নবীজির শিক্ষক কে ছিলেন

ছবি: পেক্সেলস

যে মানুষ চল্লিশ বছর বয়স পর্যন্ত কোনো শিক্ষায়তনের সান্নিধ্যে যাননি এবং যাঁর প্রাতিষ্ঠানিক অক্ষরজ্ঞানের কোনো প্রমাণ নেই, হঠাৎ করেই তাঁর মুখনিঃসৃত বাণী গোটা বিশ্বের সাহিত্য, আইন, দর্শন ও আধ্যাত্মিক ধারাকে আমূল বদলে দিল।

আধুনিক পশ্চিমা প্রাচ্যবিদেরা এই অলৌকিকত্বকে ধামাচাপা দিতে এক চিরাচরিত অপবাদ দিয়ে এসেছে যে মুহাম্মদ (সা.) স্বশিক্ষিত কিংবা তিনি কোনো ইহুদি-খ্রিষ্টান পাদ্রির কাছ থেকে পূর্ববর্তী ধর্মগ্রন্থ শিখে নিয়ে কোরআন রচনা করেছেন।

কিন্তু ঐতিহাসিক সাক্ষ্যপ্রমাণ, কোরআনের অতুলনীয় ভাষাশৈলী এবং এতে বর্ণিত নির্ভুল ভবিষ্যৎবাণীসমূহের নির্মোহ বিশ্লেষণ প্রমাণ করে যে কোরআনের রচয়িতা কোনো মানুষ হতে পারেন না; এর একক শিক্ষক হলেন বিশ্বজগতের প্রতিপালক আল্লাহ-তাআলা।

নিরক্ষর নবী ও মক্কার সামাজিক বাস্তবতা

কোরআন যে মানুষের রচনা নয়, তার সবচেয়ে বড় প্রত্যক্ষ ঐতিহাসিক প্রমাণ হলো নবীজির নিরক্ষরতা। তিনি কোনো গ্রন্থ পাঠ করতে পারতেন না এবং কোনো কিছু নিজ হাতে লিখতেন না।

কোরআনে আল্লাহ-তাআলা নিজেই ঘোষণা করেন, “এর পূর্বে আপনি কোনো কিতাব পাঠ করেননি এবং নিজ হাতে কোনো কিতাব লিখেনওনি; যদি তা হতো, তবে এই বাতিলপন্থীরা সন্দেহে পতিত হওয়ার সুযোগ পেত।” (সুরা আনকাবুত, আয়াত: ৪৮)

মক্কা ছিল একটি উন্মুক্ত গোত্রীয় সমাজ, যেখানে কারও ব্যক্তিগত জীবন গোপন রাখার উপায় ছিল না। মহানবী (সা.) যদি গোপনে কোনো পণ্ডিতের কাছে পড়াশোনা করতেন কিংবা বিদেশি ভাষা শিখে তাওরাত-ইঞ্জিল অনুবাদ করতেন, তবে মক্কার কোরাইশরা সবার আগে সেই শিক্ষককে জনসমক্ষে টেনে আনত।

চল্লিশ বছর পর্যন্ত সততা ও বিশ্বস্ততার প্রতীক ‘আল-আমিন’ উপাধিতে ভূষিত একজন ব্যক্তি হঠাৎ অলীক সাহিত্য রচনা করবেন—তা আরবের বিরোধীরাও বিশ্বাস করতে পারেনি।

আধুনিক পশ্চিমা প্রাচ্যবিদেরা চিরাচরিত অপবাদ দিয়ে এসেছে যে মুহাম্মদ (সা.) স্বশিক্ষিত কিংবা তিনি কোনো ইহুদি-খ্রিষ্টান পাদ্রির কাছ থেকে পূর্ববর্তী ধর্মগ্রন্থ শিখে নিয়ে কোরআন রচনা করেছেন।
আরও পড়ুন

পূর্ববর্তী কিতাব চুরির অপবাদ

প্রাচ্যবিদরা প্রায়শই সিরিয়া সফরের সময় খ্রিষ্টান পাদ্রি বাহিরা কিংবা নবুয়তের সূচনালগ্নে খাদিজার প্রবীণ অন্ধ চাচাতো ভাই ওয়ারাকা ইবনে নাওফালের নাম উল্লেখ করে দাবি করে যে তাঁরাই নবীজিকে শিক্ষা দিয়েছিলেন।

