সুরাকা ইবনে মালিকের ঐতিহাসিক সফর

ছবি: এএফপি

মক্কার কোরাইশরা ঘোষণা করেছে, মুহাম্মদ ও তাঁর সঙ্গী আবু বকরকে যে জীবিত অথবা মৃত ফিরিয়ে আনতে পারবে, তাকে ১০০টি লাল উট দেওয়া হবে। তৎকালীন আরবে এই পুরস্কারের মান ছিল আজকের দিনের কোটি টাকার সমান।

লোভে অন্ধ হয়ে বহু যুবক মরুভূমির বুক চষে বেড়াচ্ছিল। এদের মধ্যে অন্যতম কৌতূহলোদ্দীপক চরিত্র ছিলেন সুরাকা ইবনে মালিক ইবনে জুশুম আল-মুদলিজি। যিনি ছিলেন পদচিহ্ন দেখে নিখুঁতভাবে পথ অনুসরণে দক্ষ।

এক দিকে কোরাইশদের দেওয়া ১০০ উটের প্রলোভন, অন্যদিকে মরুভূমিতে অলৌকিক এক অভিজ্ঞতার মুখে মুখোমুখি হয়ে তাঁর হৃদয় বদলে যাওয়া—হিজরতের ইতিহাসে এ এক চিরন্তন শিক্ষণীয় অধ্যায়।

জাগতিক ভয় ও আল্লাহর নিরাপত্তা

সুরাকা যখন শুনতে পেলেন যে মরুভূমির অচেনা রাস্তায় দুজনকে হেঁটে যেতে দেখা গেছে, তখন তিনি কৌশল করে নিজের গোত্রকে এড়িয়ে নিঃশব্দে উটের পিঠে সাওয়ার হয়ে সেই পথে যাত্রা করলেন। উদ্দেশ্য একটাই—একাই যেন বিশাল পুরস্কারটি বগলদাবি করা যায়।

সুরাকা যখন ত্বরিত গতিতে অশ্ব ছুটিচ্ছিলেন, একপর্যায়ে তিনি দূর থেকে নবীজি ও তাঁর সঙ্গীকে স্পষ্ট দেখতে পেলেন।

পেছনে দ্রুত ধেয়ে আসা ঘোড়ার খুরের আওয়াজ শুনে আবু বকর (রা.) ব্যাকুল হয়ে উঠেছিলেন। তিনি বললেন, “হে আল্লাহর রাসুল, দুশমন তো আমাদের ধরে ফেলল!” মহানবী (সা.) প্রগাঢ় আত্মবিশ্বাস ও শান্ত গলায় বললেন, “চিন্তা কোরো না, নিশ্চয়ই আল্লাহ আমাদের সাথে আছেন” (সুরা তওবা, আয়াত: ৪০)। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৩৬৫৩)

যখন সুরাকা একেবারে কাছাকাছি চলে এলেন এবং তীর নিক্ষেপের মতো দূরত্বে পৌঁছালেন, তখন মহানবী মোনাজাতের হাত তুললেন। দোয়া করলেন, “আল্লাহুম্মাকফিনিহিম বিমা শি’ত” (আল্লাহ, আপনি যেভাবে ইচ্ছা তাদের হাত থেকে আমাকে রক্ষা করুন)। (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ৩০০৫)

সুরাকা স্তম্ভিত হয়ে গিয়েছিলেন। তৎকালীন বিশ্বের অন্যতম প্রধান পরাশক্তি ছিল পারস্য সাম্রাজ্য, যার সম্রাট ছিলেন ‘কিসরা আনুশিরওয়ান’। এক নিরাশ্রিত আরব পথিক দাবি করছেন যে পারস্যের সেই বিশাল সম্রাটের সোনার বালা একদিন এই মরুভূমির বেদুইনের হাতে উঠবে!
আরও পড়ুন

ঠিক সেই মুহূর্তে ঘটে গেল এক অলৌকিক ঘটনা। সুরাকার ঘোড়ার চারটি পা মরুভূমির শক্ত-পাথুরে জমিনে দেবে গেল। তিনি সশব্দে মাটিতে আছড়ে পড়লেন। ঘোড়াকে টেনে তোলার আপ্রাণ চেষ্টা করলেন, কিন্তু প্রতিবারই ব্যর্থ হলেন।

তারপর ঘোড়ার পা যখন শক্ত জমিন থেকে উঠে আসছিল, তখন সেখান থেকে ধোঁয়ার মতো ধূলিঝড় আকাশে উড়ছিল। সুরাকা বুঝতে পারলেন, এই পথিকের পেছনে এমন এক ঐশ্বরিক শক্তি রয়েছে, যাকে কোনো পার্থিব অস্ত্র বা শক্তি দিয়ে পরাস্ত করা সম্ভব নয়। (ইবনে কাসির, আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ৩/২৪৫, দারুল ফিকর, বৈরুত, ১৯৮৮)

সুরাকাকে নবীজির সুসংবাদ

অবশেষে সুরাকা চিৎকার করে উঠলেন, “হে মুহাম্মদ, আপনার প্রতিপালকের কাছে দোয়া করুন যেন আমি এই সংকট থেকে মুক্তি পাই। আমি শপথ করে বলছি, আর আপনাদের কোনো ক্ষতি করব না এবং পেছনের ধাওয়াকারীদের ফিরিয়ে দেব।”

