচন।

আরও পড়ুন

‘আল-জাব্বার’: যিনি ভগ্ন হৃদয়কে জুড়ে দেন

আল্লাহ–তাআলার একটি গুণবাচক নাম হলো ‘আল-জাব্বার’। এর একটি অর্থ যেমন পরাক্রমশালী ও মহাশক্তিময়, তেমনি আরবি ‘জাবর’ শব্দমূলের আরেকটি অন্তর্নিহিত অর্থ হলো, ভাঙা হাড় জোড়া লাগানো, অপূর্ণতা দূর করা এবং ক্ষতিগ্রস্তকে পরম মমতায় পূর্ণতা দেওয়া।

অর্থাৎ তিনি এমন এক সত্তা, যিনি বান্দার ভগ্ন হৃদয়কে স্বীয় প্রজ্ঞা ও রহমতের পরশে পুনরুদ্ধার করেন।

মুমিনের প্রতিটি বিষয়ই আশ্চর্যজনক! তার সবকিছুতেই কল্যাণ নিহিত থাকে। যদি সে সুখ ও আনন্দের মুখ দেখে, তবে শোকর আদায় করে—তা তার জন্য কল্যাণ বয়ে আনে। আর যদি সে দুঃখ-কষ্টে পতিত হয়, তবে সে ধৈর্য ধারণ করে—সেটিও তার জন্য মহা কল্যাণের কারণ হয়।
সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২৯৯৯

রাসুল (সা.) দুই সেজদার মধ্যবর্তী সংক্ষিপ্ত বৈঠকে যে দোয়া পড়তেন, সেখানে এই শব্দটির সরাসরি প্রয়োগ রয়েছে, ‘আল্লাহুম্মাগফির লি, ওয়ারহামনি, ওয়াজবুরনি, ওয়াহদিনি, ওয়ারজুকনি’

অর্থ: ‘হে আল্লাহ, আমাকে ক্ষমা করুন, আমার প্রতি দয়া করুন, আমার ভাঙন ও অপূর্ণতা পূরণ করে দিন (ওয়াজবুরনি), আমাকে সঠিক পথ প্রদর্শন করুন এবং আমাকে রিজিক দান করুন।’ (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস: ৮৫০)

নামাজের প্রতিটি রাকাতে দুই সেজদার মাঝে মুমিন এভাবে আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করে, যিনি অন্তরের গহিনের সব ভাঙচুর জানেন এবং তা মেরামত করার অসীম ক্ষমতা রাখেন।

ভগ্ন হৃদয়ে বিশ্বাসের প্রলেপ

‘কিনৎসুকুরোই’ শিল্পে ভাঙা মাটির পাত্র জোড়া লাগাতে সোনা ব্যবহার করা হয়। আর একজন মুমিনের ভাঙা অন্তর জোড়া লাগানোর খাঁটি উপাদান হলো—সবর (ধৈর্য), তাওয়াক্কুল (আল্লাহর ওপর নির্ভরতা), তওবা ও ইস্তিগফার (অনুতাপ ও ক্ষমা প্রার্থনা) এবং আল্লাহর ফয়সালায় সন্তুষ্ট থাকা (রেজা বিল কাজা)।

আরও পড়ুন

রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘মুমিনের প্রতিটি বিষয়ই আশ্চর্যজনক! তার সবকিছুতেই কল্যাণ নিহিত থাকে। যদি সে সুখ ও আনন্দের মুখ দেখে, তবে শোকর আদায় করে—তা তার জন্য কল্যাণ বয়ে আনে। আর যদি সে দুঃখ-কষ্টে পতিত হয়, তবে সে ধৈর্য (সবর) ধারণ করে—সেটিও তার জন্য মহা কল্যাণের কারণ হয়।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২৯৯৯)

জাপানি শিল্পে সোনা হলো উপাদান আর মানুষ কারিগর। কিন্তু বিশ্বাসীর জীবনে আত্মিক উপাদানগুলোর সমন্বয়ে ভাঙা মনকে নতুন করে গড়ে তোলার আসল কারিগর হলেন আল্লাহ নিজেই।

উপকরণ হিসেবে বান্দা যত নিষ্ঠার সঙ্গে সবর ও তাওয়াক্কুল আঁকড়ে ধরবে, আল্লাহর রহমতের প্রলেপে তার ক্ষতবিক্ষত হৃদয় তত বেশি প্রজ্ঞাময় ও দৃঢ় হয়ে উঠবে।

আমরা অনেক সময় ভাবি, আঘাত পাওয়ার পর জীবনটা বুঝি হুবহু আগের জায়গায় ফিরে যাবে। বাস্তবে সব সময় তা হয় না। হারিয়ে যাওয়া সবকিছু ফিরে আসে না, কোনো কোনো ক্ষতের দাগ সারা জীবন রয়ে যায়।

ভেঙে যাওয়া হৃদয়ের মূল্য

আমরা অনেক সময় ভাবি, আঘাত পাওয়ার পর জীবনটা বুঝি হুবহু আগের জায়গায় ফিরে যাবে। বাস্তবে সব সময় তা হয় না। হারিয়ে যাওয়া সবকিছু ফিরে আসে না, কোনো কোনো ক্ষতের দাগ সারা জীবন রয়ে যায়।

হ্যাঁ, একটি ভাঙা পাত্র যেমন সোনার প্রলেপ পাওয়ার পর আগের অবস্থার চেয়েও বেশি মূল্যবান ও দৃষ্টিনন্দন হয়ে ওঠে, তেমনি দুঃখ-কষ্ট ও ব্যর্থতায় ভেঙে পড়া মানুষও আল্লাহর দিকে ফিরলে আত্মার গভীরতায় সমৃদ্ধ হতে পারে।

পার্থিব এই জীবন নিখুঁত নয়, আমরা কেউই ত্রুটির ঊর্ধ্বে নই। কিন্তু সেই অসম্পূর্ণতা ও দাগ নিয়েই যখন বান্দা সেজদায় অশ্রু ফেলে, তখন তার ভাঙা জীবনই সর্বোচ্চ অর্থপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

তাই হৃদয়ের ভাঙন নিয়ে লজ্জিত না হয়ে সেজদায় লুটিয়ে বলাই বিশ্বাসীর শক্তি। বলুন, ‘ওয়াজবুরনি’, হে আল্লাহ, আমার ভগ্ন হৃদয়কে আপনার রহমত দিয়ে জুড়ে দিন।

আরও পড়ুন