ঐতিহাসিক সত্যের মানদণ্ডে এই দাবি সম্পূর্ণ ভুল।

পাদ্রি বাহিরা: মহানবী (সা.) যখন বারো বছর বয়সে চাচা আবু তালিবের সঙ্গে ব্যবসায়িক সফরে যান, তখন বুসরা নামক স্থানে পাদ্রি বাহিরার সঙ্গে মাত্র কয়েক মিনিটের একটি সাধারণ সাক্ষাৎ হয়েছিল। একজন বারো বছরের বালক কোনো ভিনদেশি ভাষায় কয়েক মিনিটের আলোচনায় সুদূর ভবিষ্যতের ৬,২৩৬টি আয়াতের এক মহাগ্রন্থ মুখস্থ করে ফেলবে—এমন দাবি সুস্থ বিবেকবিরোধী।

ওয়ারাক্বা ইবনে নাওফাল: ওয়ারাক্বা ছিলেন তাওরাত-ইঞ্জিলের পণ্ডিত এক প্রবীণ বৃদ্ধ। হেরা গুহায় প্রথম ওহি নাজিলের পর মহানবী (সা.) যখন ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে বাড়ি ফেরেন, তখন ওয়ারাক্বাই সাক্ষ্য দিয়ে বলেছিলেন, ‘ইনি সেই নামুস (জিবরিল), যিনি নবী মুসার কাছে আসতেন; হায়, আমি যদি তোমার নবুওয়াতের দিনে তরুণ থাকতাম!’

এর কিছুদিন পরই ওয়ারাক্বা ইন্তেকাল করেন। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৩)

যিনি মাত্র প্রথম ওহির সময় ওহির সত্যতার সাক্ষ্য দিয়ে মৃত্যুবরণ করলেন, তিনি কীভাবে পরবর্তী তেইশ বছরের অবতীর্ণ কোরআনের শিক্ষক হতে পারেন?

মক্কার মুশরিকরা অভিযোগ তুলেছিল যে রোমান এক খ্রিষ্টান গোলাম নবীজিকে কথা শিখিয়ে দেয়। কোরআন তাদের এই অজ্ঞতাকে প্রত্যাখান করে বলেছে, “আমি খুব ভালো করেই জানি তারা বলে: ‘তাকে তো এক মানুষে শিক্ষা দেয়!’ অথচ তারা যার প্রতি ইঙ্গিত করে তার ভাষা অনারবি (অস্পষ্ট), আর এই কোরআন হলো সুস্পষ্ট আরবি ভাষা!” (সুরা নাহল, আয়াত: ১০৩)

তাছাড়া বাইবেলের বিবরণের সঙ্গে কোরআনের মৌলিক ধর্মতাত্ত্বিক তফাত রয়েছে। বাইবেলে বহু নবীকে ব্যভিচার, মদ্যপান ও মূর্তিপূজার মতো জঘন্য অপরাধে লিপ্ত দেখানো হয়েছে; যেখানে কোরআন প্রতিটি নবীকে নিষ্পাপ ও মর্যাদাবান হিসেবে সংশোধন করে তুলে ধরেছে।

কোরআনের ভবিষ্যৎবাণী

সাধারণ রাজনৈতিক বিশ্লেষণ বা বিজ্ঞজনোচিত অনুমান আর ওহিনির্ভর ‘ভবিষ্যৎবাণী’র মধ্যে বিপুল ব্যবধান রয়েছে। অনুমানের মধ্যে সবসময় ভুল হওয়ার সম্ভাবনা থাকে, কিন্তু কোরআনের প্রতিটি ভবিষ্যৎবাণী অক্ষরে অক্ষরে বাস্তবায়িত হয়েছে, যা শুধু অতীত ও ভবিষ্যতের একমাত্র জ্ঞাতাস্বরূপ সর্বজ্ঞানী সত্তার পক্ষেই সম্ভব।

এর প্রধান দুটি দৃষ্টান্ত হলো:

