আরবি বর্ষপঞ্জিকার দশম মাস শাওয়াল। এই মাস ইবাদতের এক নতুন মৌসুমের সূচনা করে। পবিত্র রমজানের রহমত ও মাগফিরাতের পর এই মাসটি মুমিন হৃদয়ে আল্লাহর ঘরের মেহমান হওয়ার আকুলতা জাগিয়ে তোলে।
আল্লাহর নির্দেশে পবিত্র বায়তুল্লাহর নির্মাণকাজ সমাপ্ত হওয়ার পর হজরত ইব্রাহিম (আ.) মানবজাতিকে হজের যে আহ্বান জানিয়েছিলেন, বছর ঘুরে শাওয়াল এলে যেন নতুনভাবে ইব্রাহিমি সেই বারতা নতুন করে পৃথিবীজুড়ে ধ্বনিত হয়।
হজরত ইব্রাহিম (আ.)-এর সেই ঘোষণার ধ্বনি আজও প্রতিটি মুমিনের হৃদয়ে প্রতিধ্বনিত হয়। বায়তুল্লাহর নির্মাণকাজ সম্পন্ন হওয়ার পর মহান আল্লাহ তাঁকে নির্দেশ দিয়েছিলেন মানুষের মাঝে হজের ঘোষণা পৌঁছে দিতে।
সেই আহ্বানে সাড়া দিয়ে হাজার হাজার বছর ধরে বিশ্বজুড়ে আল্লাহবিশ্বাসীরা পরম মমতায় ছুটে যান পবিত্র মক্কার পানে। হজকে কেন্দ্র করে প্রতি বছর পবিত্র বায়তুল্লাহ প্রাঙ্গণে রচিত হয় বিশ্ব মুসলিমের এক মহাসম্মেলন।
বর্ণ, গোত্র ও আভিজাত্যের ভেদাভেদ ভুলে লক্ষ লক্ষ ধর্মপ্রাণ মুসলিম একই পোশাকে ও একই সুরে মিনা, আরাফা এবং মুজদালিফার পবিত্র প্রান্তরকে মুখরিত করে তোলেন। এই মহাসমুদ্রে বিলীন হয়ে মুমিনরা খুঁজে পান তাঁদের আধ্যাত্মিক প্রশান্তি ও ভ্রাতৃত্বের এক অনন্য মহিমা।
আর তোমরা পাথেয় সংগ্রহ করো। নিশ্চয় সবচেয়ে উত্তম পাথেয় হচ্ছে তাকওয়া। হে বোধসম্পন্ন ব্যক্তিগণ! তোমরা আমারই তাকওয়া অবলম্বন করো।
শাওয়াল মাস থেকেই হজের আনুষ্ঠানিক মানসিক শারীরিক ও আর্থিক প্রস্তুতি শুরু হয়। কারণ, এই মাস হজের তিনটি মাসের (শাওয়াল, জিলকদ ও জিলহজ) প্রথম মাস। তাই ইসলামের এই গুরুত্বপূর্ণ ফরজ ইবাদত পালনে সক্ষম ব্যক্তিদের জন্য দেরি না করে এখন থেকেই প্রস্তুতি গ্রহণ করা জরুরি।
শাওয়াল মাস শুরু হওয়ার অর্থ হলো হজের পবিত্র সফরের সময় গণনা শুরু হওয়া। আর হজ হচ্ছে ইসলামের পঞ্চস্তম্ভ বা প্রধান পাঁচ ফরজের একটি।
পবিত্র কোরআনে হজকে ফরজ ঘোষণা করে আল্লাহ-তাআলা বলেন, ‘নিশ্চয় প্রথম ঘর, যা মানুষের (ইবাদতের) জন্য সর্বপ্রথম যে ঘর তৈরি করা হয়, তা মক্কায় অবস্থিত, যা বরকতময় এবং সমগ্র জগতের মানুষের জন্য হিদায়াত। তাতে রয়েছে স্পষ্ট নির্দশনসমূহ, মাকামে ইবরাহিম। আর যে তাতে প্রবেশ করবে, সে নিরাপদ হয়ে যাবে। মানুষের মধ্যে যারা সেখানে পৌঁছার সামর্থ্য রাখে, তাদের ওপর আল্লাহর জন্য এ ঘরের হজ করা ফরজ। আর যে কুফরি করে, তবে আল্লাহ তো নিশ্চয় সৃষ্টিকুল থেকে অমুখাপেক্ষী।’ (সুরা আলে ইমরান: ৯৬, ৯৭)
এই আয়াত দ্বারা বোঝা যায়, সামর্থ্যবান প্রত্যেক মুসলিমের ওপর জীবনে একবার হলেও বায়তুল্লাহর হজ করা ফরজ। তাছাড়া উপর্যুক্ত আয়াতে বায়তুল্লাহকে বিশ্ববাসীর জন্য বরকত ও হেদায়েতের কেন্দ্র এবং নিরাপদ আশ্রয়স্থল হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে।
তাই যারা সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও হজের ফরজ এই বিধান অস্বীকার বা অবজ্ঞা করে, তাদের সতর্ক করে বলা হয়েছে যে, আল্লাহ কারও মুখাপেক্ষী নন।
