মুমিন চরিত্রের জন্য ক্ষতিকর ৭ স্বভাব

ছবি: পেক্সেলস

ভালো মানুষ হওয়ার আকাঙ্ক্ষা আমাদের সবারই আছে। তবে শুধু ভালো গুণ অর্জন করলেই একজন মানুষ সত্যিকার অর্থে উত্তম চরিত্রের অধিকারী হয়ে যায় না। কিছু মন্দ স্বভাব আছে, যা ধীরে ধীরে মানুষের অন্তর ও চরিত্রকে কলুষিত করে এবং তাকে আল্লাহর কাছে অপছন্দনীয় করে তুলতে পারে।

তাই একজন মুমিনের জন্য ভালো গুণ অর্জনের পাশাপাশি ক্ষতিকর ও নিন্দনীয় স্বভাবগুলো থেকেও নিজেকে দূরে রাখা জরুরি।

১. অধিক ঝগড়ায় অভ্যস্ত হওয়া

সত্য উদ্‌ঘাটনের জন্য যুক্তি, প্রজ্ঞা ও উত্তম পদ্ধতিতে আলোচনা করা প্রশংসনীয়। কিন্তু আলোচনা যখন সত্য জানার উদ্দেশ্য হারিয়ে নিজের মত প্রতিষ্ঠা, জেতার চেষ্টা কিংবা প্রতিপক্ষকে পরাজিত করার প্রতিযোগিতায় পরিণত হয়, তখন তা আর কল্যাণকর থাকে না।

নবীজি (সা.) বলেছেন, ‘আল্লাহর কাছে সবচেয়ে অপছন্দনীয় ব্যক্তি হলো সে, যে অধিক ঝগড়াটে।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৪৫২৩)

প্রকৃত মুমিনের বৈশিষ্ট্য হলো, তিনি সত্যকে গ্রহণ করেন, ভুল হলে তা স্বীকার করেন এবং মতভেদের ক্ষেত্রেও শালীনতা, ধৈর্য ও সংযম বজায় রাখেন। সব আলোচনায় জয়ী হওয়া নয়, বরং সত্যের কাছে নত হওয়াই তার লক্ষ্য।

২. আত্মগর্ব ও অহংকার করা

মানুষের যেমন শরীর অসুস্থ হতে পারে, তেমনি তার অন্তরও নানা রোগে আক্রান্ত হতে পারে। অন্তরের ভয়ংকর রোগগুলোর একটি হলো অহংকার।

পদমর্যাদা, জ্ঞান, বৈভব, সৌন্দর্য কিংবা ইবাদত—কোনো কিছুই মানুষকে অন্যের চেয়ে নিজেকে শ্রেষ্ঠ মনে করার অধিকার দেয় না।

রাসুল (সা.) বলেছেন, কেয়ামতের দিন আমার নিকট থেকে সবচেয়ে দূরে অবস্থানকারীদের মধ্যে থাকবে ‘মুতাফাইহিকুন’। সাহাবিরা এর ব্যাখ্যা জানতে চাইলে তিনি অহংকারীদের কথা উল্লেখ করেন। (সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ২০১৮)

একজন মানুষের চরিত্র বোঝার অন্যতম বাস্তব ক্ষেত্র হলো তার প্রতিবেশীর সঙ্গে আচরণ। কারণ, প্রতিবেশীর সঙ্গে সম্পর্ক আমাদের দৈনন্দিন জীবনে চরিত্রের এক গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা।
আরও পড়ুন

৩. অনর্থক ও অর্থহীন কথা বলা

মানুষের অনেক ভুল ও পাপের সূচনা হয় জিব থেকে। প্রয়োজনের অতিরিক্ত কথা, অর্থহীন আলোচনা, অপ্রয়োজনীয় মন্তব্য এবং এমন বিষয়ে কথা বলা, যার কোনো কল্যাণ নেই—এসব ধীরে ধীরে মানুষকে অনর্থক কাজে জড়িয়ে ফেলতে পারে।

নবীজি (সা.) বলেছেন, ‘আমার উম্মতের মধ্যে তারা নিন্দিত, যারা অনর্থক কথা বলে...’ (আল-আদাবুল মুফরাদ, হাদিস: ১৩০৮)

তাই কোনো কথা বলার আগে নিজেকে প্রশ্ন করা উচিত, এটি কি সত্য? এটি কি প্রয়োজনীয়? এটি কি কল্যাণকর?

