শাবান মাসের ৪ ধরনের রোজার বিধান

ছবি: পেক্সেলস

শাবান মাসটি কোনো ‘হারাম মাস’ বা বিশেষ নিষিদ্ধ মাস না হলেও এর গুরুত্ব অনেক। মূলত এই মাসটি হলো রমজানের আধ্যাত্মিক প্রস্তুতির সময়।

রাসুলুল্লাহ (সা.) এই মাসে অন্য মাসের তুলনায় অধিক হারে রোজা রাখতেন, যা নির্দেশ করে যে রমজানের রোজা শুরু করার আগে শরীর ও মনকে তৈরি করে নেওয়া প্রয়োজন।

তবে এই মাসে ব্যক্তিবিশেষের জন্য রোজা রাখা নিষিদ্ধও হতে পারে, আবার জরুরিও হয়ে পড়তে পারে। এই সকল দিক বিবেচনায় শাবান মাসের রোজাকে চারটি প্রধান ভাগে ভাগ করা যায়। আজ আলোচনা করা হলো।

১. ওয়াজিব বা আবশ্যক রোজা

শাবান মাসে কিছু মানুষের জন্য রোজা রাখা আবশ্যক হয়ে পড়ে। এটি মূলত আগের বছরের কাজা হওয়া রোজার সাথে সংশ্লিষ্ট।

মুসাফির হওয়ার কারণে, অসুস্থতার কারণে কিংবা নারীদের বিশেষ শারীরিক অবস্থার (ঋতু ও গর্ভকালীন) কারণে যাদের রমজানের রোজা ছুটে গিয়েছিল, পরবর্তী রমজান আসার আগেই সেই রোজাগুলো আদায় করা তাদের ওপর ওয়াজিব।

শাবান মাস হলো এই কাজা রোজা আদায়ের শেষ সুযোগ।

আয়েশা (রা.) বর্ণনা করেছেন, “আমার ওপর রমজানের কাজা রোজা বাকি থাকতো, যা শাবান মাস ব্যতীত অন্য কোনো মাসে আদায় করতে পারতাম না; কারণ রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর ব্যস্ততা বা তাঁর সাথে আমার সংশ্লিষ্টতা।” (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১১৪৬)

সুতরাং যাদের জিম্মায় পূর্বের রোজা বাকি আছে, রমজান শুরু হওয়ার একদিন আগে হলেও তা পূর্ণ করা বাধ্যতামূলক।

এছাড়া মান্নতের রোজা বা কাফফারার রোজাও এই সময়ে আদায় করা যেতে পারে।

আরও পড়ুন

২. মুস্তাহাব বা পছন্দনীয় রোজা

শাবান মাসে অধিক হারে নফল রোজা রাখা সুন্নতে মুয়াক্কাদা বা অত্যন্ত গুরুত্ববহ সুন্নত। রাসুলুল্লাহ (সা.) এই মাসে এত বেশি রোজা রাখতেন যে সাহাবিগণ মনে করতেন তিনি আর রোজা ভাঙবেন না।

আয়েশা (রা.) বর্ণনা করেন, “আমি রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে রমজান মাস ছাড়া অন্য কোনো মাসে পূর্ণ এক মাস রোজা রাখতে দেখিনি এবং শাবান মাসের চেয়ে বেশি রোজা অন্য কোনো মাসে রাখতে দেখিনি।” (সহিহ বুখারি, হাদিস: ১৯৬৯)

অন্য বর্ণনায় এসেছে, তিনি প্রায় পুরো শাবান মাসই রোজা রাখতেন। তবে ইমাম তিরমিজি (র.) এর ব্যাখ্যা অনুযায়ী, ‘পুরো মাস’ বলতে এখানে মাসের অধিকাংশ সময়কে বোঝানো হয়েছে। (সুনানে তিরমিজি, ২/১০৬, দারুত তুক্লাস, বৈরুত, ১৯৯৬)

৩. মাকরুহ বা অপছন্দনীয় রোজা

শাবান মাসের কিছু সময় রোজা রাখা নিয়ে ফকিহগণের মধ্যে মতভেদ ও সতর্কবার্তা রয়েছে। আবু হুরায়রা (রা.) বর্ণিত একটি হাদিসে এসেছে, “শাবান যখন অর্ধেক হয়ে যায়, তখন তোমরা আর রোজা রেখো না।” (সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ৭৩৮)

