একটি সুনির্দিষ্ট সময়ে শিঙায় ফুঁ দেওয়ার মাধ্যমে এই মহাবিশ্বের ধ্বংস বা ‘কেয়ামত’ সংঘটিত হবে। কেয়ামত কবে হবে—এই সুনির্দিষ্ট জ্ঞান আল্লাহ ছাড়া আর কারও নেই। তবে মহানবী (সা.) উম্মতকে সতর্ক করার জন্য কেয়ামত সংঘটিত হওয়ার আগে বেশ কিছু লক্ষণ কথা বলে গেছেন।
এই আলামতগুলো দুই ভাগে ভাগ করা হয়: বড় আলামত (যেমন—দাজ্জালের আগমন, নবী ইসার অবতরণ) এবং ছোট আলামত। কেয়ামতের কয়েকটি দৃশ্যমান ছোট আলামত আলোচনা করা হলো।
১. মেষপালকদের সুউচ্চ ভবন নির্মাণ
একসময় আরবের বেদুইন বা মেষপালকেরা দরিদ্র জীবন যাপন করত। মহানবী (সা.) হিসেবে বলেছেন, তারা একসময় সম্পদের মালিক হবে এবং উঁচু দালানকোঠা নির্মাণের প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হবে।
হাদিসে জিবরিলে ফেরেশতা জিবরিল (আ.) যখন নবীজিকে কেয়ামতের আলামত সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলেন, তখন তিনি বলেছিলেন, ‘তুমি দেখতে পাবে যে নগ্নপদ, বস্ত্রহীন ও অভাবগ্রস্ত মেষপালকেরা সুউচ্চ প্রাসাদ নির্মাণের প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হয়েছে।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ৮)
সমাজে যখন আমানতদারিতা বা সততা হারিয়ে যাবে এবং অযোগ্য মানুষেরা সমাজের নেতৃত্ব ও ক্ষমতার আসনে বসবে, তখন তা কেয়ামতের অন্যতম বড় সংকেত।
২. অযোগ্যদের নেতৃত্ব
সমাজে যখন আমানতদারিতা বা সততা হারিয়ে যাবে এবং অযোগ্য মানুষেরা সমাজের নেতৃত্ব ও ক্ষমতার আসনে বসবে, তখন তা কেয়ামতের অন্যতম বড় সংকেত।
একবার মহানবী (সা.) সাহাবিদের উদ্দেশে মজলিশে কথা বলছিলেন, তখন এক বেদুইন এসে জিজ্ঞেস করল, ‘কেয়ামত কবে হবে?’ তিনি বললেন, ‘যখন আমানত নষ্ট করা হবে, তখন কেয়ামতের অপেক্ষা করো।’
লোকটি জিজ্ঞেস করল, ‘কীভাবে আমানত নষ্ট করা হবে?’ মহানবী (সা.) বললেন, ‘যখন কোনো কাজের দায়িত্ব অযোগ্য ব্যক্তির ওপর অর্পণ করা হবে, তখন তুমি কেয়ামতের অপেক্ষা করো।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৫৯)
৩. জ্ঞান উঠে যাওয়া
কেয়ামতের আগে মানুষ বাহ্যিকভাবে শিক্ষিত হলেও তাদের ভেতরের নৈতিক মূর্খতা চরম আকার ধারণ করবে।
মহানবী (সা.) বলেছেন, ‘কেয়ামতের আলামতগুলোর মধ্যে রয়েছে, ধর্মীয় জ্ঞান তুলে নেওয়া হবে, অজ্ঞতা ও মূর্খতা ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়বে, মদ্যপান বৃদ্ধি পাবে এবং ব্যভিচার প্রকাশ্য রূপ নেবে।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৮০)
জ্ঞান তুলে নেওয়ার ব্যাখ্যা হলো, পৃথিবী থেকে সত্যিকারের আলেমদের মৃত্যু হবে এবং মানুষ মূর্খদের নিজেদের নেতা বানিয়ে তাদের থেকে ভুল ব্যাখ্যা গ্রহণ করবে।
কেয়ামত সংঘটিত হবে না যতক্ষণ না সময় দ্রুত বয়ে যাবে। বছর হয়ে যাবে মাসের মতো, মাস হয়ে যাবে সপ্তাহের মতো, সপ্তাহ হয়ে যাবে দিনের মতো, দিন হয়ে যাবে ঘণ্টার মতো এবং একটি ঘণ্টা হয়ে যাবে আগুন জ্বলে ওঠার মতো।’সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ২৩৩২
৪. সময়ের বরকত না থাকা
মানুষের সবচেয়ে বড় অভিযোগ হলো, ‘সময় কোথা দিয়ে চলে যাচ্ছে, টেরই পাওয়া যায় না।’ সময়ের এই দ্রুত ফুরিয়ে যাওয়া বা সময় থেকে বরকত উঠে যাওয়া কেয়ামতের অন্যতম প্রধান একটি ছোট আলামত।
মহানবী (সা.) বলেছেন, ‘কেয়ামত সংঘটিত হবে না যতক্ষণ না সময় দ্রুত বয়ে যাবে। বছর হয়ে যাবে মাসের মতো, মাস হয়ে যাবে সপ্তাহের মতো, সপ্তাহ হয়ে যাবে দিনের মতো, দিন হয়ে যাবে ঘণ্টার মতো এবং একটি ঘণ্টা হয়ে যাবে আগুন জ্বলে ওঠার মতো।’ (সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ২৩৩২)
৫. ব্যাপক হত্যাকাণ্ড বৃদ্ধি পাওয়া
মানুষের জীবনের মূল্য একদম কমে যাবে। মহানবী (সা.) আক্ষেপ করে বলেছিলেন, ‘সেই সত্তার শপথ, যাঁর হাতে আমার প্রাণ, মানুষের ওপর এমন এক যুগ আসবে, যখন হত্যাকারী জানবে না যে সে কেন কাউকে হত্যা করছে, আর নিহত ব্যক্তিও জানবে না যে তাকে কী অপরাধে হত্যা করা হলো।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২৯০৮)
কেয়ামতের এই ছোট আলামতগুলো মূলত মুমিনদের জন্য এক সতর্কবার্তা।
আলামতগুলো দেখে হতাশ বা আতঙ্কিত হওয়ার বদলে, আল্লাহর কাছে বেশি বেশি ক্ষমা প্রার্থনা করা এবং পরকালের চূড়ান্ত হিসাব-নিকাশের জন্য নিজেদের আমলকে পরিশুদ্ধ করাই হলো ইসলামের মূল শিক্ষা।
এহসান সিরাজ : আলেম ও লেখক