মৃত্যুর চোখে মানুষের ৪ স্তর: ইমাম গাজালির কালজয়ী দর্শন

ছবি: ফ্রিপিক

ইমাম গাজালি মৃত্যুর মনস্তাত্ত্বিক গভীরতা এবং মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে মানুষের বিভিন্ন শ্রেণির যে সূক্ষ্ম চরিত্রচিত্রণ তুলে ধরেছেন, তা মানবচৈতন্যকে নাড়া দেওয়ার মতো এক অতুলনীয় আধ্যাত্মিক দর্পণ।

ইসলামি দর্শনে মৃত্যু হলো নশ্বর জগত থেকে অবিনশ্বর চিরন্তন জীবনে উত্তরণের এক প্রবেশদ্বার। ইমাম গাজালি  মৃত্যুর বাস্তবতা ও মানুষের আত্মিক অবস্থানের স্তরগুলো সেভাবেই বিশ্লেষণ করেছেন।

মৃত্যুর অনিবার্যতা

মহাবিশ্বের কোনো সুরক্ষিত প্রাচীর, রাজপ্রাসাদ কিংবা আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞান মানুষকে মৃত্যুর হাত থেকে নিষ্কৃতি দিতে পারে না।

পবিত্র কোরআনে আল্লাহ ঘোষণা করেছেন, ‘তোমরা যেখানেই থাকো না কেন, মৃত্যু তোমাদের স্পর্শ করবেই—এমনকি যদি তোমরা সুউচ্চ সুদৃঢ় দুর্গেও অবস্থান করো।’ (সুরা নিসা, আয়াত: ৭৮)

মানুষ পার্থিব জীবনে যত আত্মরক্ষার দেয়ালই তুলুক না কেন, মৃত্যু থেকে পলায়নের কোনো সুযোগ নেই।

বলুন, তোমরা যে মৃত্যু থেকে পলায়ন করছ, তা নিশ্চিতভাবেই তোমাদের মুখোমুখি হবে। অতঃপর তোমাদের উপস্থিত করা হবে অদৃশ্য ও দৃশ্যের পরিজ্ঞাতা আল্লাহর সমীপে; আর তিনি তোমাদের জানিয়ে দেবেন যা কিছু তোমরা করতে।’
সুরা জুমুআ, আয়াত: ৮
আরও পড়ুন

তিনি বলেন, ‘বলুন, তোমরা যে মৃত্যু থেকে পলায়ন করছ, তা নিশ্চিতভাবেই তোমাদের মুখোমুখি হবে। অতঃপর তোমাদের উপস্থিত করা হবে অদৃশ্য ও দৃশ্যের পরিজ্ঞাতা আল্লাহর সমীপে; আর তিনি তোমাদের জানিয়ে দেবেন যা কিছু তোমরা করতে।’ (সুরা জুমুআ, আয়াত: ৮)

মৃত্যুর স্মরণে মানুষের চার স্তর

ইমাম আল-গাজালি মৃত্যুর স্মরণের ক্ষেত্রে মানুষের মানসিক অবস্থার ওপর ভিত্তি করে মানবসমাজকে চারটি প্রধান শ্রেণিতে বিন্যস্ত করেছেন। (ইহয়াউ উলুমিদ্দিন, ৪/৪৫০–৪৫৩, দারুল মা‘রিফাহ, বৈরুত, ১৯৮২ খ্রি.)

পার্থিব মোহে নিমজ্জিত: এই শ্রেণির মানুষ পার্থিব ভোগবিলাসে সম্পূর্ণরূপে আত্মহারা। সে সচরাচর মৃত্যুকে স্মরণ করে না; আর কদাচিৎ মনে পড়লেও তীব্র বিরক্তি ও ঘৃণার সঙ্গে তা এড়িয়ে যেতে চায়।

কারণ মৃত্যু তার ভোগবিলাসের মোহকে চুরমার করে দেয় এবং পার্থিব সম্পদ থেকে তাকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলে। এই শ্রেণির মানুষের মৃত্যুভাবনা তাকে তওবার পথে নেয় না; বরং সে ভাগ্যের ওপর অসন্তুষ্ট হয়ে পার্থিব ভোগে আরও বেশি বেপরোয়া হয়ে ওঠে।

অনুতপ্ত ও প্রাথমিক সাধক: এই স্তরের ব্যক্তি পরকালের চিন্তায় প্রতিনিয়ত মৃত্যুকে স্মরণ করে। তার অন্তরে আল্লাহর ভয় জাগ্রত থাকে এবং পাপমুক্ত হয়ে পাথেয় সংগ্রহে সে ব্যাকুল থাকে।

সে-ও মৃত্যুকে অপছন্দ করে, তবে পার্থিব মোহে নয়; বরং তার অন্তরে সার্বক্ষণিক এই শঙ্কা কাজ করে যে পর্যাপ্ত নেক আমল ও খাঁটি তওবা সম্পন্ন করার আগেই যদি হঠাৎ মৃত্যুর ডাক এসে যায়!

আরও পড়ুন
যে ব্যক্তি আল্লাহর সঙ্গে সাক্ষাৎকে ভালোবাসে, আল্লাহও তার সঙ্গে সাক্ষাৎকে ভালোবাসেন।
সহিহ বুখারি, হাদিস: ৬৫০৭

এই ব্যক্তির মৃত্যুভীতি কোনো অপরাধ নয়, বরং প্রশংসনীয় ও ক্ষমার যোগ্য; কেননা তার ভয়ের কারণ নিজের অপূর্ণ আধ্যাত্মিক প্রস্তুতি, কোনো পার্থিব লোভ নয়।

পরম প্রেমাস্পদ বান্দা: এটি আধ্যাত্মিকতার অত্যন্ত উচ্চ মার্গ। এই শ্রেণির মানুষ রাত-দিন মৃত্যুকে পরম ভালোবাসার সঙ্গে স্মরণ করেন। কারণ তিনি জানেন, মৃত্যুর পর্দা উন্মোচিত হওয়া ছাড়া তাঁর পরম প্রতিপালক ও প্রেমাস্পদের (আল্লাহর) সঙ্গে সরাসরি সান্নিধ্য লাভ সম্ভব নয়।

একজন প্রেমিক যেমন বহুল প্রতীক্ষিত মিলনমুহূর্তকে কখনো বিস্মৃত হতে পারে না, তেমনি আরেফ বান্দাও মৃত্যুর ক্ষণকে ভালোবাসেন। রাসুল (সা.) এই স্তরের ইঙ্গিত দিয়েই বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি আল্লাহর সঙ্গে সাক্ষাৎকে ভালোবাসে, আল্লাহও তার সঙ্গে সাক্ষাৎকে ভালোবাসেন।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৬৫০৭)

সমর্পিত নিষ্কাম আত্মা: এটি পরম সত্যনিষ্ঠ সিদ্দিকদের সর্বোচ্চ মাকাম। এই স্তরের বান্দা নিজের পছন্দ অনুযায়ী জীবন বা মৃত্যু কোনোটিই বেছে নেন না; বরং তিনি তাঁর রবের ইচ্ছার ওপর সম্পূর্ণ সন্তুষ্ট ও সমর্পিত থাকেন।

আল্লাহ যদি তাঁকে পৃথিবীতে দীর্ঘজীবী রেখে নেক আমল বৃদ্ধির সুযোগ দেন, তিনি তাতেই আনন্দিত; আর আল্লাহ যদি এই মুহূর্তেই তাঁকে ডেকে নেন, তবে তিনি পরম প্রশান্তচিত্তে সেই ফয়সালা মাথা পেতে নেন।

আরও পড়ুন