খাবার শুধু ক্ষণিকের জন্য পেট ভরানোর মাধ্যম নয়; বরং এটি আমাদের শরীর, মনের শক্তি, কাজের সক্ষমতা ও দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। এমনকি আমাদের আত্মিক একাগ্রতা, ঘুম, মনস্তাত্ত্বিক রূপ ও দৈনন্দিন আচরণের ওপরও খাবারের প্রভাব সুদূরপ্রসারী।
ইসলাম খাবারকে সব সময় এক সুষম ভারসাম্যের মধ্যে রেখেছে। অন্যদিকে আধুনিক পুষ্টিবিজ্ঞানও ঠিক এই ভারসাম্য ও বৈচিত্র্যের ওপর জোর দেয়।
খাবারের প্লেটকে রঙিন ও বৈচিত্র্যময় করে তোলা সুস্থ থাকার একটি সহজ কৌশল। প্রতিদিনের খাদ্যতালিকায় বিভিন্ন রঙের শাকসবজি ও ফলমূল রাখা উচিত—যেমন সবুজ শাক, লাল টমেটো, হলুদ মিষ্টিকুমড়া, কমলা গাজর বা বেগুন।
১. শুধু ‘হালাল’ নয়, খাবার হতে হবে ‘তায়্যিব’
আমরা খাবার গ্রহণের ক্ষেত্রে ‘হালাল’ কি না—তা নিয়ে কমবেশি সচেতন। কিন্তু ইসলাম শুধু হালালেই সীমাবদ্ধ থাকতে বলেনি; বরং খাবারকে হতে বলেছে ‘তায়্যিব’। আল্লাহ–তাআলা বলেন, ‘হে মানুষ, পৃথিবীতে যা কিছু হালাল ও তায়্যিব, তা থেকে তোমরা আহার করো।’ (সুরা বাকারা, আয়াত: ১৬৮)
‘তায়্যিব’ শব্দটির ভেতরে খাবারের বিশুদ্ধতা, গুণগত মান, তাজা ভাব এবং পুষ্টিগুণের বিষয়টি নিহিত রয়েছে। (ইবনে কাসির, তাফসিরুল কুরআনিল আজিম, ১/১৯৭, দারুল কুতুবিল ইলমিয়াহ, বৈরুত)
তাই খাবার নির্বাচনের সময় শুধু হালাল হওয়ার পাশাপাশি তা শরীরের জন্য কতটা উপযোগী, কীভাবে উৎপাদিত হয়েছে এবং তাতে ক্ষতিকর কেমিক্যাল বা বিষাক্ত উপাদান আছে কি না—তা ভাবাও একজন সচেতন মুমিনের দায়িত্ব।
২. ভালো হলেও অতিভোজন নয়
খাদ্যাভ্যাসের অন্যতম মূল ভিত্তি হলো পরিমিতিবোধ। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ–তাআলা নির্দেশ দিয়েছেন, ‘তোমরা খাও ও পান করো, কিন্তু অপচয় কোরো না। নিশ্চয়ই তিনি অপচয়কারীদের পছন্দ করেন না।’ (সুরা আরাফ, আয়াত: ৩১)
মহানবী (সা.) দৈনন্দিন খাদ্যাভ্যাসে অতিরিক্ত আহারকে নিরুৎসাহিত করে বলেছেন, ‘আদম সন্তান তার পেটের চেয়ে নিকৃষ্ট কোনো পাত্র পূর্ণ করে না...যদি খেতেই হয়, তবে এক-তৃতীয়াংশ খাবারের জন্য, এক-তৃতীয়াংশ পানীয়র জন্য এবং এক-তৃতীয়াংশ শ্বাসপ্রশ্বাসের জন্য খালি রাখা উচিত।’ (সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ২৩৮০)
খেজুর, মধু বা দুধ অত্যন্ত পুষ্টিকর খাবার হলেও তা অতিরিক্ত পরিমাণে খেলে শরীরের ক্ষতি হতে পারে। আধুনিক পুষ্টিবিজ্ঞানও প্রমাণ করেছে যে অতিভোজন স্থূলতা, ডায়াবেটিস ও হৃদ্রোগের অন্যতম প্রধান কারণ।
আবার বিপরীতে একদম কম খাওয়াও শরীরকে পুষ্টিহীন করে তোলে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাসের যে চারটি মূলনীতি নির্ধারণ করেছে—তার অন্যতম হলো পরিমিতি ও পর্যাপ্ততা। (বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, হেলদি ডায়েট গাইডলাইন, ২০২৬)
আদম সন্তান তার পেটের চেয়ে নিকৃষ্ট কোনো পাত্র পূর্ণ করে না...যদি খেতেই হয়, তবে এক-তৃতীয়াংশ খাবারের জন্য, এক-তৃতীয়াংশ পানীয়র জন্য এবং এক-তৃতীয়াংশ শ্বাসপ্রশ্বাসের জন্য খালি রাখা উচিত।সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ২৩৮০
৩. থালায় ‘রংধনু’ খাদ্যের বৈচিত্র্য
