মানুষ স্বভাবত সৌন্দর্যপ্রিয় এবং প্রাচুর্যের মোহে আচ্ছন্ন। পবিত্র কোরআনের সুরা কাহাফে মহান আল্লাহ মানবজীবনের এই মনস্তত্ত্ব এবং প্রকৃত সফলতার এক শাশ্বত মানদণ্ড তুলে ধরেছেন। বলেছেন, “ধনৈশ্বর্য ও সন্তান-সন্ততি পার্থিব জীবনের সৌন্দর্য, আর স্থায়ী সৎকাজ তোমার প্রতিপালকের নিকট পুরস্কার প্রাপ্তির জন্য শ্রেষ্ঠ এবং আশা আকাঙ্ক্ষার ভিত্তি হিসেবেও উৎকৃষ্ট।” (আয়াত: ৪৬)
এই আয়াতের গভীর মর্মার্থ ও ভাষাতাত্ত্বিক রহস্য বিশ্লেষণ করলে মুমিনের জীবনদর্শনের এক পূর্ণাঙ্গ রূপরেখা ফুটে ওঠে।
পার্থিব সৌন্দর্যের স্বরূপ ও মোহ
আল্লামা ইবনে আশুর (রহ.)–এর মতে, এই আয়াতের অবতারণা করা হয়েছে মুমিনদের নসিহত ও শিক্ষা দেওয়ার জন্য। তৎকালীন আরবের মুশরিকরা ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততির প্রাচুর্য নিয়ে অহংকার করত। আল্লাহ তাআলা স্পষ্ট করে দিলেন যে এসবই কেবল ‘জিনাত’ বা বাহ্যিক অলংকার, যা অতি দ্রুত বিলীন হয়ে যায়।
ধনৈশ্বর্য ও সন্তান-সন্ততি পার্থিব জীবনের সৌন্দর্য, আর স্থায়ী সৎকাজ তোমার প্রতিপালকের নিকট পুরস্কার প্রাপ্তির জন্য শ্রেষ্ঠ এবং আশা আকাঙ্ক্ষার ভিত্তি হিসেবেও উৎকৃষ্ট।কোরআন, সুরা কাহফ, আয়াত: ৪৬
আরব সমাজে ধন-সম্পদ ও বীর সন্তানদের মাধ্যমে বংশীয় আভিজাত্য প্রকাশের যে সংস্কৃতি ছিল, তার চিত্র ফুটে ওঠে জাহেলি যুগের কবি তরফা ইবনুল আবদের কবিতায়। তিনি আক্ষেপ করে বলতেন, সম্পদ আর সুযোগ থাকলে তিনিও বড় কোনো গোত্রপতি হতে পারতেন, যাদের ঘিরে থাকতো বীর সন্তানরা।
কিন্তু কোরআন এই দৃষ্টিভঙ্গিকে সংশোধন করে দিয়েছে। সম্পদ আর সন্তান মানুষকে আনন্দ দেয় ঠিকই, কিন্তু তা স্থায়ী নয়। এর উপমা হলো সেই বৃষ্টির মতো যা ভূমিকে সজীব করে তোলে কিন্তু পরক্ষণেই তা শুকনো খড়কুটোয় পরিণত হয়। (আত-তাহরির ওয়াত-তানভির, ১০/৪১১, দারুস সাহাবা পাবলিকেশন, কায়রো, ১৯৯৯)
সম্পদ কেন সন্তানের আগে
আয়াতের শব্দ বিন্যাসে দেখা যায়, আল্লাহ তাআলা ‘আল-মাল’ বা সম্পদকে ‘আল-বানুন’ বা সন্তানদের আগে উল্লেখ করেছেন। এর একটি নিগূঢ় ভাষাতাত্ত্বিক ও মনস্তাত্ত্বিক কারণ রয়েছে। সম্পদ মানুষের মনে খুব দ্রুত স্থান করে নেয়। ছোট-বড়, যুবক-বৃদ্ধ—সবাই সম্পদের আকাঙ্ক্ষা করে। এমনকি যার পর্যাপ্ত সন্তান রয়েছে, সেও সম্পদের মোহ থেকে মুক্ত হতে পারে না। (মুহাম্মদ তাহের ইবনে আশুর, আত-তাহরির ওয়াত-তানভির, ১০/৪১৩, দারুস সাহাবা পাবলিকেশন, কায়রো, ১৯৯৯)
সম্পদ ছাড়া জীবন ধারণ কঠিন, আর সন্তানহীন ব্যক্তিও সম্পদের মাধ্যমে সামাজিক নিরাপত্তা ও সম্মান নিশ্চিত করতে চায়। তাই মানুষের চিন্তার অগ্রাধিকারে সম্পদ প্রথমে আসে বলেই আল্লাহ এর উল্লেখ আগে করেছেন।
দুনিয়ার সম্পদ বা সন্তানের পেছনে মানুষ যখন তার আশা বিনিয়োগ করে, তখন সেই আশা পূরণ হওয়া না হওয়া অনিশ্চিত। অনেক সময় সম্পদ বিপদের কারণ হয়, সন্তান অবাধ্য হয়।
‘স্থায়ী সৎকাজ’ কোনটি
আয়াতে স্থায়ী সৎকাজ বলতে গিয়ে ‘আল-বাকিয়াতুস সালিহাত’ শব্দবন্ধ আনা হয়েছে। এর মাধ্যমে মূলত সেইসব ভালো কাজকে বোঝানো হয়েছে যার পুণ্য ও কল্যাণ কখনো ফুরিয়ে যায় না। ইবনে আশুরের মতে, এখানে ‘বাকিয়াত’ (স্থায়ী) এবং ‘সালিহাত’ (ভালো কাজ) দুটি গুণবাচক শব্দ যা একটি উহ্য বিশেষ্যকে নির্দেশ করছে। অর্থাৎ ‘আল-আ’মালুস সালিহাতুল বাকিয়াহ’ বা সেইসব সৎকাজ যা চিরস্থায়ী।
