মানুষের অঙ্গপ্রত্যঙ্গের মধ্যে জিব অত্যন্ত ক্ষুদ্র একটি অংশ হলেও এর ক্ষমতা অপরিসীম। এটি মানুষের বিবেকের প্রতিনিধি ও অন্তরের দর্পণ হিসেবে কাজ করে। এই ক্ষুদ্র মাংসপিণ্ড যেমন মানুষকে সম্মানের শিখরে পৌঁছে দিতে পারে, তেমনি এর অপব্যবহার একজন ব্যক্তিকে ধ্বংসের অতল গহ্বরে নিক্ষেপ করতে পারে।
আমাদের একটি কথা যেমন কারও মুখে হাসি ফোটাতে পারে বা শান্তি আনতে পারে, তেমনি একটি কটু কথা ধ্বংস করে দিতে পারে বহু বছরের পুরোনো সম্পর্ক।
বিখ্যাত ইসলামি চিন্তাবিদ ও দার্শনিক ইমাম গাজ্জালি (রহ.) তাঁর কালজয়ী গ্রন্থগুলোতে জিবের উপযোগিতা ও এর বিপদ সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন। তিনি মূলত আটটি বিশেষ বিষয় থেকে জিবকে হিফাজত করার পরামর্শ দিয়েছেন, যা বর্তমান যুগে আমাদের সামাজিক ও ব্যক্তিগত জীবনের জন্য অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক।
১. মিথ্যা পরিহার করা
মিথ্যা সব পাপের জননী। জিবের সবচেয়ে বড় অপরাধ হলো মিথ্যা বলা। এটি কেবল গুনাহই নয়, বরং মানুষের বিশ্বাসযোগ্যতা ও আত্মিক প্রশান্তি নষ্ট করে দেয়। ইসলামে মিথ্যাকে অত্যন্ত কঠোরভাবে নিষেধ করা হয়েছে।
আল্লাহর রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘তোমরা মিথ্যা পরিহার করো। কারণ, মিথ্যা পাপাচারের দিকে পরিচালিত করে এবং পাপাচার জাহান্নামে নিয়ে যায়।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২,৬০৭)
২. প্রতিশ্রুতি ভাঙা
অনেকে জিব দিয়ে খুব সহজেই মানুষকে প্রতিশ্রুতি দেন, কিন্তু তা রক্ষা করার গুরুত্ব অনুভব করেন না। মুমিনের একটি বড় বৈশিষ্ট্য হলো কথা দিয়ে কথা রাখা। জিবকে এমন কোনো প্রতিশ্রুতি দেওয়া থেকে বিরত রাখা উচিত, যা পূরণ করার ইচ্ছা বা সামর্থ্য নেই।
কোরআন মাজিদে বলা হয়েছে, ‘হে মুমিনগণ, তোমরা কেন এমন কথা বলো, যা তোমরা করো না?’ (সুরা সাফ, আয়াত: ২)
৩. গিবত বা পরনিন্দা
জিবের সবচেয়ে বিধ্বংসী রোগ হলো গিবত। অন্যের অনুপস্থিতিতে তার এমন কোনো দোষ আলোচনা করা, যা শুনলে সে কষ্ট পাবে, তাকেই গিবত বলে। একে পবিত্র কোরআনে মৃত ভাইয়ের গোশত খাওয়ার সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে। (সুরা হুজুরাত, আয়াত: ১২)
ইমাম গাজ্জালির মতে, যারা গিবতে লিপ্ত হয়, তারা মূলত নিজেদের নেক আমলগুলো অন্যের আমলনামায় পাঠিয়ে দেয়।
৪. ঝগড়া-তর্কে লিপ্ত হওয়া
অপ্রয়োজনীয় বিতর্ক ও তর্কালাপ মানুষের হৃদয়ে কঠোরতা তৈরি করে এবং অন্যের প্রতি বিদ্বেষ জন্মায়। নিজের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণের জন্য অন্যের ভুল ধরা বা জেদ ধরে তর্ক করা জিবের একটি অপব্যবহার।