খাবারের প্লেটকে রঙিন ও বৈচিত্র্যময় করে তোলা সুস্থ থাকার একটি সহজ কৌশল। প্রতিদিনের খাদ্যতালিকায় বিভিন্ন রঙের শাকসবজি ও ফলমূল রাখা উচিত—যেমন সবুজ শাক, লাল টমেটো, হলুদ মিষ্টিকুমড়া, কমলা গাজর বা বেগুন।
গবেষণায় দেখা গেছে, বিভিন্ন রঙের ফল ও সবজিতে ভিন্ন ভিন্ন ভিটামিন, খনিজ এবং উদ্ভিজ্জ অ্যান্টি–অক্সিডেন্ট (ফাইটোকেমিক্যাল) থাকে, যা শরীরের রোগ প্রতিরোধক্ষমতা বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। (হার্ভার্ড টি এইচ চ্যান স্কুল অব পাবলিক হেলথ, দ্য নিউট্রিশন সোর্স: ভেজিটেবলস অ্যান্ড ফ্রুটস)
তাই প্রতিদিনের থালায় প্রোটিনের (মাছ, মাংস, ডিম বা ডাল) পাশাপাশি বিভিন্ন রঙের সবজির সমন্বয় ঘটানো বুদ্ধিমত্তার পরিচয়।
৪. কম প্রক্রিয়াজাত খাবারের প্রাধান্য
ভালো খাদ্যাভ্যাস মানে শুধু ক্ষতিকর খাবার বাদ দেওয়া নয়; বরং তালিকায় পুষ্টিকর খাবারের উপস্থিতি বাড়ানো। প্রাকৃতিকভাবে পাওয়া ফল, শাকসবজি, ডাল, লাল চাল-আটা (হোল গ্রেন), বাদাম, বীজ, মাছ ও ডিম খাদ্যতালিকায় রাখা উচিত।
বিপরীতে অতিরিক্ত চিনিযুক্ত কোমল পানীয়, প্যাকেটজাত স্ন্যাকস, ডুবোতেলে ভাজা ও অতি প্রক্রিয়াজাত (আল্ট্রা প্রসেস্ড) খাবার নিয়মিত না খাওয়াই উত্তম। ডব্লিউএইচওর খাদ্য নির্দেশিকায় অতিরিক্ত লবণ, প্রক্রিয়াজাত শর্করা ও অসম্পৃক্ত চর্বি এড়িয়ে প্রাকৃতিক খাবারকে খাদ্যের মূল ভিত্তি করার তাগিদ দেওয়া হয়েছে। (বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, হেলদি ডায়েট গাইডলাইন, ২০২৬)
৫. খাদ্যাভ্যাসে সুন্নাহ ও আদব
কোরআন ও হাদিসের বর্ণনা অনুযায়ী খেজুর, মধু, দুধ, জলপাই, ডালিম বা লাউ খুবই বরকতপূর্ণ খাবার। তবে শুধু এগুলো দিয়ে একটি নির্দিষ্ট ‘ফিক্সড ডায়েট চার্ট’ বানিয়ে নেওয়া সুন্নাহর একমাত্র উদ্দেশ্য নয়।
বরং যেকোনো দেশীয় হালাল ও পুষ্টিকর খাবার—যেমন ভাত, ডাল, দেশি মাছ ও সবজি পরিমিতভাবে খাওয়াই সুন্নাহর মূল চেতনা।
প্রকৃতির নিয়ম মেনে মৌসুমি ফলমূল খাওয়া এবং ভেষজ বা তথাকথিত ‘মিরাকেল ডিটক্স’ দাবি করা খাবার সম্পর্কে অন্ধ বিশ্বাস না রেখে বৈজ্ঞানিকভাবে সচেতন থাকা জরুরি।
ইসলাম খাবার গ্রহণের আদব ও সুস্বাস্থ্য বজায় রাখার সুন্দর নিয়ম শিখিয়েছে। মহানবী (সা.) বলেছেন, ‘তোমাদের কেউ যখন খায়, সে যেন ডান হাতে খায়...।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২০২০)
খাওয়ার আগে হাত ধোয়া, বিসমিল্লাহ বলে শুরু করা, ধীরে চিবিয়ে খাওয়া, খাবারে ফুঁ না দেওয়া এবং প্লেট পরিষ্কার করে খাওয়া শুধু আত্মিক সওয়াবই আনে না, বরং আধুনিক পুষ্টিবিজ্ঞানে বর্ণিত ‘মাইন্ডফুল ইটিং’ বা মনোযোগ দিয়ে খাওয়ার অভ্যাস গড়ে তুলতে সাহায্য করে।
৬. ভালো খাবার মানেই দামি খাবার নয়
সুস্থ থাকতে সব সময় দামি বা বিদেশি তথাকথিত ‘সুপারফুড’-এর প্রয়োজন হয় না। নবীজির জীবনধারা ছিল সরলতায় ভরা। আমাদের আশপাশের সাধারণ ও সস্তা খাবার—যেমন মসুরের ডাল, কলমি বা পালং শাক, ডিম, ছোট মাছ ও প্রসঙ্গভিত্তিক মৌসুমি ফল পুষ্টিগুণে অনন্য।
প্রকৃতির নিয়ম মেনে মৌসুমি ফলমূল খাওয়া এবং ভেষজ বা তথাকথিত ‘মিরাকেল ডিটক্স’ দাবি করা খাবার সম্পর্কে অন্ধ বিশ্বাস না রেখে বৈজ্ঞানিকভাবে সচেতন থাকা জরুরি।
ইসমত আরা: শিক্ষক ও লেখক