সাধারণত ব্যাকরণ বিচারে ‘সালিহাত’ আগে আসার কথা ছিল, কিন্তু আল্লাহ ‘বাকিয়াত’ শব্দটিকে আগে এনেছেন। এর উদ্দেশ্য হলো মানুষকে সতর্ক করা যে, আগের অংশে উল্লিখিত সম্পদ ও সন্তান যেহেতু ক্ষণস্থায়ী, তাই এখন যা বলা হচ্ছে তা হলো চিরস্থায়ী। (আত-তাহরির ওয়াত-তানভির, ১০/৪১২, দারুস সাহাবা পাবলিকেশন, কায়রো, ১৯৯৯)
এটি মুমিনের চিন্তার জগতকে ইহকাল থেকে পরকালের দিকে ধাবিত করে। আল্লাহর রাসুল (সা.) শিখিয়েছেন, এই বাকিয়াতুস সালিহাত হলো, সুবহানাল্লাহ, আলহামদুলিল্লাহ, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ এবং আল্লাহু আকবার পাঠ করা। (সহিহ ইবনে হিব্বান, হাদিস: ৮৪০)
এছাড়া যেকোনো জনকল্যাণমূলক কাজ যা আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য করা হয়, তা-ই এর অন্তর্ভুক্ত।
প্রত্যাশা ও প্রাপ্তির শ্রেষ্ঠ উৎস
আয়াতের শেষাংশে বলা হয়েছে, এই স্থায়ী সৎকাজগুলো ‘খাইরুন আমালা’ বা আশা-আকাঙ্ক্ষার দিক থেকে শ্রেষ্ঠ। এর অর্থ হলো, দুনিয়ার সম্পদ বা সন্তানের পেছনে মানুষ যখন তার আশা বিনিয়োগ করে, তখন সেই আশা পূরণ হওয়া না হওয়া অনিশ্চিত। অনেক সময় সম্পদ বিপদের কারণ হয়, সন্তান অবাধ্য হয়। কিন্তু আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য করা ভালো কাজের প্রতিদান নিশ্চিত।
আল্লাহ ঘোষণা করেছেন, “পুরুষ হোক কিংবা নারী, যে মুমিন অবস্থায় সৎকাজ করবে, আমি তাকে নিশ্চয়ই আনন্দময় জীবন দান করব এবং তাদেরকে তাদের শ্রেষ্ঠ কাজের পুরস্কার প্রদান করব।” (সুরা নাহল, আয়াত: ৯৭)
সুরা কাহাফের এই আয়াত আমাদের সম্পদ বা সন্তানকে অস্বীকার করতে বলে না, তবে এগুলোর মায়ায় পড়ে আসল গন্তব্য ভুলে যেতে নিষেধ করে।
পরকালের পাথেয় হিসেবে নেক আমল কেন শ্রেষ্ঠ, তার চমৎকার এক বর্ণনা পাওয়া যায় সুরা মারিয়ামেও। সেখানে বলা হয়েছে, “আর স্থায়ী সৎকাজগুলো তোমার প্রতিপালকের নিকট পুরস্কারের দিক থেকে শ্রেষ্ঠ এবং পরিণতির দিক থেকেও উৎকৃষ্ট। (সুরা মারিয়াম, আয়াত: ৭৬)
অর্থাৎ যে ব্যক্তি আল্লাহর কাছে সওয়াবের আশা রাখে, তার সেই আশা কখনো বৃথা যায় না। কারণ তিনি ‘সাদিকুল ওয়াদ’ বা সত্য প্রতিশ্রুতিদাতা।
বোঝা গেলো, সুরা কাহাফের এই আয়াত আমাদের সম্পদ বা সন্তানকে অস্বীকার করতে বলে না, তবে এগুলোর মায়ায় পড়ে আসল গন্তব্য ভুলে যেতে নিষেধ করে। সম্পদ ও সন্তান যদি আল্লাহর অনুগত হয়ে সৎকাজের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহৃত হয়, তবে তাও কল্যাণের। কিন্তু যদি তা কেবল ‘দুনিয়ার সৌন্দর্য’ হিসেবে সীমাবদ্ধ থাকে, তবে তা একদিন ‘শুষ্ক খড়কুটো’র মতোই উড়ে যাবে।
প্রকৃত বুদ্ধিমান সেই ব্যক্তি, যে ক্ষণস্থায়ী সৌন্দর্যের মোহে না পড়ে অবিনশ্বর পাথেয় সংগ্রহে সচেষ্ট হয়। আমাদের প্রতিদিনের ছোট ছোট ভালো কাজ, জিকির এবং মানুষের সেবা—এগুলোই হবে সেই ‘আল-বাকিয়াতুস সালিহাত’, যা কেয়ামতের কঠিন দিনে আল্লাহর কাছে আমাদের শ্রেষ্ঠ আশ্রয় হিসেবে গণ্য হবে।