কোরআন মাজিদের ১১০তম সুরা ‘নাস্র’। এটি একটি মাদানি সুরা। ইমাম নাসায়ির মতে, এটি কোরআনের শেষ অবতীর্ণ পূর্ণাঙ্গ সুরা। মাত্র তিনটি আয়াতের এই ছোট সুরাটি যেমন সংক্ষিপ্ত, এর গাম্ভীর্য ও মর্মার্থ তেমনি সুদূরপ্রসারী।
এটি কেবল একটি সুরা নয়, বরং ইসলামি ইতিহাসের এক মহিমান্বিত সন্ধিক্ষণের ঘোষণা এবং একজন বিশ্বাসীর জন্য বিজয়ের মূহূর্তে পালনীয় আচরণের এক অনন্য নির্দেশিকা।
শেষ বিদায়ের পূর্বাভাস
সুরা নাস্রের গুরুত্ব কেবল এর বিজয়ের বার্তার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, বরং এটি মহানবী মুহাম্মদ (সা.)-এর পার্থিব জীবনের পরিসমাপ্তির একটি প্রচ্ছন্ন সংকেতও ছিল। ইমাম ইবনে কাসিরসহ অধিকাংশ তাফসিরবিদ উল্লেখ করেছেন, এই সুরাটি যখন অবতীর্ণ হয়, তখন এর নিগূঢ় অর্থ অনেকেই বুঝতে পেরেছিলেন।
আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.)-কে যখন এই সুরার তাৎপর্য সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল, তিনি বলেছিলেন, “এর মাধ্যমে আল্লাহ তাআলা তাঁর রাসুলের ওফাত নিকটবর্তী হওয়ার খবর দিয়েছেন।” (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৪৯৭০)
আমার প্রতিপালক আমাকে খবর দিয়েছিলেন যে, আমি অচিরেই আমার উম্মতের মাঝে একটি চিহ্ন দেখব।
অর্থাৎ, নবুয়তের যে মহান দায়িত্ব নিয়ে তিনি পৃথিবীতে এসেছিলেন, তার সফল সমাপ্তি ঘটেছে। এখন সময় হয়েছে তাঁর রবের সান্নিধ্যে ফিরে যাওয়ার।
আল্লাহর রাসুল (সা.) নিজেও এই সুরার মর্মার্থ উপলব্ধি করেছিলেন। আয়েশা (রা.) বর্ণনা করেন যে, জীবনের শেষ সময়ে রাসুলুল্লাহ (সা.) খুব ঘনঘন বলতেন, ‘সুবহানাল্লাহি ওয়া বিহামদিহি, আস্তাগফিরুল্লাহ ওয়া আতুবু ইলাইহি’ অর্থাৎ, আল্লাহর পবিত্রতা বর্ণনা করছি এবং তাঁর প্রশংসা করছি। আমি আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করছি এবং তাঁর কাছে তওবা করছি।
তিনি আরও বলেছিলেন, “আমার প্রতিপালক আমাকে খবর দিয়েছিলেন যে, আমি অচিরেই আমার উম্মতের মাঝে একটি চিহ্ন দেখব। যখন আমি তা দেখব, তখন যেন তাঁর প্রশংসা ও পবিত্রতা বর্ণনা করি এবং ক্ষমা প্রার্থনা করি। আর আমি সেই চিহ্ন দেখে ফেলেছি।” (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ৪৮৪)
প্রতিশ্রুত সেই মহা-বিজয়
সুরা নাসরের প্রথম আয়াতে আল্লাহ তাআলা বলেন, “যখন আসবে আল্লাহর সাহায্য ও বিজয়।” অধিকাংশ আলেমের মতে, এখানে ‘বিজয়’ বলতে ৮ম হিজরির ঐতিহাসিক মক্কা বিজয়কে বোঝানো হয়েছে। এই বিজয় ছিল ইসলামের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় টার্নিং পয়েন্ট।
মক্কা বিজয়ের আগে বহু আরব গোত্র দ্বিধাদ্বন্দ্বে ছিল। তারা ভাবত, মুহাম্মদ (সা.) যদি সত্যিই নবী হন, তবে তিনি তাঁর জাতির ওপর বিজয়ী হবেন। যখন মক্কা বিজয় সম্পন্ন হলো, তখন মানুষের সেই সংশয় কেটে গেল এবং দলে দলে মানুষ ইসলাম গ্রহণ করতে শুরু করল। মাত্র দুই বছরের ব্যবধানে সমগ্র আরব উপদ্বীপ ইসলামের পতাকাতলে চলে আসে।