যদি উত্তর নেতিবাচক হয়, তবে নীরব থাকাই শ্রেয়। কারণ, সংযত নীরবতা অনেক সময় অনর্থক কথার চেয়ে বেশি কল্যাণকর।

৪. প্রতিবেশীকে কষ্ট দেওয়া

একজন মানুষের চরিত্র বোঝার অন্যতম বাস্তব ক্ষেত্র হলো তার প্রতিবেশীর সঙ্গে আচরণ। কারণ, প্রতিবেশীর সঙ্গে সম্পর্ক আমাদের দৈনন্দিন জীবনে চরিত্রের এক গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা।

হাদিসে এসেছে, ‘সে মুমিন নয়, যার অনিষ্ট থেকে তার প্রতিবেশী নিরাপদ নয়।’ (আল-মুজামুল কাবির, হাদিস: ৮২৫০)

প্রতিবেশীকে অকারণে বিরক্ত করা, তার গোপনীয়তায় হস্তক্ষেপ করা, অধিকার নষ্ট করা কিংবা সামান্য বিষয় নিয়ে তাকে কষ্ট দেওয়া ইসলামের সৌন্দর্যের পরিপন্থী।

প্রকৃত মুমিন এমন, যার প্রতিবেশী তার কাছ থেকে ভয় নয়; বরং নিরাপত্তা, শান্তি ও কল্যাণ অনুভব করে।

৫. দ্বিমুখী আচরণ করা

একজনের সামনে এক কথা বলা, আর অন্যজনের সামনে সম্পূর্ণ বিপরীত বলা—এটি চরিত্রের ভয়ংকর দুর্বলতা। এমন আচরণ মানুষের মধ্যে অবিশ্বাস, সন্দেহ ও বিভেদ সৃষ্টি করে এবং সম্পর্কের ভিত দুর্বল করে দেয়।

আরও পড়ুন
কাউকে ছোট করে নিজেকে বড় মনে করা মানুষের এক গভীর আত্মপ্রবঞ্চনা। কারণ, আমরা জানি না, যাকে আজ তুচ্ছ মনে করছি, আল্লাহর কাছে তার মর্যাদা হয়তো আমাদের চেয়েও অনেক বেশি।

রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘তোমরা কিয়ামতের দিন আল্লাহর কাছে সবচেয়ে নিকৃষ্ট মানুষ হিসেবে দ্বিমুখী (দুই মুখো) ব্যক্তিকে দেখতে পাবে। যে এক দলের কাছে এক রূপ নিয়ে আসে এবং অন্য দলের কাছে অন্য রূপ নিয়ে যায়।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৬০৫৮)

মুমিনের সৌন্দর্য তার স্বচ্ছতা ও সত্যনিষ্ঠায়। তিনি সবার সামনে একই সত্য ও ন্যায়ের ওপর থাকার চেষ্টা করেন। মানুষের মন পাওয়ার জন্য একেক জনের কাছে একেক রূপ ধারণ করা মুমিনের চরিত্র হতে পারে না।

৬. অন্যকে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করা

অন্যকে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করা ইসলামের দৃষ্টিতে অত্যন্ত নিন্দনীয়। এটি শুধু অন্যের মর্যাদা ক্ষুণ্ন করে না; বরং মানুষের অন্তরে অহংকার, আত্মগর্ব ও বিদ্বেষের জন্ম দেয়।

কেউ দরিদ্র হতে পারেন, অল্প শিক্ষিত হতে পারেন, সামাজিকভাবে দুর্বল হতে পারেন কিংবা আমাদের চেয়ে ভিন্ন অবস্থানে থাকতে পারেন। এসব কারণে তাঁকে হেয় বা অপমান করার অধিকার কারও নেই।

রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘কোনো মুসলিম ভাইকে তুচ্ছ মনে করা একজন মানুষের মন্দ হওয়ার জন্য যথেষ্ট।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২৫৬৪)

কাউকে ছোট করে নিজেকে বড় মনে করা মানুষের এক গভীর আত্মপ্রবঞ্চনা। কারণ, আমরা জানি না, যাকে আজ তুচ্ছ মনে করছি, আল্লাহর কাছে তার মর্যাদা হয়তো আমাদের চেয়েও অনেক বেশি।

৭. অশ্লীল ও কটু ভাষায় কথা বলা

জিব ছোট, কিন্তু এর ক্ষত অনেক গভীর। একটি কঠিন বা তির্যক বাক্য কখনো কখনো এমন দাগ রেখে যায়, যা বহু বছরেও মুছে যায় না।

নবীজি (সা.) বলেছেন, ‘নিশ্চয়ই পরকালে আল্লাহর নিকট সেই ব্যক্তি নিন্দনীয়, যার মন্দ কথা ও আচরণের ভয়ে মানুষ তাকে পরিত্যাগ করেছে।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৬০৬৪)

অশ্লীল ভাষা, গালাগাল, কটু কথা ও অপমানজনক মন্তব্য মানুষের হৃদয়ে আঘাত করে এবং নিজের চরিত্রকেও কলুষিত করে। তাই একজন মুমিনের জিব হওয়া উচিত সত্য, সৌজন্য ও কল্যাণের মাধ্যম।

  • রায়হান আল ইমরান: আলেম, লেখক ও গবেষক

আরও পড়ুন