রোমানদের বিজয়ের ঘোষণা: খ্রিষ্টীয় সপ্তম শতকের শুরুতে পারস্যের সাসানীয় সাম্রাজ্য রোমান বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্যকে শোচনীয়ভাবে পরাজিত করে জেরুজালেম ও মিসর দখল করে নেয়। সমকালীন সামরিক বিশ্লেষকদের মতে রোমের ঘুরে দাঁড়ানো ছিল সম্পূর্ণ অসম্ভব। ঠিক সেই চরম মুহূর্তে কোরআন ভবিষ্যৎবাণী উচ্চারণ করে, “রোমানরা পরাজিত হয়েছে নিকটবর্তী নিম্নভূমিতে; কিন্তু তারা তাদের এই পরাজয়ের পর অতিসত্বর বিজয়ী হবে—কয়েক বছরের (৩ থেকে ৯ বছরের) মধ্যেই। পূর্বাপর সমস্ত বিষয়ের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত একমাত্র আল্লাহর হাতে। আর সেদিন মুমিনরা আনন্দিত হবে—আল্লাহর সাহায্যে।” (সুরা রুম, আয়াত: ২–৫)
কোনো রাজনৈতিক প্রতারক এমন নির্দিষ্ট সময়সীমা বেঁধে দিয়ে এমন ঝুঁকিপূর্ণ দাবি করতে পারে না; কারণ ৩ থেকে ৯ বছরের মধ্যে রোম না জিতলে ইসলাম চিরতরে মিথ্যা প্রমাণিত হয়ে যেত।

কিন্তু ঠিক ঐতিহাসিক সেই সময়সীমার মধ্যে (নাইনভে যুদ্ধে, ৬২৭ খ্রি.) রোমানরা অলৌকিকভাবে পারস্যকে পরাস্ত করে ঐতিহাসিক বিজয় ছিনিয়ে নেয়, যা ছিল কোরআনের এক জীবন্ত মোজিজা।

আরও পড়ুন
তৎকালীন যুগে মমি বা প্রাচীন মিসরীয় ইতিহাস মরু আরবের কারও পক্ষে জানা সম্ভব ছিল না; অথচ আধুনিক যুগে সেই দেহাবশেষ উদ্ধার হয়ে আজ কোরআনের সত্যতার সাক্ষ্য দিচ্ছে।

ফেরাউনের লাশের সুরক্ষা ও মক্কা বিজয়: সুরা ইউনুসের ৯২ নম্বর আয়াতে লোহিত সাগরে নিমজ্জিত ফেরাউনকে লক্ষ্য করে বলা হয়েছিল, “আজ আমি তোমার দেহ রক্ষা করব, যাতে তুমি তোমার পরবর্তী প্রজন্মের জন্য এক শিক্ষণীয় নিদর্শন হয়ে থাকো।”

তৎকালীন যুগে মমি বা প্রাচীন মিসরীয় ইতিহাস মরু আরবের কারও পক্ষে জানা সম্ভব ছিল না; অথচ আধুনিক যুগে সেই দেহাবশেষ উদ্ধার হয়ে আজ কোরআনের সত্যতার সাক্ষ্য দিচ্ছে।

অনুরূপভাবে হোদাইবিয়ার সন্ধির চরম কোণঠাসা মুহূর্তে সুরা ফাতহের ২৭ নম্বর আয়াতে মক্কা বিজয়ের যে ভবিষ্যদ্বাণী করা হয়েছিল, তা পরবর্তী সময়ে হুবহু বাস্তবায়িত হয়।

কোরআনের মূল শিক্ষক কে

কোরআন কোনো মানুষের শেখানো ভাষা নয়। কোরআন সুস্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছে নবীজির প্রকৃত শিক্ষাদাতার পরিচয়, “তিনি (রাসুল) নিজের খেয়ালখুশি মতো কোনো কথা বলেন না; এটি তো শুধু এক ওহি, যা তাঁর প্রতি অবতীর্ণ হয়। তাঁকে শিক্ষা দান করেছেন এক মহাশক্তিধর সত্তা (ফেরেশতা জিবরিল, আল্লাহর নির্দেশে)।” (সুরা নাজম, আয়াত: ৩–৫)

আল্লাহ-তাআলা ঘোষণা করেন, “পরম দয়াময় আল্লাহ; তিনিই শিক্ষা দিয়েছেন এই কোরআন।” (সুরা রহমান, আয়াত: ১–২)

স্রষ্টা তাঁর বিশ্বস্ত দূত জিবরিল (আ.)-এর মাধ্যমে তেইশ বছর ধরে ধাপে ধাপে বিশ্বনবীর পবিত্র অন্তরে এই বাণী সরাসরি ঢেলে দিয়েছেন।

আরও পড়ুন