মানুষ স্বভাবগতভাবেই সৌন্দর্যপ্রিয়। ইসলাম মানবপ্রকৃতির এই সহজাত চাহিদাকে কখনোই অস্বীকার করেনি; বরং বৈধ পন্থায় নিজেকে শালীন, পরিপাটি ও সুন্দর রাখার পূর্ণ অনুমতি দিয়েছে।
সমস্যা সৃষ্টি হয় তখন, যখন নিছক সৌন্দর্য প্রদর্শনের তাড়নায় সেই সীমা অতিক্রম করে মানুষের আল্লাহপ্রদত্ত স্বাভাবিক শারীরিক গঠনকে কৃত্রিম ও স্থায়ীভাবে পরিবর্তন করা হয়।
বর্তমানে চিকিৎসাবিজ্ঞানের উৎকর্ষের সঙ্গে সঙ্গে প্লাস্টিক সার্জারি, কসমেটিক সার্জারি ও বিভিন্ন স্থায়ী বায়োমেডিক্যাল প্রক্রিয়ার প্রচলন বহুগুণ বেড়েছে।
নাকের আকৃতি পরিবর্তন (রাইনোপ্লাস্টি), মুখের চোয়ালের গড়ন বদলানো, কৃত্রিমভাবে ঠোঁট স্ফীত করা কিংবা ক্ষতিকর রাসায়নিকের সাহায্যে ত্বকের স্বাভাবিক গায়ের রং বদলে ফেলার নানা পদ্ধতিকে সৌন্দর্যের আধুনিক উপায় হিসেবে গ্রহণ করা হচ্ছে।
এসব ক্ষেত্রে কোনটি ইসলামসম্মত ত্রুটি সংশোধন আর কোনটি নিষিদ্ধ কৃত্রিম বিকৃতি—তার সুস্পষ্ট সীমারেখা জানা জরুরি।
নিজেকে সুন্দর ও পরিচ্ছন্ন রাখার স্বাভাবিক আকাঙ্ক্ষা ইসলামে মোটেও নিন্দনীয় নয়। কিন্তু সেই সৌন্দর্য অর্জনের জন্য বান্দা কী পদ্ধতি অবলম্বন করছে—সেটিই হলো ইসলামের মূল বিবেচ্য বিষয়।
সৌন্দর্যচর্চায় ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গি
ইসলাম মানুষকে কখনোই বৈরাগ্য কিংবা সৌন্দর্যবিমুখ হওয়ার শিক্ষা দেয় না। সুন্দর ও মার্জিত পোশাক পরিধান করা, চুলে তেল দেওয়া ও পরিপাটি রাখা, সুগন্ধি ব্যবহার করা এবং নিজেকে উপস্থাপনযোগ্য রাখা সুন্নাহ দ্বারা প্রমাণিত।
একবার এক সাহাবি নবীজির কাছে আরজ করলেন, ‘মানুষ তো চায় তার পোশাক সুন্দর হোক, তার জুতো জোড়া পরিপাটি হোক (এটাও কি অহংকার?)’ তখন নবীজি বললেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ সুন্দর, তিনি সৌন্দর্যকেই ভালোবাসেন। প্রকৃতপক্ষে অহংকার হলো সত্যকে অস্বীকার করা এবং মানুষকে অবজ্ঞা বা তুচ্ছজ্ঞান করা।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ৯১)
অতএব, নিজেকে সুন্দর ও পরিচ্ছন্ন রাখার স্বাভাবিক আকাঙ্ক্ষা ইসলামে মোটেও নিন্দনীয় নয়। কিন্তু সেই সৌন্দর্য অর্জনের জন্য বান্দা কী পদ্ধতি অবলম্বন করছে—সেটিই হলো ইসলামের মূল বিবেচ্য বিষয়।
সাময়িক সাজসজ্জা নাকি স্থায়ী রূপবদল
রূপচর্চার ক্ষেত্রে ইসলামে একটি মৌলিক পার্থক্য রয়েছে: সাময়িক প্রসাধনী ব্যবহার এবং শরীরের স্থায়ী রূপবদল সম্পূর্ণ ভিন্ন বিধানভুক্ত।
ত্বকের সতেজতা বা উজ্জ্বলতার জন্য সাধারণ প্রাকৃতিক উপাদান, ক্রিম, লোশন কিংবা নারীদের ক্ষেত্রে মেকআপ ব্যবহার সাময়িক সাজসজ্জার অন্তর্ভুক্ত। এতে মূল অঙ্গের গঠনে কোনো পরিবর্তন আসে না; পানি দিয়ে ধুয়ে ফেললে বা নির্দিষ্ট সময় পর শরীর আবার পূর্বের অবস্থায় ফিরে যায়।
