প্রথম দেখায় পবিত্র কাবা

ছবি: পেক্সেলস

কাবা শরিফ প্রথম দেখার অনুভূতি কেমন—তা বুঝতে হলে নিজেকে একজন শিশু হিসেবে কল্পনা করুন। যে শিশুটি মধ্যবিত্ত পরিবারে বড় হয়েছে এবং হঠাৎ একদিন ঘুম থেকে উঠে দেখল তার ঘর বাহারি খেলনায় ঠাসা।

আমার অবস্থাও ঠিক তেমনই হলো—বাকরুদ্ধ, অনুভূতিহীন। মাথার ভেতরটা যেন ফাঁকা হয়ে গেল। শুধু মনে হলো, ‘আমি পাইলাম, আমি তাহাকে পাইলাম।’

ভেতরের আবেগ চেপে আমি ও আমার স্ত্রী তাওয়াফ শুরু করলাম। তাওয়াফ শুরু করতে হয় কাবাঘরের হাজরে আসওয়াদ (কালো পাথর) সংলগ্ন কোণ থেকে।

কাবাঘরকে সাতবার প্রদক্ষিণ করে আবার এখানে এসেই শেষ করতে হয়। আমাদের সফরসঙ্গী ফয়জুল্লাহ ভাই এর আগে কয়েকবার ওমরাহ করেছেন, তিনি আমাদের নিয়মগুলো বুঝিয়ে দিচ্ছিলেন।

আমরা তাওয়াফ করছি। হাজিদের খুব বেশি ভিড় নেই। সবার পায়ের সঙ্গে পা মিলিয়ে ঐকতানে চক্রাকারে ঘুরছি। কেউ কেউ উচ্চস্বরে বা মনে মনে দোয়া পড়ছেন। মালয়েশীয় বা ইন্দোনেশীয়রা দল বেঁধে আসে, তাদের একজন আগে আগে দোয়া বলে দিচ্ছেন আর বাকিরা সমবেত কণ্ঠে তার পুনরাবৃত্তি করছেন।

কারও সঙ্গে আমার পরিচয় নেই, অথচ মনে হচ্ছে এদের আমি জন্মান্তর ধরে চিনি। তুর্কি, চেচেন, তাজিক, আফ্রিকান আর আরবদের অভিন্ন পরিচয়—তারা মুসলিম।
আরও পড়ুন

যদিও তাওয়াফের সময় নির্দিষ্ট কোনো দোয়া নেই, আরবিতেই দোয়া করতে হবে এমন কোনো বাধ্যবাধকতাও নেই। আমি কখনো আরবিতে, কখনো বাংলায় নিজের মনের একান্ত আকুতিগুলো বলতে লাগলাম। লৌকিকতার মিথ্যে অভিমানে যেসব কথা বুকের গহিনে চাপা পড়ে ছিল, আজ সেসবের অর্গল খুলে দেওয়ার দিন।

তাওয়াফ করতে করতে আমি বারবার কালো গিলাফে ঢাকা পাথুরে কাবার দিকে তাকাচ্ছিলাম। নিজেকে বলছিলাম, ‘কী সৌভাগ্য আমার! হে আল্লাহ, আমার মতো নগণ্য এক মানুষকে তুমি তোমার ঘরে নিয়ে এলে!’

কাবার এক অমোঘ আকর্ষণ আছে, যা মানুষকে মোহগ্রস্ত করে রাখে। তাওয়াফের সময় আরেকটি জিনিস আমাকে অভিভূত করল—বিশাল এই জনসমুদ্র। কত দেশ, কত বর্ণ ও ভাষার মানুষ এখানে একত্রিত হয়েছে।

কারও সঙ্গে আমার পরিচয় নেই, অথচ মনে হচ্ছে এদের আমি জন্মান্তর ধরে চিনি। তুর্কি, চেচেন, তাজিক, আফ্রিকান আর আরবদের অভিন্ন পরিচয়—তারা মুসলিম। এক আল্লাহর মহিমাতলে সবাই এখানে নতজানু।

আরও পড়ুন
ফেরার সময় মসজিদে হারামের বর্ধিত অংশের নিচতলায় দেখলাম ছোট ছোট ইলমি মজলিস। শাইখদের সামনে কিতাব হাতে প্রবীণ শিক্ষার্থীরা মনোযোগ দিয়ে পাঠ শুনছেন।

তাওয়াফ শেষে মাকামে ইব্রাহিমের পেছনে দুই রাকাত নামাজ পড়ে নিলাম। এরপর সাঈ করার পালা। ফয়জুল্লাহ ভাই আমাদের সাফা-মারওয়া প্রান্তে নিয়ে গেলেন। সাফা ও মারওয়া পাহাড়ের মাঝে সাতবার আসা-যাওয়া করতে হয়, যার মোট দূরত্ব প্রায় সাড়ে তিন কিলোমিটার।

সাঈ করার সময় নির্দিষ্ট একটি স্থানে সবুজ আলো দিয়ে চিহ্নিত করা আছে, যেখানে পুরুষদের কিছুটা দ্রুত হাঁটতে হয়।

ফেরার সময় মসজিদে হারামের বর্ধিত অংশের নিচতলায় দেখলাম ছোট ছোট ইলমি মজলিস। শাইখদের সামনে কিতাব হাতে প্রবীণ শিক্ষার্থীরা মনোযোগ দিয়ে পাঠ শুনছেন। দেখে ভালো লাগল। মসজিদ ইবাদতের পাশাপাশি জ্ঞানচর্চা ও সামাজিক সম্মিলনের কেন্দ্রবিন্দুও বটে।

মসজিদে হারাম থেকে বের হয়ে দক্ষিণের বিস্তৃত চত্বরে এলে সত্যিকারের মুসলিম উম্মাহর দেখা পাওয়া যায়। ভাষা ও দেশ আলাদা হলেও সবার হৃদয়ের ভাষা এক। এখানে এসে নিজেকে কখনো মুসাফির মনে হয় না। মনে হয়, এ কাবা তো আমারই। এই মসজিদে হারাম, মসজিদে নববি—এসবই আমাদের উত্তরাধিকার। এখানে আমাদের শেকড় প্রোথিত, তাই এখানে আমরা কেউ ভিনদেশি নই।

  • সালাহউদ্দীন জাহাঙ্গীর: কবি ও গ্রন্থপ্রণেতা

আরও পড়ুন