দাম্পত্য জীবনের শুরুটা সহজ, কিন্তু সেটাকে বছরের পর বছর সুন্দর রাখা মোটেই সহজ কাজ নয়। এর জন্য লাগে ধৈর্য, আন্তরিকতা, ত্যাগ আর একটু প্রজ্ঞা। সম্পর্ক টিকিয়ে রাখতে গিয়ে অনেক সময় নিজের অভিমান আর রাগ সংযত করতে হয়।
একজন স্বামীর ভূমিকা তখন হয়ে ওঠে কৌশলী আর স্নেহশীল একজন অভিভাবকের মতো। স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে বোঝাপড়া না থাকলে সম্পর্ক ধীরে ধীরে দুর্বল হতে থাকে, কখনো কখনো তা গড়ায় বিচ্ছেদ পর্যন্ত।
অথচ কিছু সহজ, প্রতিদিনের অভ্যাস নিয়মিত চর্চা করলে ভালোবাসা আর বিশ্বাস অনেক গভীর হয়ে ওঠে। স্ত্রীর ভুল হলে অপমান নয়, ভালোবাসা দিয়েই তা সংশোধন করা উচিত। তাঁকে অনুভব করাতে হয় যে পৃথিবীতে আপনিই তাঁর সবচেয়ে আপন মানুষ।
পরিবারের জন্য সামর্থ্য অনুযায়ী ভালো খাবারের ব্যবস্থা করাও যত্নেরই অংশ। সব সময় সম্ভব না হলেও মাঝেমধ্যে বিশেষ আয়োজন করা যায়, আর এখানে কার্পণ্য না করাই ভালো।
১. নিজের যত্ন নেওয়া, তাঁর যত্ন নেওয়া
স্ত্রীর সামনে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন ও পরিপাটি থাকাটা ছোট বিষয় মনে হলেও এর প্রভাব গভীর। সাহাবি ইবনে আব্বাস (রা.) নিজে এ অভ্যাসের কথা বলেছেন, ‘আমি আমার স্ত্রীর জন্য এমনই পরিপাটি থাকতে পছন্দ করি, যেমন আমি তার কাছ থেকে সাজগোজ পছন্দ করি।’ (মুসান্নাফ ইবনে আবি শাইবাহ, হাদিস: ১৯২৬৩)
স্ত্রী যেভাবে দেখতে পছন্দ করেন, সেভাবে থাকার চেষ্টাটা আসলে সম্মানেরই একটা প্রকাশ।
পরিবারের জন্য সামর্থ্য অনুযায়ী ভালো খাবারের ব্যবস্থা করাও এ যত্নেরই অংশ। সব সময় সম্ভব না হলেও মাঝেমধ্যে বিশেষ আয়োজন করা যায়, আর এখানে কার্পণ্য না করাই ভালো।
নবীজি (সা.) বলেছেন, ‘সওয়াবের আশায় কোনো মুসলিম যখন তার পরিবারের জন্য ব্যয় করে, তা তার জন্য সদকা হিসেবে গণ্য হয়।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৫৩৫১)
ঘরের কাজে সুযোগ পেলে সহযোগিতা করা আর ছোট ছোট ভালো কাজেরও আন্তরিক প্রশংসা করা—এসবও একই সুতোয় গাঁথা। আয়েশা (রা.) বলেন, ‘নবীজি প্রায়ই খাদিজা (রা.)-এর প্রশংসা করতেন।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৫২২৯)
এমনকি খাদিজার মৃত্যুর পরও নতুন স্ত্রীর সামনেই প্রশংসা করতেন। প্রশংসা কখনো পুরোনো সম্পর্ককে খাটো করে না; বরং ভালোবাসা বাড়ায়।
২. সম্মান কখনো হারাতে দেওয়া যাবে না
দাম্পত্য জীবনে মতবিরোধ হতেই পারে। প্রয়োজনে কিছু সময় দূরে থাকা যায়, বিছানা আলাদা করা যায়, কিন্তু গায়ে হাত তোলা কখনোই নয়। নবীজি (সা.) বলেছেন, ‘তোমরা কেউ যেন নিজের স্ত্রীকে দাসের মতো প্রহার না করো। দিনের শেষে তো তার সঙ্গেই মিলিত হবে।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৫২০৪)
এ সতর্কতা এতটাই স্পষ্ট যে এখানে কোনো ব্যাখ্যার প্রয়োজন পড়ে না।
সম্মান রক্ষার আরও কিছু দিক আছে, যেগুলো চোখে কম পড়ে, কিন্তু প্রভাব ফেলে গভীরভাবে। খারাপ নামে ডাকা, অশালীন ভাষা ব্যবহার, স্ত্রীর মা–বাবাকে নিয়ে কটূক্তি—এসব সম্পূর্ণ পরিত্যাজ্য; যৌতুকের দাবি বা ইঙ্গিতও তা-ই।
সওয়াবের আশায় কোনো মুসলিম যখন তার পরিবারের জন্য ব্যয় করে, তা তার জন্য সদকা হিসেবে গণ্য হয়।
