মতভেদ ও মতবৈচিত্র্যের জ্ঞানতত্ত্ব: ইখতিলাফের ফিতরাতি দর্শন

ছবি: এআই / প্রথম আলো

মানুষের জ্ঞান যত দিন থাকবে, মতভেদও তত দিন থাকবে। কারণ, মতভেদ কোনো দুর্ঘটনা নয়। মতের ভিন্নতা মানবজ্ঞান ও অস্তিত্বের স্বাভাবিক পরিণতি। একই আকাশের নিচে, একই পৃথিবীতে, একই ঘটনার সামনে দাঁড়িয়েও মানুষ ভিন্ন ফয়সালায় পৌঁছায়।

ইতিহাসের প্রতিটি যুগ, প্রতিটি সভ্যতা ও প্রতিটি জ্ঞানপরম্পরা এই বাস্তবতার সাক্ষ্য বহন করে।

অতএব মতভেদ কেন আছে, তা নিয়ে আমাদের বিকার নেই। প্রকৃত সওয়াল হলো, মতভেদ কী থেকে জন্ম নেয়, তার সীমা কোথায় এবং সত্যের অনুসন্ধানে তার স্থান কী?

এই প্রশ্নের জবাব ছাড়া কোনো জ্ঞানতত্ত্ব কামিল হতে পারে না।

ফিতরাতি বাস্তুবিদ্যা মতভেদকে প্রথমেই সত্যের বহুত্বের প্রমাণ বলে কবুল করে না। সত্য একাধিক হতে পারে না। কারণ, বাস্তবতার উৎস এক এবং কায়েনাত একটি অভিন্ন নেজামের অধীনে পরিচালিত।

কিন্তু সত্যের পথে মানুষের যাত্রা একরৈখিক নয়। মানুষের দৃষ্টিশক্তি সীমিত, অভিজ্ঞতা অসম্পূর্ণ, ভাষা বহুমাত্রিক ও বাস্তবতা স্তরবিন্যস্ত। ফলে একই সত্যের দিকে অগ্রসর হওয়ার পথে বহু ব্যাখ্যা, অনুমান ও উপলব্ধির জন্ম হওয়া স্বাভাবিক।

মতভেদ তখনই কল্যাণকর, যখন তা যৌথভাবে সত্যের তলব করে। কিন্তু বিরোধ জন্ম নেয় তখন, যখন সত্যের পরিবর্তে ব্যক্তি, দল বা মতবাদ নিজেই মাকসাদে পরিণত হয়।

অতএব মতভেদকে সত্যের বিভক্তি বলার সুযোগ নেই। সত্যে পৌঁছানোর মানবিক অভিযাত্রার স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য হলো মতভেদ।

এ কারণে ফিতরাতি বাস্তুবিদ্যা মতভেদ ও বিরোধকে এক জিনিস মনে করে না। মতভেদ তখনই কল্যাণকর, যখন তা যৌথভাবে সত্যের তলব করে। কিন্তু বিরোধ জন্ম নেয় তখন, যখন সত্যের পরিবর্তে ব্যক্তি, দল বা মতবাদ নিজেই মাকসাদে পরিণত হয়।

প্রথম ক্ষেত্রে মতভেদ জ্ঞানকে সমৃদ্ধ করে, আর দ্বিতীয় ক্ষেত্রে তা সমাজকে বিভক্ত করে। ফলে প্রতিটি ইখতিলাফ সমান নয়। কোনো মতভেদ হিকমাহর পথ উন্মুক্ত করে, আবার কোনো মতভেদ নফসানি সংঘাতে পরিণত হয়।

ফিতরাতি ব্যাখ্যায় মতভেদের উৎপত্তি ঘটে প্রধানত চারটি তবকায়। প্রথম তবকা বাস্তবতার জটিলতা। কায়েনাতের প্রতিটি বিষয় একই মাত্রায় সুস্পষ্ট নয়। অনেক বাস্তবতা বহুস্তরীয়। ফলে বিভিন্ন পর্যবেক্ষক তাঁর ভিন্ন ভিন্ন দিক প্রত্যক্ষ করতে পারেন।

আরও পড়ুন

দ্বিতীয় তবকা ভাষা। মানবভাষা কখনো সম্পূর্ণ যান্ত্রিক নয়। একটি শব্দ, একটি রূপক বা একটি বাক্য বহুমাত্রিক অর্থ ধারণ করতে পারে। ফলে উপলব্ধির মাত্রা বিচিত্র হতে পারে।