মুমিনরা কেবল সেই বিজয়ের আমানতদার বা প্রহরী মাত্র। আল্লাহ ইসলামের খেদমতের জন্য কাউকে নির্বাচন করেন, এটি সেই বান্দার জন্য এক মহা সম্মান।
কোরআন এই দৃশ্যটিকেই চিত্রায়িত করেছে দ্বিতীয় আয়াতে, “এবং আপনি মানুষকে দলে দলে আল্লাহর দ্বীনে প্রবেশ করতে দেখবেন।”
বিজয় ও কৃতজ্ঞতার মূল পাঠ
সুরা নাস্র কেবল বিজয়ের খবর দিয়েই ক্ষান্ত হয়নি, বরং বিজয় পরবর্তী পরিস্থিতিতে একজন নেতার এবং একজন মুমিনের দৃষ্টিভঙ্গি কেমন হওয়া উচিত, তার দিকনির্দেশনা দিয়েছে।
১. বিজয় আল্লাহর পক্ষ থেকে আসে
সুরার শুরুতেই বলা হয়েছে ‘নাসরুল্লাহ’ বা ‘আল্লাহর সাহায্য’। এটি একটি গভীর শিক্ষা যে, বিজয় কোনো মানুষের একক কৃতিত্ব নয়। কোনো কৌশল বা শক্তির জোরে নয়, বরং বিজয় কেবল তখনই আসে যখন আল্লাহ তাআলা সাহায্য করেন।
মুমিনরা কেবল সেই বিজয়ের আমানতদার বা প্রহরী মাত্র। আল্লাহ ইসলামের খেদমতের জন্য কাউকে নির্বাচন করেন, এটি সেই বান্দার জন্য এক মহা সম্মান।
২. আল্লাহর পবিত্রতা ও প্রশংসা
বিজয় অর্জিত হওয়ার পর মানুষের মনে অহংকার বা দাম্ভিকতা আসা স্বাভাবিক। কিন্তু কোরআনের নির্দেশ হলো, “তখন আপনি আপনার রবের প্রশংসাসহ পবিত্রতা বর্ণনা করুন।” (সুরা নাসর, আয়াত: ৩)
বিজয় লাভের পর একজন বিশ্বাসীর প্রথম কাজ হলো নতশিরে আল্লাহর প্রশংসা করা। এটি মানুষকে স্মরণ করিয়ে দেয় যে, বিজয়ী হওয়ার পরও সে আল্লাহর একজন নগণ্য বান্দা ছাড়া আর কিছু নয়।
৩. ক্ষমা প্রার্থনা
বিজয় মুহূর্তে ‘ইস্তিগফার’ বা ক্ষমা প্রার্থনার নির্দেশটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। দীর্ঘ সংগ্রামের পথে যদি কখনও মনের কোণে কোনো হতাশা উঁকি দিয়ে থাকে, কিংবা আল্লাহর ওপর তাওয়াক্কুল করতে সামান্যতম বিচ্যুতি ঘটে থাকে—তার জন্য ক্ষমা চাওয়া।
বিজয়ী বেশে যখন তিনি মক্কায় প্রবেশ করছিলেন, তাঁর মাথা আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতায় এতটাই নত ছিল যে, তাঁর দাড়ি উটের পিঠের সাথে লেগে যাচ্ছিল।
এছাড়া বিজয়ের পর পরাজিতদের ওপর যাতে কোনো জুলুম বা প্রতিশোধপরায়ণতা কাজ না করে, ইস্তিগফার মানুষের মনকে সেই ঔদ্ধত্য থেকে মুক্ত রাখে।
রাসুলুল্লাহ (সা.) এই নির্দেশের বাস্তব প্রতিফলন ঘটিয়েছিলেন। বিজয়ী বেশে যখন তিনি মক্কায় প্রবেশ করছিলেন, তাঁর মাথা আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতায় এতটাই নত ছিল যে, তাঁর দাড়ি উটের পিঠের সাথে লেগে যাচ্ছিল। তিনি মক্কাবাসীদের ওপর কোনো প্রতিশোধ নেননি, বরং সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করেছিলেন।
সুরা নাস্র কেবল একটি ঐতিহাসিক বিজয়কে স্মরণ করার জন্য নয়, বরং আমাদের ব্যক্তিগত জীবনের প্রতিটি সফলতার জন্যও একটি আদর্শ। যখনই আমরা জীবনে কোনো সাফল্য পাই, কোনো সত্য উন্মোচিত হয়, কিংবা কোনো সংকট থেকে মুক্তি পাই—তখনই আমাদের উচিত সুরা নাসরের শিক্ষা অনুসরণ করা।