স্ত্রীকে অন্য কারও সঙ্গে তুলনা করাটাও একধরনের অসম্মান। তাঁকে বরং অনুভব করানো উচিত যে তিনি অনন্য, প্রতিস্থাপনযোগ্য নন। তাঁর ভুল সবার সামনে প্রকাশ না করে আড়ালে ভালোবাসার সঙ্গে সংশোধনের চেষ্টা করাই ভালো, আর পুরোনো ভুল বারবার মনে করিয়ে দেওয়াও একধরনের নিষ্ঠুরতা।
ক্ষমা করতে শেখা আর সামনে এগিয়ে চলাই সুস্থ সম্পর্কের লক্ষণ।
৩. সময় দেওয়া: নবীজি যা মনে রাখতেন
দাম্পত্য জীবনে হালকা, খেলাচ্ছলে সময় কাটানোকে অনেকে গুরুত্বহীন মনে করেন, অথচ নবীজির নিজের জীবনেই এর স্পষ্ট নজির আছে।
আয়েশা (রা.) বলেন, এক সফরে নবীজি তাঁর সঙ্গে দৌড় প্রতিযোগিতা করেছিলেন। প্রথমবার আয়েশা জিতে যান। বছর কয়েক পর, যখন আয়েশার শরীর কিছুটা ভারী হয়ে গেছে, আবার প্রতিযোগিতা হলো, এবার নবীজি (সা.) জিতলেন। তিনি হেসে বললেন, ‘এটা সেই আগের হারের বদলা।’ (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস: ২৫৭৮)
এই ছোট্ট ঘটনাই বলে দেয়, স্ত্রীর সঙ্গে হালকা, রসিকতাপূর্ণ সময় কাটানো নবীজির নিজস্ব অভ্যাসের অংশ ছিল।
এ বিষয়ে নবীজি (সা.) একটা সাধারণ নীতিও বলে দিয়েছে, মানুষের অধিকাংশ বিনোদনমূলক কাজই অর্থহীন, তবে কয়েকটি ব্যতিক্রম আছে। তিনি বলেন, ‘মানুষ যা নিয়ে খেলাধুলা করে, তার সবই অনর্থক, তিনটি বিষয় ছাড়া—তিরন্দাজি, ঘোড়া প্রশিক্ষণ আর স্ত্রীর সঙ্গে খেলা।’ (সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ১৬৩৭)
অর্থাৎ স্ত্রীর সঙ্গে হালকা সময় কাটানোকে ইসলাম নিছক অপচয় নয়; বরং সময়োপযোগী ও অর্থবহ কাজ হিসেবে দেখে।
এর আলোকেই প্রতিদিন কিছুটা সময় মন খুলে কথা বলা, একসঙ্গে খাওয়া, একটু হাঁটা, মাঝেমধ্যে কোথাও ঘুরতে যাওয়া—এসব ছোট অভ্যাসকে বাড়তি বিলাসিতা না ভেবে বরং সুন্নাহরই একটা অংশ হিসেবে দেখা যায়।
নতুন দাম্পত্যে স্ত্রীকে একা না রেখে সান্নিধ্যে রাখা, আবার তাঁকে মাঝেমধ্যে বাবার বাড়িতে যেতে দেওয়া—দুটোই এই একই নীতির বাস্তব প্রয়োগ: সম্পর্কটাকে জীবন্ত রাখা।
আয়েশা (রা.) বলেন, এক সফরে নবীজি তাঁর সঙ্গে দৌড় প্রতিযোগিতা করেছিলেন। প্রথমবার আয়েশা জিতে যান। বছর কয়েক পর, যখন আয়েশার শরীর কিছুটা ভারী হয়ে গেছে, এবার নবীজি (সা.) জিতলেন।
৪. রাগের মুহূর্তই আসলে পরীক্ষা
ওপরের প্রতিটি অভ্যাসের আসল পরীক্ষা হয় রাগের মুহূর্তে। নবীজি (সা.) শক্তির সংজ্ঞাই বদলে দিয়েছিলেন এ প্রসঙ্গে। তিনি বলেন, ‘শক্তিশালী সে নয়, যে কুস্তিতে অন্যকে পরাজিত করে; বরং শক্তিশালী সে-ই, যে রাগের সময় নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৬১১৪)
দাম্পত্য জীবনের ঝগড়া-বিবাদে এ নীতিই সবচেয়ে বেশি কাজে লাগে—রাগের মাথায় নেওয়া সিদ্ধান্ত প্রায়ই সারা জীবনের অনুশোচনার কারণ হয়ে দাঁড়ায়; যেখানে একটু থেমে শান্ত হওয়াটাই বড় শক্তির পরিচয়।
সুখী দাম্পত্য জীবন গড়ে ওঠে পারস্পরিক ভালোবাসা, শ্রদ্ধা, দায়িত্ববোধ, ক্ষমাশীলতা আর আল্লাহভীতির ওপর। অভিমান, রাগ, অহংকার আর অপ্রয়োজনীয় ঝগড়া থেকে দূরে থেকে একে অপরের সুখ-দুঃখের সাথি হওয়ার চেষ্টাই আসল কাজ।
সুন্দর সংসার হঠাৎ তৈরি হয় না, এটা গড়ে ওঠে প্রতিদিনের ছোট ছোট আচরণ, ত্যাগ আর আন্তরিকতার মধ্য দিয়ে। আল্লাহ–তাআলা আমাদের সবাইকে ভালোবাসা, রহমত ও প্রশান্তিতে ভরপুর দাম্পত্য জীবন দান করুন।
মুফতি ইবরাহীম আল খলীল : উস্তাজুল হাদিস, জামিয়া আরাবিয়া আশরাফুল মাদারিস, তেজগাঁও, ঢাকা