কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) হাত ধরে বর্তমানে সবচেয়ে বড় যে মনস্তাত্ত্বিক ও সামাজিক সংকটটি তৈরি হয়েছে, তা হলো নিখুঁতভাবে মানুষের কণ্ঠ নকল করা (ভয়েস ক্লোনিং) এবং হুবহু মানুষের অবয়ব তৈরি করে ভুয়া ভিডিও বানানো, যাকে প্রযুক্তির ভাষায় বলা হচ্ছে ‘ডিপফেক’।
এখন ইন্টারনেটে এমন সব ভিডিও বা অডিও ক্লিপ ছড়াচ্ছে, যা দেখে সাধারণভাবে বোঝার কোনো উপায় নেই যে এটি আসল, নাকি সম্পূর্ণ কৃত্রিম উপায়ে তৈরি করা মিথ্যা।
বিনোদন, রাজনৈতিক ফায়দা কিংবা ব্যক্তিগত প্রতিশোধের হাতিয়ার হিসেবে এই ডিপফেক প্রযুক্তির মাধ্যমে মানুষের সম্মানহানি ও সামাজিক বিশৃঙ্খলা চরমে পৌঁছেছে। মানবসৃষ্ট মিথ্যার বিরুদ্ধে ইসলামের অবস্থান অত্যন্ত কঠোর ও দূরদর্শী।
কোনো নেতার কণ্ঠ বা কোনো সাধারণ মানুষের ভিডিও ক্লিপ দেখেই তা সত্য বলে গ্রহণ করার সুযোগ নেই, যতক্ষণ না তার উৎস ও সত্যতা শতভাগ নিশ্চিত হওয়া যাচ্ছে।
ইসলামে তথ্য যাচাইয়ের নীতি
অনেকেই কোনো তথ্য বা ভিডিও ইন্টারনেটে আসামাত্রই মানুষ তা সত্য বলে ধরে নেয় এবং মুহূর্তের মধ্যে তা হাজার হাজার মানুষের কাছে শেয়ার করে দেয়। ইসলাম কোনো তথ্য অন্ধভাবে বিশ্বাস করতে এবং তা যাচাই না করে প্রচার করতে কঠোরভাবে নিষেধ করেছে।
কোরআনে আল্লাহ–তাআলা ঘোষণা করেছেন, ‘হে মুমিনগণ, যদি কোনো পাপাচারী ব্যক্তি তোমাদের কাছে কোনো বার্তা নিয়ে আসে, তবে তোমরা তা ভালোভাবে যাচাই করে নাও; যেন অজ্ঞতাবশত তোমরা কোনো সম্প্রদায়ের ক্ষতি করে না বসো, যার ফলে পরে তোমাদের নিজেদের কৃতকর্মের জন্য অনুতপ্ত হতে হয়।’ (সুরা হুজুরাত, আয়াত: ৬)
সুতরাং কোনো নেতার কণ্ঠ বা কোনো সাধারণ মানুষের ভিডিও ক্লিপ দেখেই তা সত্য বলে গ্রহণ করার সুযোগ নেই, যতক্ষণ না তার উৎস ও সত্যতা শতভাগ নিশ্চিত হওয়া যাচ্ছে।
‘গুনাহে জারিয়া’র আধুনিক ফাঁদ
প্রাচীনকালে মানুষ মুখে মুখে মিথ্যা বলত, যা খুব বেশি হলে একটি নির্দিষ্ট অঞ্চলের মানুষের কান পর্যন্ত পৌঁছাত। কিন্তু আজকের এআই যুগে একটি ক্লিপ বা ডিপফেক ছবি তৈরি করে সোশ্যাল মিডিয়ায় ছেড়ে দিলে সেকেন্ডের মধ্যে তা কোটি মানুষের কাছে পৌঁছে যায়। ইসলামে একে বলা হয় ‘চলমান পাপ’ বা ‘গুনাহে জারিয়া’।
মহানবী (সা.) এ বিষয়ে সতর্ক করে বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি কোনো মন্দ রীতির সূচনা করবে, তার ওপর সেই মন্দ রীতির পাপ বর্তাবে এবং যারা এরপর সেই অনুযায়ী আমল করবে তাদের পাপের অংশও সে পাবে, এতে তাদের পাপ বিন্দুমাত্র কমবে না।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১০১৭)
নিশ্চয়ই যারা চরিত্রবান, সরলমনা মুমিন নারীদের প্রতি অপবাদ আরোপ করে, তারা দুনিয়া ও আখেরাতে অভিশপ্ত এবং তাদের জন্য রয়েছে মহাশাস্তি।কোরআন, সুরা নুর, আয়াত: ২৩