ইমাম তিরমিজি এই হাদিসটির আলোকে শাবানের শেষ ১৫ দিন রোজা রাখা মাকরুহ বা অপছন্দনীয় বলেছেন। তবে কেউ কেউ এই হাদিসটিকে দুর্বল বলে অভিহিত করেছেন। (ইবনে রজব হাম্বলি, লাতায়েফ আল-মাআরিফ, পৃষ্ঠা: ২৬০, দারু ইবনি কাসির, দামেস্ক, ১৯৯৯)

হাম্বলি মাজহাবের আলেমগণ এই হাদিসের ওপর ভিত্তি করে ১৫ শাবানের পর রোজা রাখাকে মাকরুহ মনে করেন। তবে যারা আগে থেকে রোজা রাখছিলেন, তাদের জন্য এটি প্রযোজ্য নয়।

আরও পড়ুন

৪. হারাম বা নিষিদ্ধ রোজা

শাবান মাসে নির্দিষ্ট কিছু পরিস্থিতিতে রোজা রাখাকে ওলামায়ে কেরাম হারাম বা নিষিদ্ধ বলে ঘোষণা করেছেন:

ক. রমজানকে স্বাগত জানানোর নিয়তে রোজা: রমজান মাসের প্রতি অতি-উৎসাহ দেখাতে গিয়ে বা রমজানের একদিন আগে থেকে রোজা রাখা নিষিদ্ধ।

রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, “তোমাদের কেউ যেন রমজানের একদিন বা দুই দিন আগে রোজা না রাখে; তবে ওই ব্যক্তির কথা ভিন্ন যার নিয়মিত কোনো রোজা রাখার অভ্যাস আছে (যেমন সোমবার বা বৃহস্পতিবার)।” (সহিহ বুখারি, হাদিস: ১৯১৪)

শাইখ ইবনে উসাইমিন (রহ.)–এর মতে, এই নিষেধটি মূলত হারাম বা নিষিদ্ধ অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে, বিশেষ করে যখন কেউ সওয়াবের আশায় এই একদিনকে নির্দিষ্ট করে নেয়। (শারহু রিয়াদিস সলিহিন, ৩/৩৯৪, দারু ইবনি জাওযি, রিয়াদ, ২০০১)

খ. সন্দেহের দিনে রোজা: শাবান মাসের ৩০তম দিন, যেদিন আকাশ মেঘাচ্ছন্ন থাকার কারণে চাঁদ দেখা যায়নি অথচ মানুষ মনে করছে রমজান শুরু হতে পারে—এমন দিনে রোজা রাখা মাকরুহ।

আম্মার বিন ইয়াসির (রা.) বলেন, “যে ব্যক্তি সন্দেহের দিনে রোজা রাখল, সে মহানবীর অবাধ্য হলো।” (সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ৬৮৬)

হাফেজ ইবনে হাজার আসকালানি (রহ.) সন্দেহের দিনে রোজা রাখাকে হারাম বলেছেন কারণ এটি সুন্নাহর সরাসরি লঙ্ঘন। (ফাতহুল বারি, ৪/১২০, দারুল মারিফাহ, বৈরুত, ১৯৭০)

শাবান মাস আমাদের শেখায় কীভাবে বড় কোনো লক্ষ্যের জন্য আগে থেকে প্রস্তুতি নিতে হয়। এই মাসে আমাদের প্রধান কাজ হওয়া উচিত:

  • ১. গত বছরের কাজা রোজাগুলো দ্রুত আদায় করা।

  • ২. বেশি বেশি নফল রোজা রাখা, তবে তা যেন রমজানের ঠিক ১-২ দিন আগে না হয়।

  • ৩. মন থেকে হিংসা ও শিরকের কালিমা মুছে ফেলা।

  • ৪. দলিলহীন কোনো উৎসব বা নামাজে লিপ্ত না হয়ে সহিহ সুন্নাহ মোতাবেক ইবাদত করা।

আল্লাহ আমাদের শাবান মাসের পবিত্রতা রক্ষা করার এবং সহিহ সুন্নাহ পালনের তাওফিক দান করুন। আমিন।

আরও পড়ুন