শাওয়াল মাসকে হজের প্রথম মাস এজন্য বলা হয় যে, এই মাসের আগে হজের ইহরাম বাঁধা যায় না, তবে শওয়ালের শুরু থেকেই হজের নিয়তে ইহরাম বাঁধা যায়।
কোরআনে আল্লাহ-তাআলা বলেন, ‘হজের মাসগুলো সুবিদিত। তারপর এ মাসগুলোতে যে কেউ হজ করার মনস্থ করবে, তার জন্য হজের সময় স্ত্রীসম্ভোগ, অন্যায় আচরণ ও ঝগড়া-বিবাদ বৈধ নয়। আর তোমরা উত্তম কাজ থেকে যা-ই করো, আল্লাহ তা জানেন। আর তোমরা পাথেয় সংগ্রহ করো। নিশ্চয় সবচেয়ে উত্তম পাথেয় হচ্ছে তাকওয়া। হে বোধসম্পন্ন ব্যক্তিগণ! তোমরা আমারই তাকওয়া অবলম্বন করো।’ (সুরা বাকারা: ১৯৭)
ইতিহাসের পাতায় দেখা যায় যে নবীজি (সা.) দশম হিজরির শাওয়াল মাসেই বিদায় হজের প্রস্তুতি নিয়েছিলেন এবং পরবর্তী মাসে সাহাবিদের নিয়ে মক্কার দিকে রওনা হয়েছিলেন।
মুফাসসিরগণের ঐকমত্য অনুযায়ী, এই মাসগুলো হলো শাওয়াল, জিলকদ এবং জিলহজের প্রথম ১০ দিন। ফলে শাওয়াল মাস থেকেই মুমিন হৃদয়ে হজের আকাঙ্ক্ষা ও প্রস্তুতি জাগ্রত হয়।
হজের সফরে বের হওয়ার আগে যাওয়া-আসার খরচসহ সফরকালীন সময়ে পরিবারের লোকদের স্বাভাবিক খরচের ব্যবস্থা থাকলে এবং দৈহিকভাবে সক্ষমতা থাকলে হজের সামর্থ্য প্রমাণিত হয় ও হজ ফরজ হয়।
কারও যদি কাবায় পৌঁছার সামর্থ্য থাকে কিন্তু তার হজের সফরের সময় পরিবার-পরিজনের দেখাশোনা ও ভরণ-পোষণের ব্যবস্থা না থাকে, তার ওপর হজ ফরজ হবে না। একইভাবে কারও যদি হাত, পা, চোখ ইত্যাদি অঙ্গের কোনোটি বিকল হয় বা কেউ যদি একা চলাফেরা কতে সক্ষম না হয়, তার ওপরও হজ ফরজ হবে না।
নারীদের ওপর হজ ফরজ হওয়ার জন্য হজের সফরে তার সাথে যাওয়ার মতো মাহরাম ব্যক্তি থাকা জরুরি। মাহরাম না থাকলে সম্পদশালী নারীর জন্য নিজে গিয়ে হজ করার আবশ্যকতা থাকে না।
কোনো নারীর কাছে যদি শুধু নিজের হজে যাওয়ার মতো সম্পদ থাকে, কোনো মাহরামকে নিয়ে যাওয়ার মতো সম্পদ বা সুযোগ না থাকে, তাহলে তার ওপরও হজ ফরজ নয়।
কোরআনে আল্লাহ-তাআলা সামর্থ্যবান মানুষের ওপর আল্লাহর জন্য বায়তুল্লাহর হজ করাকে ফরজ ঘোষণা করেছেন। আর হাদিসেও সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও হজ আদায়ে অবহেলাকারীদের কঠোর পরিণাম সম্পর্কে সতর্ক করা হয়েছে।
মহানবী (সা.) বলেছেন, ‘যাকে কোনো অপরিহার্য প্রয়োজন, অচলকারী অসুস্থতা কিংবা অত্যাচারী শাসকের বাধা হজ আদায়ে অপারগ করেনি, তবু সে হজ করল না, সে ইচ্ছা হলে ইহুদি হয়ে মৃত্যুবরণ করুক, ইচ্ছা হলে নাসরানি হয়ে।’ (সুনানে দারেমি, হাদিস: ১৮২৬; মিশকাতুল মাসাবিহ, হাদিস: ২৫২২)
শাওয়াল মাস মূলত রমজানের রেশ ধরে রেখে সারা বছর আল্লাহর অনুগত থাকার মাস। এটি পরবর্তী ফরজ ইবাদত হজের প্রস্তুতির সময় হওয়ায় এর গুরুত্ব অপরিসীম।
ইতিহাসের পাতায় দেখা যায় যে নবীজি (সা.) দশম হিজরির শাওয়াল মাসেই বিদায় হজের প্রস্তুতি নিয়েছিলেন এবং পরবর্তী মাসে সাহাবিদের নিয়ে মক্কার দিকে রওনা হয়েছিলেন।
যারা হজে যাওয়ার নিয়ত করেছেন, তাদের জন্য এই মাস থেকেই হজের মাসয়ালা-মাসায়েল ও আদব সম্পর্কে জানা এবং তাওবা-ইস্তেগফারের মাধ্যমে পবিত্রতা অর্জন করে আল্লাহর ঘরের জিয়ারতে যাওয়ার প্রস্তুতি নেওয়া জরুরি।