মহান আল্লাহ কোরআনে বারবার তাঁর কাছে চাওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, ‘তোমরা আমাকে ডাকো, আমি তোমাদের ডাকে সাড়া দেব।’ (সুরা গাফির, আয়াত: ৬০)
হাদিসেও দোয়াকে ‘ইবাদতের মগজ’ বলে অভিহিত করা হয়েছে। (সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ৩২৪৭)
তবে একটি প্রশ্ন প্রায়ই মনে জাগে—আল্লাহ যা ভাগ্যে লিখে রেখেছেন, দোয়ার মাধ্যমে কি তা পরিবর্তন করা সম্ভব?
দোয়ার তাৎপর্য
দোয়া মানে হলো আল্লাহর সামনে নিজের অভাব ও বিনয় প্রকাশ করা। এটি এমন এক মাধ্যম যা মানুষের অন্তরে প্রশান্তি আনে এবং আল্লাহর সঙ্গে সম্পর্ক মজবুত করে। নবীজি (সা.) সবসময় অর্থবহ ও সংক্ষিপ্ত দোয়া পছন্দ করতেন।
তাঁর প্রিয় ও পঠিত দোয়া ছিল, ‘হে আমাদের প্রতিপালক, আমাদের ইহকাল-পরকাল উভয় জগতে কল্যাণ দান করুন এবং আমাদের জাহান্নামের আগুন থেকে বাঁচান।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৬৩৮৯)
দোয়া ছাড়া কিছুই ভাগ্য পরিবর্তন করতে পারে না।
দোয়া কি ভাগ্য পরিবর্তন করে
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘দোয়া ছাড়া আর কিছুই ভাগ্য (তকদির) পরিবর্তন করতে পারে না।’ (সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ২১৩৯)
আপাতদৃষ্টিতে এটি মনে হতে পারে যে আল্লাহর সিদ্ধান্ত বদলে যাচ্ছে, কিন্তু আলেমদের ব্যাখ্যা অনুযায়ী এর গভীর অর্থ রয়েছে। তাদের মতে এর দুটি ব্যাখ্যা হতে পারে:
১. লওহে মাহফুজের লিখন: মহান আল্লাহ আগে থেকেই জানেন যে তাঁর কোনো বান্দা বিপদে পড়ে দোয়া করবে এবং সেই দোয়ার বরকতে তিনি ওই বিপদটি সরিয়ে দেবেন। অর্থাৎ দোয়া করা এবং এর ফলে বিপদ কেটে যাওয়া—পুরোটাই আল্লাহর পূর্বনির্ধারিত জ্ঞানের অংশ। (ইবনে হাজার আসকালানি, ফাতহুল বারি, ১১তম খণ্ড, পৃষ্ঠা: ৯৫, দারুত তাইয়িবাহ, রিয়াদ, ১৯৯৯)
২. বিপদের তীব্রতা হ্রাস: কখনো দোয়া ভাগ্যকে এমনভাবে পরিবর্তন করে যে কোনো বড় বিপদ আসার কথা থাকলেও দোয়ার কারণে তা হালকা হয়ে যায়। অর্থাৎ বিপদটি আসে ঠিকই, কিন্তু বান্দার জন্য তা সহ্য করা সহজ হয়ে যায়।
তকদিরের দোহাই দিয়ে দোয়া থেকে বিরত থাকা ঠিক নয়। কারণ দোয়া নিজেই ভাগ্যের একটি অংশ। আল্লাহর ভাণ্ডারে কোনো কিছুর কমতি নেই।
দোয়া কবুলের শর্ত
দোয়া কবুল হওয়ার জন্য কিছু জরুরি শর্ত রয়েছে। কেবল মুখে বলাটাই যথেষ্ট নয়, বরং থাকতে হবে:
ইখলাস বা একাগ্রতা: মন থেকে কেবল আল্লাহর ওপর ভরসা করে চাওয়া।
নিশ্চয়তা: আল্লাহ অবশ্যই কবুল করবেন—এমন দৃঢ় বিশ্বাস নিয়ে দোয়া করা। নবীজি (সা.) বলেছেন, তোমরা কবুল হওয়ার সুনিশ্চিত বিশ্বাস (একিন) নিয়ে আল্লাহর কাছে দোয়া করো এবং জেনে রেখো, আল্লাহ কোনো উদাসীন ও অমনোযোগী অন্তরের দোয়া কবুল করেন না। (সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ৩৪৭৯)
তাড়াহুড়ো না করা: দোয়া করে ‘কবুল হচ্ছে না কেন’ বলে হতাশ হওয়া যাবে না। দীর্ঘ সময় ধৈর্য ধরে দোয়া চালিয়ে যেতে হবে।
অন্যদিকে, কিছু কারণে দোয়া কবুল হতে বাধাগ্রস্ত হয়। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় বাধা হলো হারাম উপার্জন। হাদিসে এসেছে, যে ব্যক্তির খাবার, পানীয় ও পোশাক হারাম উপার্জনের, তার দোয়া কীভাবে কবুল হবে? (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১০১৫)
এছাড়া আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করা বা পাপে লিপ্ত থেকে দোয়া করলে তা কবুল হয় না।
দোয়া হলো মুমিনের এক বিশেষ শক্তি। ভাগ্য বা তকদিরের দোহাই দিয়ে দোয়া থেকে বিরত থাকা ঠিক নয়। কারণ দোয়া নিজেই ভাগ্যের একটি অংশ। আল্লাহর ভাণ্ডারে কোনো কিছুর কমতি নেই, তাই বিপদ থেকে বাঁচতে বা কল্যাণ লাভ করতে দোয়ার কোনো বিকল্প নেই।
মনে রাখতে হবে, দোয়ার ফলাফল কখনো বৃথা যায় না—হয় আল্লাহ দুনিয়াতে তা দান করেন, নয়তো এর বিনিময়ে কোনো বিপদ দূর করেন অথবা পরকালের জন্য তা জমা রাখেন।