এআই কি দাজ্জাল? প্রযুক্তির নতুন জোয়ারে পুরোনো আতঙ্ক

ছবি: এআই / প্রথম আলো

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) অভূতপূর্ব বিপ্লব দেখে ইদানীং অনেকেই সংশয়ে পড়ে প্রশ্ন তুলছেন, এআই-ই কি তবে শেষ জামানার দাজ্জাল? কেউ কেউ ‘এ আই’ মানে ‘এক চোখ’ অর্থও করছেন। যদিও ব্যাকরণ বিচারে এমন অর্থ ভুল। কেননা, তখন ‘অ্যান আই’ হওয়ার কথা।

তবে প্রযুক্তির রূপান্তর দেখে তাকে ধর্মীয় ফিতনা বা দাজ্জালের সঙ্গে গুলিয়ে ফেলার এই প্রবণতা মোটেও নতুন কিছু নয়।

বিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে যখন টেলিভিশন মানুষের বাসাবাড়িতে পৌঁছাতে শুরু করেছিল, তখনও তৎকালীন সমাজের এক শ্রেণির মানুষ একই ধরনের দাবি তুলেছিল। 

তাদের বক্তব্য ছিল, ড্রয়িংরুমে রাখা এক চোখের এই যে কাচের বাক্সে সারা পৃথিবীর ছবি ফুটে উঠছে, এটিই নাকি হাদিসে বর্ণিত ‘এক চোখের দাজ্জাল‘!

পরবর্তীকালে কম্পিউটার ও ইন্টারনেটের বিশ্বব্যাপী বিস্তারের সময়েও একই ধরনের বিভ্রান্তি ছড়াতে দেখা গেছে।

দাজ্জাল কোনো প্রযুক্তি নয়

ইসলামের আলোকে দাজ্জাল কোনো রূপক ধারণা বা প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন নয়। মহানবী মহানবী (সা.) দাজ্জালের পরিচয় দিতে গিয়ে তাকে আদম সন্তানের মধ্য থেকেই একজন মানুষ হিসেবে স্পষ্ট করে বর্ণনা করেছেন।

মহানবী (সা.) দাজ্জালের শারীরিক গঠন, চোখের অবস্থা, মাথার চুল এবং চেহারার এমন নিখুঁত বিবরণ দিয়ে গেছেন, যা শুধু একজন জ্যান্ত মানুষের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য।

তিনি বলেছেন, দাজ্জাল হবে একজন লালচে-সাদা রঙের মানুষ, তার চুল হবে অত্যন্ত কোঁকড়ানো এবং সে ডান চোখে অন্ধ হবে; তার চোখটি দেখতে ভেসে ওঠা আঙুরের মতো। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৩৪৩৯)

এমনকি মহানবী (সা.) তৎকালীন আরবের খুজাআ গোত্রের ‘ইবন কাতান’ নামে এক ব্যক্তির কথা উল্লেখ করে বলেছিলেন যে, দাজ্জাল দেখতে অবিকল ওই লোকটির মতো হবে। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৩৪৩৯)

দাজ্জাল সম্পর্কিত হাদিসগুলোতে তাঁর দৈহিক রূপ, চোখ ও অবস্থানের যে বিবরণ এসেছে তা অলংকার বা রূপক নয়; বরং তিনি একজন সত্যকারের মানুষ, যাকে মহান আল্লাহ অলৌকিক কিছু ক্ষমতা দিয়ে পৃথিবীতে পাঠাবেন মানুষের পরীক্ষা হিসেবে।
ইমাম নববি (রহ.)
আরও পড়ুন

এ ছাড়া সাহাবি তামিম আদ-দারি (রা.)-এর দীর্ঘ হাদিস থেকে দাজ্জালের দৈহিক সত্তার চূড়ান্ত প্রমাণ পাওয়া যায়। তিনি সমুদ্রে পথ হারিয়ে এক দ্বীপে পৌঁছে শৃঙ্খলিত অবস্থায় এক বিশালদেহী মানুষকে দেখতে পেয়েছিলেন, যে নিজেকে দাজ্জাল হিসেবে পরিচয় দিয়েছিল এবং মহানবী (সা.) সাহাবিদের সামনে তামিম আদ-দারির এই প্রত্যক্ষদর্শীর বিবরণ সমর্থন করে বক্তব্য দেন। (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২৯৪২)

সুতরাং দাজ্জাল কোনো প্রযুক্তি বা কাল্পনিক বিষয় নয়, বরং মহান আল্লাহর সৃষ্টি এক শারীরিক সত্তা। কোনো যন্ত্র বা প্রযুক্তিগত অ্যালগরিদমকে কখনো মানব গোত্রের কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তির সঙ্গে তুলনা করা সম্ভব নয়।

পূর্বসূরি মনীষীদের অবস্থান

হাফিজ ইবনে হাজার আসকালানি উল্লেখ করেছেন যে দাজ্জাল হলেন আদম সন্তানেরই একজন সুনির্দিষ্ট ব্যক্তি, যিনি শেষ জামানায় আত্মপ্রকাশ করবেন এবং মহান আল্লাহ তাঁর মাধ্যমে মানুষের ইমান পরীক্ষা করবেন। (আল-আসকালানি, ফাতহুল বারি, ১৩/৯১, দারুল মারিফাহ, বৈরুত, ১৩৭৯ হি.)

