কিবলা পরিবর্তন ও ‘নির্বোধদের’ আপত্তির রহস্য

দীর্ঘ ১৭ মাস বায়তুল মুকাদ্দাসের দিকে মুখ করে নামাজ পড়ার পর কাবার দিকে ফিরে নামাজ পড়ার নির্দেশ আসেছবি: পেক্সেলস

সুরা বাকারার ১৪২ নম্বর আয়াতে কিবলা পরিবর্তন–সংক্রান্ত একটি আগাম বার্তার অবতারণা করা হয়েছে, যেখানে বলা হয়েছে, ‘মানুষের মধ্যে যারা নির্বোধ (সুফাহা), তারা অচিরেই বলবে যে তারা এযাবৎ যে কিবলা অনুসরণ করে আসছিল, তা থেকে কিসে তাদের ফিরিয়ে দিল?’ (সুরা বাকারা, আয়াত: ১৪২)

আপাতদৃষ্টিতে মনে হতে পারে, এ আয়াত কিবলা পরিবর্তনের নির্দেশের পরে আসার কথা ছিল, কিন্তু আল্লাহ–তাআলা এটি পরিবর্তনের নির্দেশ–সংবলিত আয়াতের আগেই স্থাপন করেছেন।

দীর্ঘ ১৭ মাস বায়তুল মুকাদ্দাসের দিকে মুখ করে নামাজ পড়ার পর যখন কাবার দিকে কিবলা পরিবর্তনের নির্দেশ এল, তখন বিরোধী পক্ষ থেকে নানা প্রশ্ন ও আপত্তির উদ্রেক হওয়া ছিল স্বাভাবিক।

আয়াতের অবস্থানের রহস্য

কিবলা পরিবর্তনের ঘটনাটি ঘটেছিল হিজরতের পর মদিনায়। দীর্ঘ ১৭ মাস বায়তুল মুকাদ্দাসের দিকে মুখ করে নামাজ পড়ার পর যখন কাবার দিকে কিবলা পরিবর্তনের নির্দেশ এল, তখন বিরোধী পক্ষ থেকে নানা প্রশ্ন ও আপত্তির উদ্রেক হওয়া ছিল স্বাভাবিক।

কিন্তু লক্ষণীয় বিষয় হলো, কোরআনের এ আয়াতে ‘ভবিষ্যৎকাল’ (অচিরেই বলবে) ব্যবহার করে এই আপত্তির কথা কিবলা পরিবর্তনের চূড়ান্ত আদেশের আগেই বলে দেওয়া হয়েছে। (মুহাম্মদ তাহির ইবনে আশুর, আত-তাহরির ওয়াত-তানভির, ২/১৫, দারু তিউনিসিয়া লিন-নাশর, তিউনিস, ১৯৮৪)

এর আগের আয়াতগুলোতে আল্লাহ–তাআলা ধারাবাহিকভাবে হজরত ইব্রাহিম (আ.), তাঁর ধর্মাদর্শ এবং কাবা ঘরের মাহাত্ম্য বর্ণনা করেছেন। আল্লাহ বারবার বলেছেন, ইব্রাহিম (আ.)-এর আদর্শ থেকে কেবল তারাই মুখ ফিরিয়ে নিতে পারে, যারা নির্বোধ।

আরও পড়ুন

এ আলোচনার ফলে স্বাভাবিকভাবেই একটি পটভূমি তৈরি হয়েছিল। মক্কার মুশরিকরা তখন বলতে শুরু করল, মুহাম্মদ (সা.) যদি ইব্রাহিমের আদর্শেরই অনুসারী হন, তবে তিনি ইব্রাহিমের তৈরি কাবাকে বাদ দিয়ে ইহুদিদের কিবলা বায়তুল মুকাদ্দাসের দিকে কেন মুখ করছেন?