কোনো ক্ষতিকর বা অপবিত্র উপাদানের মিশ্রণ না থাকলে এ ধরনের বাহ্যিক ও সাময়িক রূপচর্চা সম্পূর্ণ জায়েজ।
কিন্তু যখন কোনো চিকিৎসাগত প্রয়োজনীয়তা বা শারীরিক অস্বাভাবিকতা থাকে না, শুধু ‘সৌন্দর্য বাড়ানো’ কিংবা ফ্যাশনের তাড়নায় শল্যচিকিৎসা (সার্জারি) বা স্থায়ী ইনজেকশন ও লেজার পদ্ধতির মাধ্যমে স্বাভাবিক গঠনকে বদলে ফেলা হয়—তখন তা শরিয়তের নির্ধারিত সীমানা অতিক্রম করে যায়। (ইমাম কুরতুবি, আল-জামি লি-আহকামিল কুরআন, ৭/১৪৪, মুআসসাসাতুর রিসালাহ, বৈরুত, ২০০৬)
চিকিৎসাগত প্রয়োজন, দুর্ঘটনাজনিত বিকৃতি বা জন্মগত শারীরিক ত্রুটি সংশোধনের উদ্দেশ্যে অস্ত্রোপচার করা নিষিদ্ধ রূপান্তরের অন্তর্ভুক্ত নয়; বরং তা চিকিৎসার অংশ হিসেবে জায়েজ। কিন্তু সুস্থ ও স্বাভাবিক কোনো অঙ্গের আকৃতি কেবল কৃত্রিম রূপ বাড়ানো বা পশ্চিমা ফ্যাশন অনুসরণের জন্য অপারেশন করে বদলে ফেলা সম্পূর্ণ নাজায়েজ ও হারাম।সমকালীন ফকিহ মুফতি মুহাম্মদ তাকি ওসমানি
শয়তানের ফাঁদ
কোরআনে শয়তানের কুপ্রভাব ও প্রতিশ্রুতির কথা উল্লেখ করে আল্লাহ বলেছেন, ‘(শয়তান বলল) আমি অবশ্যই তাদের বিপথগামী করব, তাদের হৃদয়ে মিথ্যা বাসনার সৃষ্টি করব... এবং আমি তাদের নিশ্চিত নির্দেশ দেব, ফলে তারা আল্লাহর সৃষ্টিকে বিকৃত ও পরিবর্তন করবে!’ (সুরা নিসা, আয়াত: ১১৯)
তাফসির শাস্ত্রের ইমামরা স্পষ্ট করেছেন যে নিছক সামাজিক আভিজাত্য বা অতিরিক্ত সৌন্দর্যের মোহে শরীরের স্বাভাবিক অঙ্গ-প্রত্যঙ্গে স্থায়ী পরিবর্তন আনা মূলত শয়তানের এই চক্রান্তেরই রূপায়ণ। (আবদুর রহমান ইবনে নাসির আস-সাদি, তাইসিরুল কারিমির রহমান ফি তাফসিরি কালামিল মান্নান, পৃষ্ঠা: ২২১, দারুস সালাম, রিয়াদ, ২০০২)
হাদিসে নবীজি বলেন, “আল্লাহর অভিশাপ সেই নারীদের ওপর, যারা উলকি আঁকে ও আঁকায়; যারা ভ্রু উপড়ে ফেলে এবং যারা সৌন্দর্য বৃদ্ধির উদ্দেশ্যে ঘষে ঘষে দাঁতের মাঝে কৃত্রিম ফাঁক সৃষ্টি করে আল্লাহর সৃষ্টিতে পরিবর্তন আনে।” (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৪৮৮৬)
হাদিসের মূল শব্দ হলো ‘আল-মুতাফাল্লিজাতি লিল-হুসন’ (সৌন্দর্যের জন্য দাঁত বিকৃত করা)। অর্থাৎ, শারীরিক সুস্থতা থাকা সত্ত্বেও শুধু অতিরিক্ত সৌন্দর্য ও কৃত্রিম যৌবন প্রদর্শনের উদ্দেশ্যে স্বাভাবিক সৃষ্টিতে পরিবর্তন আনাই হলো এই অভিশাপের মূল কারণ।
একটি সূক্ষ্ম ফিকহি পার্থক্য
ইসলামি আইনশাস্ত্রে ‘ইযালাতুল আইব’ (শারীরিক ত্রুটি বা কষ্ট দূর করা) এবং ‘তালিবুল হুসন’ (অতিরিক্ত সৌন্দর্যের পেছনে ছোটা)—এই দুইয়ের বিধান সম্পূর্ণ বিপরীত।
