প্রাচীন আলেমদের ‘মাজহাব’ পরিবর্তনের ইতিহাস

ছবি: ফ্রিপিক

ইসলামি আইনশাস্ত্রে ‘মাজহাব’ বলতে বোঝায় কোনো নির্দিষ্ট মুজতাহিদ ইমামের কোরআন ও হাদিস থেকে প্রণীত গবেষণালব্ধ আইনি সিদ্ধান্তের (ইজতিহাদ) সমষ্টি।

ইসলামে কোনো নির্দিষ্ট মাজহাব অনুসরণ করা ইবাদত পালনের একটি সুশৃঙ্খল মাধ্যম। ফিকহ শাস্ত্রের জ্ঞান অর্জনেও মাজহাব অনুসরণের গুরুত্ব অপরিসীম।

ইমাম জাহাবি উল্লেখ করেছেন যে শিক্ষার্থীর উচিত প্রথমে ফিকহের যেকোনো একটি মাজহাবি গ্রন্থ মুখস্থ করা, ব্যাখ্যা পাঠ করা এবং পরবর্তীকালে দলিলের শক্তিমত্তা বিচার করে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা। (আজ–জাহাবি, সিয়ারু আলামিন নুবালা, ৮/৯০–৯১, মুআসসাসাতুর রিসালাহ, বৈরুত, ১৯৮৫)

মাজহাব পরিবর্তনের কারণসমূহ

মুসলিম পণ্ডিতদের এক মাজহাব থেকে অন্য মাজহাবে স্থানান্তরিত হওয়ার পেছনে দুই ধরনের কারণ ছিল। প্রশংসনীয় কারণ ও নিন্দনীয় কারণ।

প্রশংসনীয় কারণগুলো কয়েকটি ধারায় ভাগ করা যায়:

আরও পড়ুন

১. দলিলের শক্তি: গবেষণার পরিধি বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে যখন কোনো ফকিহের কাছে ভিন্ন মাজহাবের দলিল অধিক শক্তিশালী মনে হয়েছে, তখন তিনি মাজহাব পরিবর্তন করেছেন।

ইমাম শাফেয়ি (রহ.) মিসরে গিয়ে নতুন হাদিস ও আলামতের মুখোমুখি হয়ে তাঁর পুরোনো ফিকহি অবস্থান ছেড়ে নতুন অবস্থান গ্রহণ করেন। একইভাবে ইমাম ইবনে দাকিক আল-ইদ (রহ.) মালেকি মাজহাবে বেড়ে উঠলেও পরবর্তীকালে শাফেয়ি মাজহাবে স্থানান্তরিত হন। (আস-সাফাদি, আল-ওয়াফি বিল ওয়াফায়াত, ৪/১৩৮, দারু ইহইয়ায়িত তুরাস, বৈরুত, ২০০০)

২. প্রাতিষ্ঠানিক পরিবেশ: বরেণ্য আলেমদের প্রভাবে অনেক আলেম মাজহাব পরিবর্তন করেছেন। ইমাম সামআনি (রহ.) ত্রিশ বছর হানাফি থেকে পরে শাফেয়ি মনীষী সাাদজানজানির সান্নিধ্যে এসে শাফেয়ি মাজহাব গ্রহণ করেন। (আজ–জাহাবি, সিয়ারু আলামিন নুবালা, ১৪/১৫৫)

আবার ইমাম আত-তাহাবি (রহ.) শাফেয়ি মাজহাবের আলেম আল-মুজানির শিষ্য হওয়া সত্ত্বেও হানাফি ফিকহের পণ্ডিত আহমদ ইবনে আবি ইমরানের সান্নিধ্যে এসে হানাফি মাজহাবে যোগ দেন। (ইবনে ইউনুস আল-মিসরি, তারিখু ইবনি ইউনুস আল-মিসরি, ১/২১, দারুল কুতুব আল-ইলমিয়্যা, বৈরুত, ২০০০)

৩. গবেষণার স্বাধীনতা: ব্যক্তিগত গবেষণার ফলেও কোনো আলেম প্রচলিত মাজহাবি গণ্ডি ছাড়িয়ে স্বাধীন ইজতিহাদের পথ বেছে নিয়েছেন। ইমাম ইবনে হাজম আন্দালুসি (রহ.) প্রথমে মালেকি, পরে শাফেয়ি এবং সর্বশেষে জাহিরি মাজহাব পুর্নগঠন করেন।

আবার ইয়ামেনের ইমাম সানআনি ও শাওকানি জাইদি ধারায় প্রতিপালিত হলেও পরে মাজহাব ছেড়ে স্বাধীন ইজতিহাদের পথ গ্রহণ করেন।

আরও পড়ুন

৪. আঞ্চলিক কারণ: মাজহাব পরিবর্তনে আঞ্চলিক প্রয়োজনের ভূমিকাও ছিল। ফকিহ আহমদ ইবনে ফারিস আল-রাজি প্রথমে শাফেয়ি মাজহাবের অনুসারী থাকলেও পরে রায় শহরে মালেকি মাজহাবের বিলুপ্তি ঠেকাতে মালেকি মাজহাবে স্থানান্তরিত হন। (আল-আনবারি, নুজহাতুল আলিব্বা ফি তাবাকাতিল আদিব্বা, ১/২৩৬, দারুল ফিকর, আম্মান, ১৯৮৫)

সেলজুক আমলে বাগদাদের ‘নিজামিয়া’ ও ‘মুস্তানসিরিয়া’র মতো ঐতিহাসিক মাদ্রাসা ও ওয়াক্‌ফ কেন্দ্রগুলো নির্দিষ্ট মাজহাবের আলেমদের কর্মসংস্থানে ভূমিকা রেখেছিল। ফলে ইবনুল হুবাইর সালামি প্রথমে হানবালি থাকলেও পরে শাফেয়ি মাজহাবে এসে নিজামিয়া মাদ্রাসায় অধ্যাপনার দায়িত্বে নেন। (ইবন কাসির, আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ১৭/২৫৮, দারু হজর, কায়রো, ১৯৯৮)

অপছন্দনীয় কারণ

কিছু নিন্দনীয় কারণেও ইতিহাসে মাজহাব পরিবর্তনের নজির রয়েছে। তার মধ্যে আছে অর্থ, চাকরি বা প্রশাসনিক পদ পাওয়ার উদ্দেশ্যে ধর্মীয় মত পরিবর্তন করা।

ব্যাকরণবিদ ইবনে আল-দাহান হাম্বলি মাজহাবের আলেম হলেও নিজামিয়া মাদ্রাসায় অধ্যাপনার পেতে শাফেয়ি মাজহাব গ্রহণ করে শাফেয়িদের সংরক্ষিত পদে চাকরি যোগ দেন, যা তৎকালে বেশ সমালোচিত হয়েছিল। (ইবনে ইউসুফ আল-কিবতি, ইনবাহুর রুওয়াত আলা আনবাহিন নুহাত, ২/১২০, দারুল ফিকর আল-আরাবি, কায়রো, ১৯৫০)

আবার সত্য খোঁজার পরিবর্তে শুধু নিজের সুবিধামতো সবচেয়ে সহজ বা ছাড় দেওয়া ফতোয়া খুঁজে বের করার উদ্দেশ্যে এক মাজহাব থেকে অন্য মাজহাবে ছোটাছুটির ইতিহাসও পাওয়া।

আরও পড়ুন