আগের আয়াতগুলোতে ইব্রাহিম (আ.) ও কাবার প্রতি যে সম্মান প্রদর্শন করা হয়েছে, তা মক্কার মুশরিকদের মনে এ প্রশ্নের উদ্রেক করার জন্য যথেষ্ট ছিল যে মুহাম্মদ (সা.) কেন বায়তুল মুকাদ্দাসের দিকে মুখ করছেন।

আল্লাহ–তাআলা তাদের সেই সম্ভাব্য বা উত্থাপিত প্রশ্নকেই এখানে ‘নির্বোধদের উক্তি’ হিসেবে আগেই তুলে ধরেছেন।’ (তাহরির ওয়াত-তানভির, ২/১৬, দারু তিউনিসিয়া লিন-নাশর, তিউনিস, ১৯৮৪)

যদি কিবলা পরিবর্তনের নির্দেশ আসার পর মুশরিকরা আপত্তি করত এবং তখন এই আয়াত নাজিল হতো, তবে তারা বলতে পারত, ‘আমাদের আপত্তির মুখে পড়েই মুহাম্মদ তাঁর কিবলা পরিবর্তন করেছেন।’

কৌশলগত ও মনস্তাত্ত্বিক কারণ

কিবলা পরিবর্তনের নির্দেশের (সুরা বাকারা, আয়াত: ১৪৪) আগে এই আয়াত (সুরা বাকারা, আয়াত: ১৪২) আনার পেছনে একটি বড় কৌশলগত ছিল। যদি কিবলা পরিবর্তনের নির্দেশ আসার পর মুশরিকরা আপত্তি করত এবং তখন এই আয়াত নাজিল হতো, তবে তারা বলতে পারত, ‘আমাদের আপত্তির মুখে পড়েই মুহাম্মদ তাঁর কিবলা পরিবর্তন করেছেন।’

আল্লাহ–তাআলা তাদের এ দম্ভের পথ বন্ধ করে দেওয়ার জন্য আগেভাগেই তাদের আপত্তির কথা জানিয়ে দিয়েছেন এবং এর জবাবও দিয়ে দিয়েছেন।

এতে প্রমাণিত হয় যে কিবলা পরিবর্তন কোনো মানুষের ইচ্ছায় বা সমালোচনার মুখে হয়নি, বরং এটি ছিল আল্লাহর পূর্বনির্ধারিত পরিকল্পনা। (তাহরির ওয়াত-তানভির, ২/১৭, দারু তিউনিসিয়া লিন-নাশর, তিউনিস, ১৯৮৪)

‘সুফাহা’ বা নির্বোধ কারা

আয়াতে ‘সুফাহা’ বলতে কাদের বোঝানো হয়েছে, তা নিয়ে মুফাসসিরদের মধ্যে ভিন্ন মত রয়েছে। ইমাম ইবনে আশুর মনে করেন, এখানে সুফাহা বা নির্বোধ বলতে মূলত মক্কার মুশরিকদের বোঝানো হয়েছে। এর সপক্ষে তিনি কয়েকটি যুক্তি দিয়েছেন:

১. কোরআনের পরিভাষায় ‘আন-নাস’ (মানুষ) শব্দটির দ্বারা অনেক ক্ষেত্রে মক্কার মুশরিকদের বোঝানো হয়, যেমনটি ইবনে আব্বাস (রা.) থেকেও বর্ণিত হয়েছে।

২. যদি এখানে সুফাহা বলতে ইহুদিদের বোঝানো হতো, তবে বাক্যটি হতো ‘তারা বলবে’, কারণ, পূর্ববর্তী আয়াতগুলোতে ইহুদিদের কথা স্পষ্টভাবে আলোচিত হচ্ছিল।

কিন্তু এখানে নতুন করে ‘মানুষের মধ্য থেকে একদল নির্বোধ’ বলার অর্থ হলো এমন এক গোষ্ঠীর অবতারণা করা, যারা পূর্ববর্তী আলোচনার মূল বিষয় ছিল না, অর্থাৎ মুশরিক সম্প্রদায়।

