তিনি একজন নবী, রাষ্ট্রনায়ক, সমাজ সংস্কারক। এত ব্যস্ততার মাঝেও কীভাবে দাম্পত্যের সূক্ষ্ম আবেগ, কোমলতা এবং ভালোবাসার ফুল ফোটাতে হয়—তিনি তা নিজের প্রাত্যহিক আচরণ দিয়ে শিখিয়ে গেছেন।
বলেছেন, “তোমাদের মধ্যে সেই ব্যক্তিই সর্বোত্তম, যে তার স্ত্রীর নিকট সর্বোত্তম; আর আমি আমার স্ত্রীদের নিকট তোমাদের চেয়েও উত্তম।” (সুনান ইবনে মাজাহ, হাদিস: ১৯৭৭)
নবীজির থেকে দাম্পত্য ভালোবাসার ১০টি হৃদয়গ্রাহী ও অনুকরণীয় সুন্নত তুলে ধরা হলো:
১. ভালোবাসার উন্মুক্ত প্রকাশ
অনেকে স্ত্রীর প্রতি ভালোবাসা মনের ভেতর গোপন রাখাকেই পৌরুষের লক্ষণ মনে করেন। কিন্তু আল্লাহর রাসুল (সা.) ভালোবাসা প্রকাশে ছিলেন অকপট।
সাহাবি আমর ইবনুল আস (রা.) একবার নবীজিকে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘মানুষের মধ্যে আপনার কাছে সবচেয়ে প্রিয় কে?’ কোনো প্রকার দ্বিধা ছাড়াই উত্তর দিলেন, ‘আয়েশা।’ আমর পুনরায় জিজ্ঞাসা করলেন, ‘পুরুষদের মধ্যে কে?’ তিনি বললেন, ‘তার পিতা (আবু বকর)।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৩৬৬২)
ভালোবাসার এই প্রকাশ শুধু মুখের কথায় সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং তা জড়িয়ে ছিল প্রাত্যহিক অভ্যাসেও। আয়েশা (রা.) বর্ণনা করেন, “আমি ঋতুবতী অবস্থায় পাত্র থেকে পানি পান করতাম; অতঃপর মহানবী (সা.) পাত্রটি নিজের হাতে নিয়ে ঠিক সেই জায়গায় নিজের মুখ রাখতেন, যেখানে আমি মুখ রেখে পান করেছিলাম; এবং সেখান থেকেই তিনি পান করতেন।” (সুনানে নাসায়ি, হাদিস: ৭০)
২. স্ত্রীর মুখে লোকমা তুলে দেওয়া
দাম্পত্য জীবনে ছোট ছোট যত্ন পরম বরকত বয়ে আনে। স্ত্রীর মুখে ভালোবেসে এক লোকমা খাবার তুলে দেওয়াকে আল্লাহর কাছে মহা পুরস্কারের কারণ সাব্যস্ত করা হয়েছে।
মহানবী (সা.) বলেছেন, “আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে তুমি যা কিছুই ব্যয় করবে, তার জন্য তোমাকে অবশ্যই পুরস্কৃত করা হবে; এমনকি তুমি ভালোবেসে যে লোকমাটি তোমার স্ত্রীর মুখে তুলে দাও, তার জন্যও তুমি সওয়াব লাভ করবে।” (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৫৬)
বাইরে যাওয়ার সময় সুগন্ধি মাখা বা ফিটফাট হওয়া স্বাভাবিক, কিন্তু ঘরে ফিরে স্ত্রীর সামনে নিজেকে পরিপাটি রাখা দাম্পত্য সম্মানের অংশ।
৩. খেলাধুলায় অংশগ্রহণ
স্ত্রীর মন ভালো রাখতে খেলাধুলা ও শরীরচর্চামূলক আনন্দে নবীজি সময় দিতেন।
আয়েশা (রা.) বর্ণনা করেন, একবার এক সফরে মহানবী (সা.) কাফেলাকে কিছুটা এগিয়ে যেতে বললেন এবং তিনি একান্তে আয়েশাকে ডেকে বললেন, ‘এসো, আমরা দুজন দৌড় প্রতিযোগিতা করি!’