যদি কোনো ব্যক্তির শরীরে জন্মগত কোনো স্পষ্ট অস্বাভাবিকতা বা বিকৃতি থাকে (যেমন: ঠোঁট কাটা বা অতিরিক্ত ত্রুটিপূর্ণ অঙ্গ), কিংবা কোনো দুর্ঘটনা, অগ্নিকাণ্ড, এসিড সন্ত্রাস বা রোগের কারণে শরীরের কোনো অঙ্গ ক্ষতিগ্রস্ত বা বিকৃত হয়ে যায়—তবে তা স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে আনার জন্য রিকনস্ট্রাকটিভ বা প্লাস্টিক সার্জারি করা সম্পূর্ণ বৈধ।
এটি নিষিদ্ধ অঙ্গবিকৃতির আওতায় পড়ে না; বরং এটি হলো চিকিৎসার মাধ্যমে স্বাভাবিক অবস্থা পুনরুদ্ধারের বৈধ প্রচেষ্টা।
এর প্রমাণ হলো সাহাবি আরফাজাহ ইবনে আসআদের ঘটনা। জাহেলি যুগে কুলাবের যুদ্ধে তাঁর নাক কাটা গিয়েছিল। এরপর তিনি রুপা দিয়ে একটি কৃত্রিম নাক বানিয়ে পরেন। কিন্তু কিছুদিন পর সেই রুপার নাকে দুর্গন্ধ সৃষ্টি হলে নবীজি (সা.) স্বয়ং তাঁকে সোনার নাক বানিয়ে ব্যবহার করার অনুমতি দিয়েছিলেন। (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস: ৪২৩২)
সমকালীন ফকিহ মুফতি মুহাম্মদ তাকি ওসমানি এ বিষয়ে ইসলামের মূলনীতি সুস্পষ্ট করে লিখেছেন, ‘চিকিৎসাগত প্রয়োজন, দুর্ঘটনাজনিত বিকৃতি বা জন্মগত শারীরিক ত্রুটি সংশোধনের উদ্দেশ্যে অস্ত্রোপচার করা নিষিদ্ধ রূপান্তরের অন্তর্ভুক্ত নয়; বরং তা চিকিৎসার অংশ হিসেবে জায়েজ। কিন্তু সুস্থ ও স্বাভাবিক কোনো অঙ্গের আকৃতি কেবল কৃত্রিম রূপ বাড়ানো বা পশ্চিমা ফ্যাশন অনুসরণের জন্য অপারেশন করে বদলে ফেলা সম্পূর্ণ নাজায়েজ ও হারাম।’ (ওসমানি, তাকমিলাতু ফাতহিল মুলহিম বি-শারহি সহিহিল ইমাম মুসলিম, ৪/১৬৯, দারু ইহইয়াইত তুরাসিল আরাবি, বৈরুত, ২০০৬)
কোনো মানুষের জন্মগত গায়ের রঙ কোনো ‘ত্রুটি’ নয় যে তা সংশোধন করতে হবে। আল্লাহ মানুষকে সাদা, কালো, শ্যামলা নানা বৈচিত্র্যে সৃষ্টি করেছেন তাঁর একত্বের নিদর্শন হিসেবে।
গায়ের রঙ বদলানো
একই বিধান সৌন্দর্যচর্চার জন্য গায়ের স্বাভাবিক রঙ কৃত্রিমভাবে ফর্সা করার বিষয়ে। আধুনিককালে মেলানিন কমানোর বিপজ্জনক ইনজেকশন, কেমিক্যাল পিলিং কিংবা ক্ষতিকর পারদযুক্ত ক্রিম ব্যবহার করে ত্বক ফর্সা করার এক উন্মাদনা তৈরি হয়েছে।
কোনো মানুষের জন্মগত গায়ের রঙ কোনো ‘ত্রুটি’ নয় যে তা সংশোধন করতে হবে। আল্লাহ মানুষকে সাদা, কালো, শ্যামলা নানা বৈচিত্র্যে সৃষ্টি করেছেন তাঁর একত্বের নিদর্শন হিসেবে। (সুরা রুম, আয়াত: ২২)
কৃত্রিম উপায়ে গায়ের রং বদলানোর এই হীনম্মন্যতা মূলত সমাজের তৈরি বর্ণবাদী মানসিকতা ও কৃত্রিম অহংকারের ফল।
ইসলাম মানুষের মর্যাদা ও সৌন্দর্যের এই ভিত্তিহীন মাপকাঠিকে গুঁড়িয়ে দিয়ে দ্ব্যর্থহীন ভাষায় ঘোষণা করেছে, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহর কাছে তোমাদের মধ্যে সর্বাধিক মর্যাদাবান সেই ব্যক্তি, যে তোমাদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি তাকওয়াবান (খোদাভীরু)।’ (সুরা হুজুরাত, আয়াত: ১৩)
ফয়জুল্লাহ রিয়াদ: মুহাদ্দিস, জামিয়া আরাবিয়া দারুস সুন্নাহ রাজাবাড়ী, ঢাকা