জীবনে একবার ‘সালাতুত তাসবিহ’ কি পড়তেই হবে

ছবি: এএফপি

নফল নামাজগুলোর মধ্যে ‘সালাতুত তাসবিহ’ একটি অনন্য ও ফজিলতপূর্ণ ইবাদত। এই নামাজ গুনাহ ক্ষমা ও আত্মশুদ্ধির জন্য বিশেষভাবে প্রসিদ্ধ। বেশ কিছু হাদিসে এই নফল নামাজের ফজিলত বর্ণিত হয়েছে। এখানে কয়েকটি হাদিস উল্লেখ করা হলো।

তিনটি হাদিস

এক. আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.)-এর বরাতে হাদিসে আছে, একদিন নবীজি (সা.) আমার পিতা আব্বাস ইবনে আবদুল মুত্তালিব (রা.)-কে বললেন, ‘চাচাজান, আমি কি আপনাকে উত্তম তাসবিহ শিক্ষা দেব না, যখন আপনি তা সম্পাদন করবেন, আল্লাহ আপনার পূর্বাপর, নতুন-পুরাতন, ইচ্ছা-অনিচ্ছায় ছোট-বড় সকল প্রকার পাপ ক্ষমা করবেন। তা হলো, চার রাকাত নামাজ। প্রতি রাকাতে সুরা ফাতিহা এবং পরে একটি সুরা পড়বেন। প্রথম রাকাতে কিরাত পড়া হলে দাঁড়ানো অবস্থায় পনেরো বার বলবেন, “সুবহানাল্লাহি ওয়াল হামদুলিল্লাহি ওয়া লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াল্লাহু আকবার”।

তারপর রুকু করবেন এবং রুকু অবস্থায় পড়বেন দশবার। রুকু হতে সোজা হয়ে দাঁড়াবেন এবং এ অবস্থায় তাসবিহ পড়বেন দশবার। তারপর সিজদায় নত হবেন এবং দশবার তাসবিহ পড়বেন। তারপর সিজদা থেকে মাথা তুলে (দুই সিজদার মধ্যবর্তী সময়ে) তাসবিহ দশবার পড়বেন। তারপর আবার সিজদায় যাবেন এবং সে অবস্থায় দশবার তাসবিহ পড়বেন। তারপর (দ্বিতীয়) সিজদা থেকে মাথা তুলে আরও দশবার তাসবিহ পড়বেন।’ এভাবে প্রতি রাকাতে ‘সুবহানাল্লাহি ওয়াল হামদুলিল্লাহি ওয়া লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াল্লাহু আকবার’ তাসবিহটি ৭৫ বার পড়া হবে।

আরও পড়ুন

চার রাকাত নামাজের প্রতি রাকাতে এভাবে করবেন। যদি প্রতিদিন একবার এই নামাজ পড়তে পারেন, পড়বেন। না হলে প্রতি জুমার দিন একবার পড়বেন। তা-ও না পারলে প্রতি মাসে একবার। তা-ও না হলে বছরে একবার। এবং তা-ও যদি না পারেন তবে জীবনে অন্তত একবার পড়বেন। (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস: ১২৯৭)

দুই. আবু রাফে (রা.) থেকে বর্ণিত আল্লাহর রাসুল (সা.) বলেছেন, যে ব্যক্তি সালাতুত তাসবিহ আদায় করবে, আল্লাহ তার আগের ও পরের গুনাহ মাফ করে দেবেন (মুসনাদে আহমদ, হাদিস: ২৭১২৮)।

তিন. আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, যে ব্যক্তি সালাতুত তাসবিহ আদায় করবে, তার জন্য জান্নাতের দরজা খুলে দেওয়া হবে। (মুসতাদরাকে হাকিম, হাদিস: ১২১৯)