আয়েশা (রা.) বলেন, “আমি নবীজির সঙ্গে দৌড় প্রতিযোগিতা করলাম এবং আমি তাঁকে হারিয়ে দিলাম। এর কয়েক বছর পর আমার শরীরের ওজন কিছুটা বাড়লে তিনি পুনরায় আমার সঙ্গে দৌড়ালেন এবং এবার তিনি আমাকে হারিয়ে দিয়ে মুচকি হেসে বললেন, ‘হে আয়েশা, এই জয় তোমার সেই আগের জয়ের প্রতিশোধ।’” (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস: ২৫৭৮)
৪. স্ত্রীর জন্য নিজেকে সুন্দর রাখা
বাইরে যাওয়ার সময় সুগন্ধি মাখা বা ফিটফাট হওয়া স্বাভাবিক, কিন্তু ঘরে ফিরে স্ত্রীর সামনে নিজেকে পরিপাটি রাখা দাম্পত্য সম্মানের অংশ।
সাহাবি শুরাইহ ইবনে হানি (রা.) আয়েশাকে জিজ্ঞাসা করলাম, ‘আল্লাহর রাসুল যখন ঘরে প্রবেশ করতেন, তখন সর্বপ্রথম কোন কাজটি করতেন?’ তিনি উত্তরে বললেন, ‘তিনি মিসওয়াক করতেন।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২৫৩)
ঘরে ফিরে মুখ দুর্গন্ধমুক্ত ও পরিচ্ছন্ন রাখা মূলত স্ত্রীর প্রতি গভীর যত্ন ও ভালোবাসারই প্রকাশ।
৫. স্ত্রীর কোলে মাথা রাখা
ক্লান্তির মুহূর্তে স্ত্রীর সান্নিধ্যে বিশ্রাম নেওয়া দাম্পত্যের বড় প্রশান্তি। আয়েশা (রা.) বর্ণনা করেন, “মহানবী (সা.) আমার কোলে মাথা রেখে হেলান দিতেন এবং পবিত্র কোরআন পাঠ করতেন, এমনকি আমি ঋতুবতী থাকা অবস্থায়ও।” (সহিহ বুখারি, হাদিস: ২৯৭)
এই বর্ণনাটি জাহেলি যুগের সেই কুসংস্কার গুঁড়িয়ে দিয়েছিল, যেখানে নারীদের ঋতুস্রাবের সময় অপবিত্র ভেবে দূরে সরিয়ে রাখা হতো। মহানবী (সা.) শরীরবৃত্তীয় এই সময়ে স্ত্রীর আরও কাছে এসে তাঁকে পরম ভালোবাসায় জড়িয়ে রাখতেন।
৬. একই পাত্রের পানিতে গোসল করা
দাম্পত্যের গভীর নৈকট্যের আরেকটি দৃষ্টান্ত ছিল স্বামী-স্ত্রীর একান্তে স্নান করা। আয়েশা (রা.) বলেন, “আমি এবং আল্লাহর রাসুল একই পাত্র থেকে গোসল করতাম; আমাদের হাতগুলো একটির পর একটি পাত্রের পানিতে নামত।” (সহিহ বুখারি, হাদিস: ২৫০)
মাইমুনা (রা.) থেকেও অনুরূপ হাদিস বর্ণিত হয়েছে। (সুনান ইবনে মাজাহ, হাদিস: ৩৭৯)
যখনই ঘরে কোনো ছাগল বা দুম্বা জবাই করা হতো, নবীজি (সা.) খাদিজার বান্ধবীদের খুঁজে খুঁজে মাংসের অংশ উপহার পাঠাতেন।
৭. স্ত্রীর শখের প্রতি সম্মান প্রদর্শন
একবার ঈদের দিনে একদল হাবশি যুবক মসজিদে নববীর প্রাঙ্গণে ঐতিহ্যবাহী বর্শা ও ঢালের মহড়া দেখাচ্ছিল। আয়েশা (রা.) সেই খেলা দেখতে চাইলেন।
মহানবী (সা.) দাঁড়িয়ে নিজের চাদর দিয়ে আয়েশাকে আড়াল করে রাখলেন, যাতে তিনি নির্বিঘ্নে খেলা দেখতে পারেন। আয়েশা (রা.) বলেন, “আমি নবীজির কাঁধের ওপর চিবুক রেখে খেলা দেখতে থাকলাম, যতক্ষণ না আমি নিজে ক্লান্ত হয়ে দেখতে বিরত হলাম।” (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৪৫৪, ৯৫০)
৮. স্ত্রীর প্রিয়জনদের মূল্যায়ন করা
প্রথম স্ত্রী খাদিজার ইন্তেকালের বহু বছর পরও মহানবী (সা.) তাঁর ভালোবাসা ও অবদানকে পরম শ্রদ্ধায় স্মরণ করতেন। আয়েশা (রা.) বলেন, “খাদিজার জীবদ্দশায় আমি তাঁকে দেখিনি, তবুও মহানবী যেভাবে তাঁর আলোচনা করতেন, অন্য কোনো সতিনের প্রতি আমি এতটা ঈর্ষাবোধ করিনি। যখনই ঘরে কোনো ছাগল বা দুম্বা জবাই করা হতো, নবীজি (সা.) খাদিজার বান্ধবীদের খুঁজে খুঁজে মাংসের অংশ উপহার পাঠাতেন।” (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৩৮১৮)
৯. গৃহস্থালির কাজে স্ত্রীকে সহযোগিতা করা
অনেক পুরুষ মনে করেন ঘরের কাজে স্ত্রীকে সাহায্য করা পৌরুষের পরিপন্থী। কিন্তু নবীজি (সা.) এই মিথ্যা অহমিকা ভেঙে দিয়েছেন।
তাবেয়ি আল-আসওয়াদ (রহ.) আয়েশাকে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘মহানবী নিজ ঘরে কী কাজ করতেন?’ তিনি বললেন, ‘তিনি পরিবারের কাজে গৃহস্থালির কাজে নিয়োজিত থাকতেন (নিজের কাপড় নিজে সেলাই করতেন, জুতো মেরামত করতেন ও পরিচ্ছন্নতায় হাত লাগাতেন); অতঃপর যখন নামাজের সময় হতো, তখন তিনি নামাজের জন্য বের হয়ে যেতেন।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৬৭৬)
১০. সুন্দর ও মধুর সম্বোধনে ডাকা
স্ত্রীর মনে আনন্দ জাগাতে তাকে প্রিয় ও আদুরে নামে ডাকা সুন্নতের অংশ। নবীজি (সা.) আয়েশাকে আদর করে ‘হুমাইরা’ (গোলাপী বা সুন্দর লাবণ্যময়ী) বলে ডাকতেন। (সুনান ইবনে মাজাহ, হাদিস: ২৪৭৪)