ইমাম নববি লিখেছেন, দাজ্জাল সম্পর্কিত হাদিসগুলোতে তাঁর দৈহিক রূপ, চোখ ও অবস্থানের যে বিবরণ এসেছে তা অলংকার বা রূপক নয়; বরং তিনি একজন সত্যকারের মানুষ, যাকে মহান আল্লাহ অলৌকিক কিছু ক্ষমতা দিয়ে পৃথিবীতে পাঠাবেন মানুষের পরীক্ষা হিসেবে। (ইমাম নববি, আল-মিনহাজ শারহু সহিহ মুসলিম, ১৮/৫৮, দারুল ইহইয়া আত-তুরাস আল-আরাবি, বৈরুত, ১৯৯৫)

ইবনে কাসিরও তাঁর ইতিহাস গ্রন্থে দাজ্জালকে প্রবঞ্চক এক মিথ্যাবাদী মানুষ হিসেবে সাব্যস্ত করেছেন, যে নিজেকে প্রভু হিসেবে দাবি করবে। (ইবনে কাসির, আল-বিদায়াহ ওয়ান-নিহায়াহ, ১৯/১২১, দার আলম আল-কুতুব, রিয়াদ, ২০০৩)

ফলে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে ইসলামি মনীষীদের যে ঐক্যবদ্ধ মতামত চলে আসছে, তার আলোকেও এআই বা অন্য কোনো প্রযুক্তিকে দাজ্জাল বলার কোনো সুযোগ নেই।

টেলিভিশন থেকে এআই: নতুন প্রবঞ্চনা

তাহলে কেন মানুষ বারবার প্রযুক্তিকে দাজ্জাল বলে ভুল করে? এর প্রধান কারণ হলো, দাজ্জালের প্রধান চরিত্র হলো প্রতারণা বা চাতুর্য। আর আধুনিক প্রযুক্তি, যেমন—টেলিভিশন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম কিংবা এআই ব্যবহার করে মানুষ খুব সহজেই মিথ্যা ও বিভ্রান্তি ছড়াতে পারে।

আরও পড়ুন
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার এই যুগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যেকোনো তথ্য বা ভিডিও দেখলেই তা অন্ধভাবে বিশ্বাস করা উচিত নয়।

কিন্তু হাতিয়ার আর হাতিয়ারের ব্যবহারকারী কখনোই এক জিনিস নয়।

যেমন টেলিভিশন আবিষ্কৃত হওয়ার পর তার মাধ্যমে অশ্লীলতা বা বিভ্রান্তি ছড়িয়েছে ঠিকই, কিন্তু একই টেলিভিশনের মাধ্যমে বিশ্বের কোটি মানুষের কাছে কোরআন পাঠ, ওয়াজ-নসিহত ও ধর্মীয় শিক্ষাও পৌঁছে গেছে; যা দাজ্জালের মাধ্যমে হওয়ার কথা নয়।

ঠিক একইভাবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই নিজেই দাজ্জাল নয়; এটি মানুষের তৈরি একটি শক্তিশালী ডিজিটাল হাতিয়ার মাত্র।

কোরআনে মহান আল্লাহ নির্দেশ দিয়েছেন সত্যকে মিথ্যার সঙ্গে মিশ্রিত না করতে এবং জেনেবুঝে সত্য গোপন না করতে। (সুরা বাকারা, আয়াত: ৪২)

এআই প্রযুক্তির মাধ্যমে মানুষ যেমন ভুয়া তথ্য বা ডিপফেক ভিডিও বানিয়ে সত্যকে মিথ্যার রূপ দিতে পারে, তেমনই একে জটিল গবেষণা ও মানবকল্যাণেও ব্যবহার করা যায়। 

প্রযুক্তিকে দাজ্জাল বানিয়ে দিলে মানুষের মূল দায়িত্ব এড়িয়ে যাওয়ার একটি মানসিক সুযোগ তৈরি হয়। অথচ প্রযুক্তি অপব্যবহারের জন্য দায়ী মানুষের নিজস্ব নীতিজ্ঞান ও ইমানের ঘাটতি।

প্রকৃত প্রস্তুতি ও করণীয়

শেষ জামানায় ফিতনা ও বিভ্রান্তি এত তীব্র হবে যে, সঠিক পথ ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়বে। মহানবী (সা.) সতর্ক করে বলেছেন, মানুষের কাছে এমন এক ধৈর্যের সময় আসবে, যখন নিজের ধর্মকে আঁকড়ে ধরে রাখাটা হাতের তালুতে জ্বলন্ত অঙ্গার রাখার মতো কঠিন হবে। (সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ২২৬০)

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার এই যুগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যেকোনো তথ্য বা ভিডিও দেখলেই তা অন্ধভাবে বিশ্বাস করা উচিত নয়।

কোরআনের সুস্পষ্ট নির্দেশ হলো, কোনো অবিশ্বস্ত সংবাদ এলে তা প্রচার করার আগে ভালোভাবে তথ্য যাচাই-বাছাই করা। (সুরা হুজুরাত, আয়াত: ৬)

তাই টেলিভিশন কিংবা এআই-এর মতো প্রযুক্তিকে ‘দাজ্জাল’ আখ্যা দিয়ে বিভ্রান্তি ছড়ানোর কোনো সুযোগ ইসলামে নেই। আমাদের উচিত রাসুলের সুন্নত অনুসরণ করা। দাজ্জাল এক সুনির্দিষ্ট মানব সত্তা, যার ফিতনা থেকে বাঁচার জন্য তিনি প্রতি নামাজের শেষ বৈঠকে আশ্রয় প্রার্থনার শিক্ষা দিয়েছেন।

আরও পড়ুন