তৃতীয় স্তর অভিজ্ঞতা। মানুষ যে সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও ঐতিহাসিক পরিমণ্ডলে বেড়ে ওঠে, তা তার দৃষ্টিভঙ্গিকে প্রভাবিত করে।

চতুর্থ স্তর হলো নৈতিক অবস্থা। একই প্রমাণ ভিন্ন ভিন্ন হৃদয়ে ভিন্ন প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করতে পারে। কারণ, ব্যাখ্যা শুধু বুদ্ধির কাজ নয়। ইনসানি আখলাকও ব্যাখ্যার কাজ করে।

এই দর্শনে মতভেদকে তিনটি পর্যায়ে বোঝা যায়। প্রথমটি হলো তানাওউ বা বৈচিত্র্য। এখানে ভিন্ন মতগুলো পরস্পরকে অস্বীকার করে না; বরং একই সত্যের বিভিন্ন দিক উন্মোচন করে।

যেমন একটি বনকে উদ্ভিদবিদ, জলবায়ুবিজ্ঞানী, কবি ও ফকিহ ভিন্নভাবে বর্ণনা করতে পারেন, অথচ তাঁদের বর্ণনাগুলো পরস্পরবিরোধী নয়; বরং তাঁরা সম্মিলিতভাবে বনের পূর্ণতর অর্থ জাহির করেন। এই বৈচিত্র্য জ্ঞানের সম্পদ।

দ্বিতীয় তবকা হলো ইজতিহাদি মতভেদ। এখানে অনুসন্ধানকারীরা একই সত্যে পৌঁছাতে আন্তরিক থাকলেও প্রমাণের মূল্যায়ন, ব্যাখ্যার তরিকা কিংবা অগ্রাধিকারের তফাতের কারণে ভিন্ন ফয়সালায় উপনীত হন।

এই মতভেদ মানবজ্ঞানগত সীমাবদ্ধতার স্বাভাবিক ফল। এখানে বিনয় অপরিহার্য। কারণ, প্রতিটি ব্যাখ্যা আংশিক হতে পারে এবং নতুন প্রমাণের আলোকে সংশোধিত হতে পারে।

এখানে সমস্যা দেখা দেয় হকের প্রতি আনুগত্যের অভাবে। যখন নফস, ক্ষমতা, লোভ, দলীয় আনুগত্য কিংবা আদর্শিক সংকীর্ণতা ব্যাখ্যাকে নিয়ন্ত্রণ করতে শুরু করে, তখন মতভেদ আর জ্ঞানগত নয়; তা বরং নৈতিক সংকটে পরিণত হয়।

এই স্তরে মতভেদকে শত্রুতা নয়; বরং পারস্পরিক শিক্ষা হিসেবে দেখা উচিত।

তৃতীয় তবকা হলো বিভ্রান্তিকর মতভেদ। এখানে সমস্যা দেখা দেয় হকের প্রতি আনুগত্যের অভাবে। যখন নফস, ক্ষমতা, লোভ, দলীয় আনুগত্য কিংবা আদর্শিক সংকীর্ণতা ব্যাখ্যাকে নিয়ন্ত্রণ করতে শুরু করে, তখন মতভেদ আর জ্ঞানগত নয়; তা বরং নৈতিক সংকটে পরিণত হয়।

এ অবস্থায় মানুষ প্রমাণকে অনুসরণ করে না; বরং প্রমাণকে নিজের অবস্থানের অধীন করতে চায়। ফলে ইখতিলাফ ধীরে ধীরে ইফতিরাকে, আর সংলাপ সংঘাতে রূপান্তরিত হয়।

ফিতরাতি বাস্তুবিদ্যা মতভেদের সমাধানে একরূপতা প্রতিষ্ঠার কথা বলে না। কারণ, সব মানুষকে একই ভাষায়, অভিজ্ঞতায় ও চিন্তাপদ্ধতিতে আবদ্ধ করা ফিতরাতের বিরুদ্ধাচরণ। আল্লাহ কায়েনাতকে বৈচিত্র্যসহ পয়দা করেছেন; মানবসমাজও সেই বৈচিত্র্যের অংশ।

আরও পড়ুন

ফলে লক্ষ্য মতের বিলুপ্তি নয়; বরং মতের নৈতিক শৃঙ্খলা। এই শৃঙ্খলার প্রথম নীতি হলো, কোনো মতই নিজেকে সত্যের সমার্থক মনে করতে পারে না। মানুষ সত্যের অনুসন্ধানকারী; সত্যের মালিক নয়।