আল্লাহর রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি সত্যের ওপর থাকা সত্ত্বেও ঝগড়া ত্যাগ করবে, আমি তার জন্য জান্নাতের পাশে একটি ঘরের নিশ্চয়তা দিচ্ছি।’ (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস: ৪৮০০)
৫. আত্মপ্রশংসা ও অহংকার
নিজের ভালো গুণগুলো জাহির করা বা নিজের বড়ত্ব প্রকাশ করা জিবের একটি সূক্ষ্ম বিচ্যুতি। এটি মানুষের ইখলাস বা কাজের একাগ্রতা নষ্ট করে দেয়। মানুষের প্রশংসা পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা অন্তরে অহংকার জন্ম দেয়, যা ইবাদতের মাধুর্য নষ্ট করে ফেলে।
৬. অভিশাপ দেওয়া
মুমিনের জিব কখনো অভিশাপ বা গালিগালাজের জন্য ব্যবহৃত হতে পারে না। কোনো মানুষ, প্রাণী, এমনকি বস্তুকেও অহেতুক অভিশাপ দেওয়া জিবের অপব্যবহার।
রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘মুমিন কখনো অভিশাপকারী হতে পারে না।’ (সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ১,৯৭৭)
৭. বিদ্রূপ ও উপহাস করা
কাউকে ছোট করার জন্য বা হাসির পাত্র বানানোর জন্য ব্যঙ্গবিদ্রূপ করা অত্যন্ত খারাপ কাজ। শারীরিক গঠন, আর্থিক অবস্থা বা বংশ নিয়ে উপহাস করা সামাজিক সম্প্রীতি নষ্ট করে। আল্লাহ-তাআলা স্পষ্টভাবে নির্দেশ দিয়েছেন, এক কওম যেন অন্য কওমকে উপহাস না করে। (সুরা হুজুরাত, আয়াত: ১১)
৮. অশ্লীল ও অসংলগ্ন কথা
অশ্লীল কথা, কটু গালি বা নিরর্থক আড্ডা যেখানে কেবল পাপের আলোচনা হয়, তা থেকে জিবকে মুক্ত রাখা একান্ত জরুরি। জিব যদি ভালো কথা না বলে, তবে তাকে চুপ রাখাই শ্রেষ্ঠ ইবাদত।
জিব নিয়ন্ত্রণের উপায় ও ফল
ইমাম গাজ্জালি (রহ.) মনে করেন, জিব নিয়ন্ত্রণের প্রধান উপায় হলো ‘মৌনতা’ বা প্রয়োজন ছাড়া কথা না বলা। তিনি বলেন, ‘যে চুপ থাকে, সে মুক্তি পায়।’ (সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ২,৫০১)
জিব নিয়ন্ত্রণে রাখার কিছু ব্যবহারিক সুফল হলো—
অন্তরের নুর বৃদ্ধি: অনর্থক কথা না বললে অন্তরে আল্লাহর জিকির ও চিন্তার জায়গা তৈরি হয়।
পাপ থেকে সুরক্ষা: অধিকাংশ গুনাহ জিবের মাধ্যমেই হয়, তাই এটি নিয়ন্ত্রণে রাখলে অর্ধেক পাপ থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব।
ব্যক্তিত্বের গাম্ভীর্য: পরিমিত ও সত্য কথা বলা মানুষের ব্যক্তিত্বকে অন্যদের কাছে গ্রহণযোগ্য ও সম্মানিত করে তোলে।
আমাদের মনে রাখা উচিত, জিব দিয়ে উচ্চারিত প্রতিটি শব্দই ফেরেশতারা লিপিবদ্ধ করছেন। কিয়ামতের দিন আমাদের হাত, পা ও জিব আমাদের কৃতকর্মের সাক্ষ্য দেবে। তাই জিবকে কেবল আল্লাহর জিকির, সত্য প্রচার ও মানুষের উপকারে ব্যবহার করা উচিত।
ইমাম গাজ্জালির এই আটটি নসিহত মেনে চললে আমাদের ব্যক্তিগত ও সামাজিক জীবন অনেক বেশি শান্তিময় ও পবিত্র হয়ে উঠবে।