মহানবীর সঙ্গে হজরত আয়েশার বিবাহ
হজরত খাদিজা (রা.)–এর ইন্তেকালের পর রাসুলুল্লাহ (সা.) দীর্ঘ সময় একাকী জীবন যাপন করেন। খাদিজা রা.–এর সঙ্গে তাঁর গভীর ভালোবাসা, পারিবারিক বন্ধন ও মানসিক নির্ভরতা এতটাই দৃঢ় ছিল যে, তাঁর ইন্তেকালের পর নবীজির জীবনে এক শূন্যতা তৈরি হয়।
এই একাকীত্বের মধ্যেই আল্লাহ তাআলা নবীজির জন্য ভবিষ্যৎ উম্মতের কল্যাণে নতুন এক অধ্যায় রচনা করেন—যার অন্যতম কেন্দ্রবিন্দু হলো উম্মুল মুমিনিন আয়েশা (রা.)–এর সঙ্গে তাঁর বিবাহ।
এই বিয়ের সূচনা ঘটে খাওলা বিনতে হাকিম (রা.)–এর মাধ্যমে। তিনি ছিলেন ওসমান ইবনে মাজউনের স্ত্রী এবং একজন বিচক্ষণ ও কল্যাণকামী নারী।
নবীজির একাকীত্ব লক্ষ্য করে তিনি একদিন সাহস করে প্রশ্ন করেন, হে আল্লাহর রাসুল, আপনি কি আর বিয়ে করবেন না?
প্রস্তাব শুনে প্রথমে আবু বকর (রা.) বিস্মিত হয়ে বলেন, “মুহাম্মদ তো আমার ভাই, তাঁর জন্য কি আমার মেয়ে বৈধ হবে?”
উত্তরে নবীজি জানতে চান, কোনো উপযুক্ত পাত্রী আছে কি না। খাওলা জানান, কুমারী ও বিধবা—উভয় ধরনের পাত্রীই আছে। কুমারী হচ্ছেন আবু বকর (রা.)–এর কন্যা আয়েশা এবং বিধবা হচ্ছেন সাওদা বিনতে জামআ (রা.), যিনি ইমান এনেছেন এবং নবীজিকে সত্যায়ন করেছেন।
নবীজি (সা.) উভয়ের কাছেই বিয়ের প্রস্তাব পাঠাতে সম্মত হন। এরই ধারাবাহিকতায় খাওলা রা. প্রথমে যান আবু বকরের ঘরে। সেখানে আয়েশার মা উম্মে রুমানের সঙ্গে তার সাক্ষাৎ হয়। তিনি আনন্দের সঙ্গে প্রস্তাবের কথা জানালেও উম্মে রুমান জানান, আবু বকর ঘরে নেই; তিনি এলে সিদ্ধান্ত হবে।
আবু বকর ফিরে এলে প্রস্তাব শুনে প্রথমে তিনি বিস্মিত হয়ে বলেন, “মুহাম্মদ তো আমার ভাই, তাঁর জন্য কি আমার মেয়ে বৈধ হবে?” এই প্রশ্ন ছিল তৎকালীন আরব সমাজের প্রচলিত একটি ধারণা থেকে উৎসারিত—ধর্মীয় ভ্রাতৃত্বকে রক্তসম্পর্কের সমতুল্য ভাবা।
এই সংশয় দূর করতে খাওলা (রা.) নবীজির কাছে ফিরে আসেন। নবীজি (সা.) স্পষ্টভাবে জানান, আবু বকর তাঁর ধর্মের ভাই, রক্তসম্পর্কীয় ভাই নন; সুতরাং তার মেয়ে আয়েশার সঙ্গে বিবাহ সম্পূর্ণ বেধ। এই ব্যাখ্যা পেয়ে আবু বকর (রা.) প্রস্তাবে সম্মতি জানান। এর মাধ্যমে আরব সমাজের একটি ভ্রান্ত ধারণার অবসান ঘটে।
তবে এখানে আরেকটি বিষয় উল্লেখযোগ্য। আয়েশার জন্য পূর্বেই মুতইম ইবনে আদির ছেলে জুবায়েরের সঙ্গে বিয়ের কথা চলছিল এবং আবু বকর (রা.) তাতে সম্মতিও দিয়েছিলেন। নবীজির প্রস্তাব আসার পর তিনি সেই পুরনো প্রতিশ্রুতি নিয়ে দ্বিধায় পড়েন।
বিষয়টি পরিষ্কার করতে তিনি মুতইম ইবনে আদির ঘরে যান। সেখানে ছেলের মা স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দেন—এই বিয়ের ফলে তাদের পরিবার ‘বিধর্মী’ হয়ে যেতে পারে বলে তিনি আশঙ্কা করেন। মুতইম ইবনে আদিও স্ত্রীর কথার সঙ্গে একমত হন। এতে আবু বকর রা. স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেন এবং নিশ্চিত হন যে, আয়েশার জন্য নবীজির সঙ্গে বিয়ের পথ পুরোপুরি প্রশস্ত।
এরপর আয়েশার সঙ্গে নবীজির বিয়ের আকদ সম্পন্ন হয়। তবে তখনই বাসর অনুষ্ঠিত হয়নি। কারণ, সে সময় আয়েশার বয়স ছিল মাত্র ছয় বছর। তিনি তখনো ছিলেন শিশুস্বভাবের, খেলাধুলাপ্রবণ ও দুরন্ত। তার এই শিশুসুলভ আচরণে কখনো কখনো মা উম্মে রুমান বিরক্ত হয়ে শাসন করতেন।
