হজ একটি নির্দিষ্ট সময় ও পদ্ধতি-নির্ভর ইবাদত। সামর্থ্যবান প্রতিটি মুসলিমের ওপর জীবনে একবার হজ পালন করা ফরজ। হজের প্রস্তুতি ও আরকান-আহকাম নিয়ে পাঠকদের জরুরি কিছু জিজ্ঞাসার সমাধান দেওয়া হলো:
ইহরাম ও তালবিয়া
সুন্নাহ পদ্ধতি: ইহরামের আগে নখ ও চুল পরিষ্কার করে গোসল বা অজু করা সুন্নাত। পুরুষেরা দুটি সেলাইবিহীন সাদা চাদর পরবেন এবং পায়ের ওপরের হাড় খোলা থাকে এমন স্যান্ডেল ব্যবহার করবেন। মহিলারা স্বাভাবিক মার্জিত পোশাক পরবেন। (গুনয়াতুন নাসেক, পৃ. ৬৯)
তালবিয়া: ইহরামের মূল বাক্য হলো তালবিয়া—‘লাব্বাইক আল্লাহুম্মা লাব্বাইক...’। এটি পূর্ণাঙ্গ পড়া জরুরি; এর কোনো অংশ ছেড়ে দেওয়া মকরূহ। (ফাতাওয়া হিন্দিয়া, ১/১২৩)
আরকান ও হজের মূল কার্যক্রম
হজ শুদ্ধ হওয়ার জন্য তিনটি কাজ ফরজ: ১. ইহরাম বাঁধা, ২. ৯ জিলহজ আরাফাতের ময়দানে অবস্থান এবং ৩. তাওয়াফে জিয়ারত করা। এছাড়া সাফা-মারওয়া সাঈ করা, মুজদালিফায় অবস্থান ও শয়তানকে পাথর নিক্ষেপ করা ওয়াজিব। (রদ্দুল মুহতার, ২/৪৬৮)
তাওয়াফ ও সাঈ: তাওয়াফের জন্য অজু থাকা শর্ত, কিন্তু সাঈর (সাফা-মারওয়া) জন্য অজু থাকা সুন্নাত। তাওয়াফ শেষে মাকামে ইব্রাহিমের পেছনে দুই রাকাত নামাজ পড়া ওয়াজিব। (মানাসিক, পৃ. ১৩২; সুরা বাকারা, ১২৫)
আরাফাহ ও মুজদালিফা: ৯ জিলহজ জোহরের পর থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত আরাফায় অবস্থান করা প্রধান ফরজ। সূর্যাস্তের আগে সীমানা ত্যাগ করলে ‘দম’ (পশু কোরবানি) ওয়াজিব হয়। এরপর মুজদালিফায় গিয়ে রাত যাপন ও মাগরিব-এশা একত্রে পড়া ওয়াজিব। (আদ্দুররুল মুখতার, ২/৫১১)
পাথর নিক্ষেপ ও মাথা মুণ্ডন: ১০ জিলহজ ধারাবাহিকভাবে—আগে বড় শয়তানকে পাথর নিক্ষেপ, এরপর কোরবানি এবং শেষে মাথা মুণ্ডন করা ওয়াজিব। এই ক্রমিক ভুল হলে ইমাম আবু হানিফার (রহ.) মতে দম ওয়াজিব হয়। (গুনয়াতুন নাসেক, পৃ. ১৭৭)
নারীদের বিশেষ মাসয়ালা
ঋতুস্রাব অবস্থায়: নারীরা পিরিয়ড বা মাসিক অবস্থায় ইহরাম বাঁধা ও আরাফায় অবস্থানসহ হজের সব কাজ করতে পারবেন; কেবল পবিত্র না হওয়া পর্যন্ত কাবাঘর তাওয়াফ ও নামাজ পড়তে পারবেন না। (গুনয়াতুন নাসেক, পৃ. ৭৪)
পর্দা: ইহরাম অবস্থায় নারীদের চেহারায় কাপড় লেগে থাকে—এমনভাবে মুখ ঢাকা নিষেধ; এক্ষেত্রে ক্যাপ ব্যবহার করা যেতে পারে। (নাইলুল আওতার, ৫/৭১)
তাওয়াফে জিয়ারত: ঋতুস্রাবের কারণে ১০ জিলহজ তাওয়াফে জিয়ারত করতে না পারলে পবিত্র হওয়ার পর তা সম্পন্ন করবেন। এজন্য কোনো দণ্ড বা দম দিতে হবে না। (রদ্দুল মুহতার, ২/৫১৯)
ইহরাম অবস্থায় নিষিদ্ধ কাজ
১. শরীরের কোনো অংশের চুল বা নখ কাটা। ২. সুগন্ধি সাবান, তেল, পাউডার বা জর্দাযুক্ত পান খাওয়া। (আহকামে হজ, পৃ. ৩৪) ৩. পুরুষের জন্য সেলাই করা পোশাক ও টুপি পরা এবং মাথা ও চেহারা ঢাকা। ৪. স্বামী-স্ত্রীর বিশেষ সম্পর্ক বা এ সংক্রান্ত কাজ করা। ৫. ঝগড়া-বিবাদ বা অশ্লীল কথা বলা। (আদ্দুররুল মুখতার, ২/৪৮৬)
সতর্কতা: নিষিদ্ধ কাজে জড়িয়ে পড়লে ভুলের মাত্রা অনুযায়ী দণ্ডস্বরূপ ‘দম’ (পশু কোরবানি) বা সদকা ওয়াজিব হয়। আরাফায় অবস্থানের আগে স্ত্রীর সঙ্গে মিলিত হলে হজ নষ্ট হয়ে যায় এবং পরবর্তী বছর তা কাজা করা আবশ্যক। (মানাসিক, পৃ. ১১৭)
আব্দুল্লাহ আলমামুন আশরাফী: মুহাদ্দিস, জামিয়া গাফুরিয়া মাখযানুল উলুম, টঙ্গী, গাজীপুর।