আপনি হয়তো ঘরে বসে মজার ছলে বা রাজনৈতিক আক্রোশ থেকে একজনের একটি ভুয়া ডিপফেক ভিডিও বানালেন; কিন্তু সেই ভিডিওটি আপনার মৃত্যুর পরও যত মানুষ দেখবে এবং তা দ্বারা বিভ্রান্ত হবে, তার সমপরিমাণ পাপ আপনার আমলনামায় প্রতিনিয়ত জমা হতে থাকবে।
প্রযুক্তির এই অদৃশ্য ফাঁদ মানুষের আখেরাতকে একনিমেষেই ধ্বংস করে দিতে পারে।
ভয়াবহ পরকালীন শাস্তি
ডিপফেক প্রযুক্তির সবচেয়ে নিষ্ঠুর শিকার হচ্ছেন ব্যক্তিমানুষ, বিশেষ করে নারীরা। কুরুচিপূর্ণ বা ভুয়া ভিডিও বানিয়ে মানুষের চরিত্র হনন করা বর্তমান ডিজিটাল যুগের অন্যতম বড় সহিংসতা। ইসলাম মানুষের রক্ত ও জানমালের মতোই তার ‘সম্মান ও সম্ভ্রমকে’ পবিত্র ও অপরিবর্তনীয় ঘোষণা করেছে।
মহানবী (সা.) তাঁর বিদায় হজের ঐতিহাসিক ভাষণে বলেছিলেন, ‘নিশ্চয়ই তোমাদের রক্ত, তোমাদের ধন-সম্পদ ও তোমাদের সম্মান তোমাদের জন্য পবিত্র (হারাম)।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৬৭)
অন্যের চরিত্রে মিথ্যা কালিমা লেপন করা এবং অপবাদ ছড়ানোকে ইসলামে ‘লাফজুল ইফক’ বা জঘন্য অপরাধ বলা হয়েছে।
কোরআনে আল্লাহ–তাআলা বলেন, ‘নিশ্চয়ই যারা চরিত্রবান, সরলমনা মুমিন নারীদের প্রতি অপবাদ আরোপ করে, তারা দুনিয়া ও আখেরাতে অভিশপ্ত এবং তাদের জন্য রয়েছে মহাশাস্তি।’ (সুরা নুর, আয়াত: ২৩)
এআই প্রযুক্তির আড়ালে লুকিয়ে যারা মানুষের সম্মান নিয়ে খেলা করছে, তারা মূলত আল্লাহর সেই অভিশাপ ও মহাশাস্তির দিকেই ধাবিত হচ্ছে।
অসত্য প্রচারের মনস্তাত্ত্বিক ব্যাধি
কণ্ঠ বা চেহারা নকল করে মানুষকে ধোঁকা দেওয়া এবং ভুয়া তথ্য ছড়িয়ে সমাজে গুজব তৈরি করার এই মানসিকতাকে ইসলাম সরাসরি মোনাফেকির লক্ষণ হিসেবে চিহ্নিত করেছে।
আমরা যখন কোনো ডিপফেক অডিও বা ভিডিও ফরোয়ার্ড করি, তখন আমরাও অবচেতনভাবেই সেই মিথ্যাবাদী ও গুজব উৎপাদনকারীদের চক্রে শামিল হয়ে যাই।
মহানবী (সা.) বলেছেন, ‘কোনো মানুষের মিথ্যাবাদী হওয়ার জন্য এতটুকুই যথেষ্ট যে সে যা শোনে (বা দেখে), তা-ই (যাচাই না করে) বর্ণনা করে বেড়ায়।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ৫)
আজকের গ্লোবাল ভিলেজে আমরা যখন কোনো ডিপফেক অডিও বা ভিডিও ফরোয়ার্ড করি, তখন আমরাও অবচেতনভাবেই সেই মিথ্যাবাদী ও গুজব উৎপাদনকারীদের চক্রে শামিল হয়ে যাই।
এআইয়ের এই যুগে সততা বজায় রাখা এবং চোখ-কান খোলা রেখে তথ্যের সত্যতা নিশ্চিত করা প্রত্যেক নাগরিক ও মুমিনের প্রধান দায়িত্ব। স্ক্রিনে যা দেখছেন, তা-ই সত্য নয়—এই আধুনিক বাস্তবতাকে আমাদের মেনে নিতে হবে এবং প্রতিটি তথ্য শেয়ার করার আগে তা গভীর নিখুঁতভাবে যাচাই করতে হবে।