সালাতুত তাসবিহ পড়ার বিধান

সালাতুত তাসবিহ অর্থাৎ তাসবিহ পাঠের নামাজ ওয়াজিব নয়, সুন্নাতে মুয়াক্কাদাও নয়, ফরজ তো নয়ই; বরং নফল। অর্থাৎ সালাতুত তাসবিহ আদায় করলে সওয়াব হবে, আদায় না করলে কোনো গুনাহ হবে না। নামাজের নিষিদ্ধ ও মাকরুহ সময় ছাড়া যেকোনো সময় সালাতুত তাসবিহ আদায় করা যায়।

আমরা আল্লাহর প্রশংসাবাচক যে শব্দগুলো জপমালায় সকাল-সন্ধ্যা জপি, তাকেই তাসবিহ বলে। যেহেতু এই নামাজে ‘সুবহানাল্লাহি ওয়াল হামদুলিল্লাহি ওয়া লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াল্লাহু আকবার’—তাসবিহ বারবার পড়া হয়, তাই একে সালাতুত তাসবিহ বা তাসবিহ পাঠের নামাজ বলা হয়।

আরও পড়ুন

সালাতুত তাসবিহ আদায়ের নিয়ম

সালাতুত তাসবিহ আদায়ের বিভিন্ন পদ্ধতি রয়েছে। তন্মধ্যে সবচেয়ে সহজ পদ্ধতি হলো—সালাতুত তাসবিহ চার রাকাত। প্রতি রাকাতে ‘সুবহানাল্লাহি ওয়াল হামদুলিল্লাহি ওয়া লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াল্লাহু আকবার’ তাসবিহগুলো ৭৫ বার পড়তে হয়। চার রাকাতে মোট ৩০০ বার পড়তে হয়।

  • প্রথম রাকাতে সানা পড়ার পর ১৫ বার পড়তে হবে: ‘সুবহানাল্লাহি ওয়াল হামদুলিল্লাহি ওয়া লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াল্লাহু আকবার’।

  • তারপর সুরা ফাতিহা ও অন্য সুরা পাঠ সম্পন্ন হবার পর দাঁড়ানো অবস্থায় রুকুতে যাওয়ার আগে ১০ বার।

  • রুকুতে তাসবিহর পর ১০ বার।

  • রুকু থেকে মাথা ওঠানোর পর সোজা হয়ে দাঁড়ানো অবস্থায় (রাব্বানা লাকাল হামদ পড়ার পর) ১০ বার।

  • প্রথম সেজদায় তাসবিহর পর ১০ বার।

  • সেজদা থেকে মাথা ওঠানোর পর ১০ বার।

  • পুনরায় সেজদায় গিয়ে ১০ বার। সেজদা থেকে মাথা ওঠিয়ে দ্বিতীয় রাকাতে একইভাবে তাসবিহ পাঠ করতে হবে।

বিশেষ কিছু নিয়ম:

  • কোনো এক স্থানে তাসবিহ পড়তে সম্পূর্ণ ভুলে গেলে বা সংখ্যায় কম পড়লে পরবর্তী যে রুকনেই স্মরণ আসুক, সেখানে সংখ্যার সঙ্গে ভুলে যাওয়া তাসবিহগুলোও আদায় করে নেবেন। তবে কওমা (রুকু থেকে দাঁড়ানো) ও দুই সেজদার মাঝখানে পূর্বের ভুলে যাওয়া তাসবিহগুলো আদায় করা যাবে না।

  • এই নামাজে কোনো কারণে সিজদায়ে সাহু ওয়াজিব হলে সেই সিজদা এবং তার মধ্যকার বৈঠকে ওই তাসবিহ পাঠ করতে হবে না।

  • তাসবিহর সংখ্যা মনে থাকলে আঙুলের ওপর গণনা না করাই উত্তম, যাতে নামাজের একাগ্রতা (খুশু-খুদু) নষ্ট না হয়। তবে ভুলে যাওয়ার আশঙ্কা থাকলে আঙুলের মাথা চেপে বা অন্য কোনো উপায়ে গণনা করা জায়েজ (রদ্দুল মুহতার: ২/২৮)।

আরও পড়ুন