মহানবী (সা.) দোয়া করলেন এবং সুরাকার ঘোড়া মুক্ত হয়ে গেল। এমনকি তিনি তাঁকে ভবিষ্যত জীবনের সুসংবাদ শুনিয়ে বললেন, “সুরাকা, কেমন লাগবে তোমার, যখন তোমার হাতে পারস্য সম্রাট কিসরার স্বর্ণবালা পরিয়ে দেওয়া হবে?” (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৩ ৯০৬)

সুরাকা স্তম্ভিত হয়ে গিয়েছিলেন। তৎকালীন বিশ্বের অন্যতম প্রধান পরাশক্তি ছিল পারস্য সাম্রাজ্য, যার সম্রাট ছিলেন ‘কিসরা আনুশিরওয়ান’। এক নিরাশ্রিত আরব পথিক দাবি করছেন যে পারস্যের সেই বিশাল সম্রাটের সোনার বালা একদিন এই মরুভূমির বেদুইনের হাতে উঠবে!

বিস্ময়ে হতবাক সুরাকা বললেন, “আপনি কি পারস্য সম্রাট কিসরা ইবনে হরমুজের স্বর্ণবালার কথা বলছেন?” নবীজি হাসিমুখে জবাব দিলেন, “হ্যাঁ, সেই কিসরারই!” (আতিয়া ইবনে মুহাম্মদ সালিম, দুরুসুল হিজরাহ, ১/৪২, মাকতাবাতুস সাহাবাহ, মদিনা, ১৯৯৯)

আরও পড়ুন

সুরাকা নবীজির কাছে নিরাপত্তার লিখিত চুক্তিপত্র চাইলেন। নবীজির নির্দেশে আবু বকর (রা.) চামড়ার একটি টুকরায় তা লিখে দিলেন। সুরাকা ফিরে গেলেন এবং মক্কামুখী পথজুড়ে যত সন্ধানী দল ছিল, সবাইকে এ কথা বলে ফিরিয়ে দিলেন যে—‘আমি এদিকের সব এলাকা খুঁজে দেখেছি, সেখানে কেউ নেই!’

যে লোক সকালে এসেছিলেন শত্রুর ভূমিকায়, সন্ধ্যায় তিনিই হয়ে উঠলেন নবীজির গোপন রক্ষক।

খলিফা ওমর (রা.) তাকে সামনে ডেকে আনলেন। পারস্য সম্রাটের সেই ভারী স্বর্ণের জামা, মাথায় রত্নখচিত মুকুট এবং হাতে কিসরার ঐতিহাসিক দুটি স্বর্ণবালা সুরাকাকে পরিয়ে দেওয়া হলো।

ভবিষ্যদ্বাণী যেভাবে সত্য হয়

হিজরতের দীর্ঘ ৮ বছর পর, মক্কা বিজয়ের দিন সুরাকা ইবনে মালিক নবীজির দরবারে উপস্থিত হয়ে সেই পুরনো চামড়ার লিখিত কাগজটি প্রদর্শন করেন এবং স্বেচ্ছায় ইসলাম গ্রহণ করেন। কিন্তু নবীজির দেওয়া সেই ঐতিহাসিক ভবিষ্যদ্বাণীর বাস্তবায়ন দেখতে মানবজাতিকে আরও কিছুদিন অপেক্ষা করতে হয়েছিল।

দ্বিতীয় খলিফা ওমরের খেলাফতকালে মুসলিম বাহিনী পারস্য সাম্রাজ্য জয় করে। পারস্য রাজপ্রাসাদের বিপুল ধনরত্ন, কিসরার মুক্তাখচিত রাজমুকুট, স্বর্ণনির্মিত তরবারি ও রাজকীয় স্বর্ণবালা মদিনার মসজিদে নববিতে নিয়ে আসা হয়।

ওমর (রা.) বিপুল সেই সম্পদের দিকে তাকিয়ে কাঁদছিলেন এবং বলছিলেন, “যে জাতি এই বিপুল সম্পদ পাওয়ার পরও খেয়ানত করেনি, তারা নিশ্চিতভাবেই আমানতদার।” এরপর তাঁর মনে পড়ে গেল হিজরতের সেই ঐতিহাসিক দিনে নবীজির দেওয়া প্রতিশ্রুতির কথা।

তিনি মজলিসে উপস্থিতদের মধ্য সুরাকা ইবনে মালিককে খুঁজলেন। সুরাকার ততদিনে বয়স হয়েছে। খলিফা ওমর (রা.) তাকে সামনে ডেকে আনলেন। পারস্য সম্রাটের সেই ভারী স্বর্ণের জামা, মাথায় রত্নখচিত মুকুট এবং হাতে কিসরার ঐতিহাসিক দুটি স্বর্ণবালা সুরাকাকে পরিয়ে দেওয়া হলো।

মরুভূমির এক সাধারণ আরব বেদুইন কিসরার রাজকীয় পোশাকে সজ্জিত হয়ে দাঁড়িয়ে আছেন—এই দৃশ্য দেখে মদিনার সাহাবিদের চোখে অশ্রু নেমে এসেছিল। এভাবেই হিজরতের দিনে মহানবী (সা.) যে কথা বলেছিলেন, তা এক সুনিশ্চিত সত্যে পরিণত হয়। (মুহাম্মদ আল-সাইয়িদ আল-ওয়াকিল, আল-হিজরাতুন নাবাবিয়্যাহ: দিরাসাহ ওয়া তাহলিল, পৃষ্ঠা: ১২৫, আল-জামিয়া আল-ইসলামিয়া, মদিনা, ১৯৮০)

আরও পড়ুন