নবীজি (সা.) এই দৃশ্য দেখে ব্যথিত হতেন এবং আয়েশার প্রতি কোমল আচরণের নির্দেশ দিতেন। এমনকি একবার আয়েশাকে কাঁদতে দেখে তিনিও অশ্রুসজল হয়ে পড়েন এবং উম্মে রুমানকে স্মরণ করিয়ে দেন—আয়েশার প্রতি দয়ার আচরণ করার ব্যাপারে। (মুসতাদরাকে হাকিম: ৬/৪, ৬৭১৬)
একবার আয়েশাকে কাঁদতে দেখে তিনিও অশ্রুসজল হয়ে পড়েন এবং উম্মে রুমানকে স্মরণ করিয়ে দেন—আয়েশার প্রতি দয়ার আচরণ করার ব্যাপারে।
পরে যখন আয়েশার বয়স নয় বছরে উপনীত হয়, তখন নবীজির সঙ্গে তাঁর সংসারজীবন শুরু হয়। এই ঘটনাটি আয়েশা (রা.) নিজেই বিশদভাবে বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন, হিজরতের তিন বছর আগে শাওয়াল মাসে তাঁর বিয়ে হয় এবং পরে পরিবারের সঙ্গে মদিনায় হিজরত করেন।
মদিনায় বনু হারেস ইবনে খাযরাজ গোত্রের এলাকায় বসবাসকালে একদিন নবীজি তাদের বাড়িতে আসেন। তখন আয়েশা দোলনায় খেলছিলেন। তার মা তাকে ডেকে এনে গোসল করিয়ে, চুল সাজিয়ে নবীজির সামনে নিয়ে যান। (মুসনাদে আহমাদ ইবনে হাম্বল, হাদিস: ২৫২৪২; ২৫৮১০)
এ উপলক্ষে কোনো বড় আয়োজন, পশু জবাই বা জাঁকজমক হয়নি। শুধু সা’দ ইবনে উবাদা (রা.) বিশেষ খাবার পাঠিয়েছিলেন। এভাবেই অত্যন্ত সাধারণ ও বরকতময় পরিবেশে নবীজির পারিবারিক জীবনের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় শুরু হয়।
এই বিয়ের মাধ্যমে বর্তমান সমাজের জন্য বহু শিক্ষা নিহিত রয়েছে। আজকের সমাজে বিয়ে মানেই বিশাল আয়োজন, অযথা খরচ, অপচয় ও কখনো কখনো গুনাহের সমাহার। অথচ আয়েশার বিয়ে ছিল এতটাই সহজ ও স্বাভাবিক যে, তিনি নিজেই বলেছেন, তিনি বুঝতেই পারেননি কখন তার বিয়ে হয়ে গেছে।
একইভাবে তার মোহরও ছিল মাত্র ৫০০ দিরহাম। এটি প্রমাণ করে যে, বিয়ের স্থায়িত্বের ভিত্তি মোহরের অঙ্ক নয়; বরং পারস্পরিক ভালোবাসা, বোঝাপড়া ও তাকওয়া।
ওমর (রা.) এ প্রসঙ্গে বলেন, মোহর নির্ধারণে বাড়াবাড়ি করা উচিত নয়। যদি এতে দুনিয়াবি সম্মান বা তাকওয়ার বিষয় থাকত, তাহলে নবীজিই হতেন সর্বাধিক মোহরের অধিকারী। (সুনানে আবু দাউদ: ২১০৬)
মোহর নির্ধারণে বাড়াবাড়ি করা উচিত নয়। যদি এতে দুনিয়াবি সম্মান বা তাকওয়ার বিষয় থাকত, তাহলে নবীজিই হতেন সর্বাধিক মোহরের অধিকারী।হজরত ওমর (রা.), সুনানে আবু দাউদ, হাদিস: ২১০৬
এ বিয়ের আরেকটি তাৎপর্যপূর্ণ দিক হলো—এটি আল্লাহর পক্ষ থেকে নির্ধারিত ছিল। নবীজি (সা.) বিয়ের আগেই স্বপ্নে আয়েশাকে দেখেছিলেন। সহিহ হাদিসে এসেছে, এক ফেরেশতা রেশমে মোড়ানো অবস্থায় তাঁকে আয়েশাকে দেখান এবং নবীজি বুঝতে পারেন—এটি আল্লাহর ইচ্ছা। (সহিহ বুখারি: ৭০১২; সহিহ মুসলিম: ২৪৩৮)
অল্প বয়সে বিয়ে নিয়ে যারা আপত্তি তোলে, তাদের জন্য ইতিহাস ও বাস্তবতার আলোকে কয়েকটি বিষয় স্পষ্ট করা হয়েছে।
প্রথমত, তৎকালীন আরবের উষ্ণ আবহাওয়ায় মেয়েরা দ্রুত শারীরিকভাবে পরিণত হয়ে উঠত।
দ্বিতীয়ত, আয়েশা (রা.) ছিলেন অসাধারণ মেধাবী ও স্মৃতিশক্তিসম্পন্ন; নবীজির সান্নিধ্যে থেকে তিনি উম্মতের জন্য বিপুল ইলম রেখে গেছেন।
তৃতীয়ত, নবীজি ও আবু বকর (রা.)–এর মধ্যে এই বৈবাহিক সম্পর্ক পরবর্তী খেলাফতের পথ সুগম করেছিল।
আয়েশার সঙ্গে নবীজির বিয়ে শুধু একটি পারিবারিক ঘটনা নয়; বরং এটি ছিল সামাজিক কুসংস্কার ভাঙার মাধ্যম, উম্মতের কল্যাণের পরিকল্পনা এবং সরল ও পবিত্র বৈবাহিক জীবনের এক অনুপম দৃষ্টান্ত। এই বিয়ের মধ্যেই লুকিয়ে আছে ইসলামের সৌন্দর্য, বাস্তবতা ও চিরকালীন শিক্ষা।