এ কারণেই ফিতরাতি বাস্তুবিদ্যায় ইখতিলাফের আদব একটি জ্ঞানতাত্ত্বিক নীতি। প্রতিপক্ষকে পরাজিত করা নয়; বরং তার বক্তব্যকে যথাযথভাবে বোঝা ইলমের শর্ত। নিজের অবস্থানের দুর্বলতা অনুসন্ধান করা যেমন প্রয়োজন, তেমনি প্রতিপক্ষের শক্তিশালী যুক্তিকেও ন্যায্যভাবে উপস্থাপন করা প্রয়োজন।

কারণ, যে জ্ঞান শুধু নিজের পক্ষে সাক্ষ্য সংগ্রহ করে, সে জ্ঞান ধীরে ধীরে মতাদর্শে পরিণত হয়। কিন্তু যে জ্ঞান নিজের বিরুদ্ধের প্রমাণকেও গুরুত্ব দেয়, সে সত্যের দিকে অগ্রসর হয়।

এই দর্শন আরও মনে করে যে সব মতের সমান মূল্য নেই। মতের মর্যাদা নির্ধারিত হয় তার সত্যনিষ্ঠা, নৈতিক পরিণতি, বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্য ও ফিতরাতের সঙ্গে সংগতির দ্বারা। ফলে বহুস্বর মানে সত্যের আপেক্ষিকতা নয়; বরং সত্যের অনুসন্ধানে বহুমাত্রিক অংশগ্রহণ।

এই দর্শনে বহুত্বকে স্বীকার করা হয়, কিন্তু আপেক্ষিকতাকে নয়। কারণ, যদি সব মত সমান সত্য হয়, তবে সত্যের ধারণাই অর্থহীন হয়ে পড়ে।

ইখতিলাফের নৈতিক নিয়ন্ত্রণ হারালে তা ফিতনা সৃষ্টি করে। ইখতিলাফ ফিতরাত, আদব ও ইনসাফের অধীনে পরিচালিত হলে তা হিকমাহর দ্বার উন্মুক্ত করে।

ফিতরাতি বাস্তুবিদ্যার দৃষ্টিতে ইখতিলাফের সর্বোচ্চ উদ্দেশ্য তাকামুল বা পারস্পরিক পূর্ণতা। মানুষ একে অপরের প্রতিদ্বন্দ্বী নয়; বরং অসম্পূর্ণ উপলব্ধির বাহক।

একজনের অভিজ্ঞতা অন্যজনের সীমাবদ্ধতা পূরণ করতে পারে, একটি শাস্ত্র অন্য শাস্ত্রের অপূর্ণতা দূর করতে পারে, একটি সভ্যতা অন্য সভ্যতার ভুল থেকে শিক্ষা নিতে পারে। এভাবেই মতভেদ বিভাজনের শক্তি না হয়ে সম্মিলিত প্রজ্ঞার উৎসে পরিণত হয়।

অতএব ফিতরাতি বাস্তুবিদ্যায় মতভেদ কোনো অনিবার্য অকল্যাণ নয়, আবার কোনো রোমান্টিক আদর্শও নয়। এটি মানুষের সীমিত জ্ঞান, বহুমাত্রিক বাস্তবতা ও সত্যের দীর্ঘ অভিযাত্রার স্বাভাবিক সঙ্গী। ইখতিলাফের নৈতিক নিয়ন্ত্রণ হারালে তা ফিতনা সৃষ্টি করে। ইখতিলাফ ফিতরাত, আদব ও ইনসাফের অধীনে পরিচালিত হলে তা হিকমাহর দ্বার উন্মুক্ত করে।

এ কারণেই প্রকৃত ইলম সব কণ্ঠকে এক কণ্ঠে পরিণত করার কুশেশ করে না; বরং সে বহু কণ্ঠকে এমন এক নেজামের মধ্যে স্থাপন করতে চায়, যেখানে তাদের ভিন্নতা সত্যের দিকেই সমবেত অগ্রযাত্রায় পরিণত হয়।

  • মুসা আল হাফিজ: লেখক, প্রাবন্ধিক ও গবেষক। ইসলামিক হিস্ট্রি অ্যান্ড কালচার অলিম্পিয়াড বাংলাদেশের চেয়ারম্যান

আরও পড়ুন