আরও পড়ুন

৩. এই নির্বোধরা বলেছিল, ‘তাদের কিবলা (কিবলাতিহিম) থেকে তাদের কিসে ফিরিয়ে দিল?’ এখানে তাদের কিবলা শব্দবন্ধটি গুরুত্বপূর্ণ। ইহুদিরা কখনোই মুসলিমদের কিবলাকে নিজেদের কিবলা বলে স্বীকার করত না।

তাই তারা যদি আপত্তি করত, তবে বলত ‘আমাদের কিবলা’ (কিবলাতিনা)। কিন্তু মুশরিকরা যেহেতু মুসলিমদের কিবলা পরিবর্তনের সমালোচনা করছিল, তাই তাদের মুখ দিয়ে তাদের কিবলা বলানোই অধিক যুক্তিযুক্ত। (তাহরির ওয়াত-তানভির, ২/১৮, দারু তিউনিসিয়া লিন-নাশর, তিউনিস, ১৯৮৪)

ইমাম সুদ্দি (রহ.)-এর মতে, এখানে মুনাফিকদেরও বোঝানো হতে পারে, যারা ভেতরে–ভেতরে মুশরিকদের মতোই মানসিকতা পোষণ করত। কারণ, সুরার শুরুতেই মুনাফিকদের সুফাহা বা নির্বোধ হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছে—‘জেনে রেখো, তারাই নির্বোধ, কিন্তু তারা তা জানে না।’ (সুরা বাকারা, আয়াত: ১৩)

কিবলা পরিবর্তন কেবল একটি দিক পরিবর্তন ছিল না, এটি ছিল বিশ্বমানবতার জন্য এক নতুন উম্মত ও নতুন নেতৃত্বের অভিযাত্রা।

বিশ্বজনীন হেদায়েত ও কিবলার দর্শন

এ বিতর্কের জবাবে আল্লাহ–তাআলা যে উত্তর দিয়েছেন, তা অত্যন্ত গভীর, ‘বলুন, পূর্ব ও পশ্চিম আল্লাহরই। তিনি যাকে ইচ্ছা সরল পথে পরিচালিত করেন।’ (সুরা বাকারা, আয়াত: ১৪২)

এর মাধ্যমে আল্লাহ বুঝিয়ে দিয়েছেন যে কোনো দিক বা ভৌগোলিক অবস্থান নিজেই পবিত্র নয়, বরং আল্লাহর নির্দেশই সেই দিককে পবিত্রতা দান করে। ইহুদিদের বায়তুল মুকাদ্দাস বা মুশরিকদের কাবা নিয়ে যে সাম্প্রদায়িক অহংকার ছিল, এই আয়াত তার মূলে আঘাত করেছে।

কোরআনের এই বাক্যবিন্যাস মুসলিমদের এক বিশেষ মর্যাদা দান করেছে। এখানে কিবলাকে তাদের কিবলা বলে মুসলিমদের সঙ্গে বিশেষভাবে সম্বন্ধযুক্ত করা হয়েছে, যা অন্য কোনো উম্মতের ক্ষেত্রে করা হয়নি। এটি মুসলিমদের স্বতন্ত্র ধর্মীয় সত্তার এক অনন্য স্বীকৃতি। (আদ–তাহরির ওয়াত-তানভির, ২/১৯, দারু তিউনিসিয়া লিন-নাশর, তিউনিস, ১৯৮৪)

কোরআনের এ চমৎকার অবস্থান আমাদের এই শিক্ষাই দেয় যে ইসলামের প্রতিটি বিধান ও তার উপস্থাপনা চিরন্তন সত্যের ওপর প্রতিষ্ঠিত।

বিরোধীরা যত কূটতর্কই করুক না কেন, আল্লাহর নুর ও হেদায়েত সবকিছুর ঊর্ধ্বে। কিবলা পরিবর্তন কেবল একটি দিক পরিবর্তন ছিল না, এটি ছিল বিশ্বমানবতার জন্য এক নতুন উম্মত ও নতুন নেতৃত্বের অভিযাত্রা। (সুরা বাকারা, আয়াত: ১৪৩)

আরও পড়ুন