কোরআনের শ্রেষ্ঠ আয়াতে যা বলা হয়েছে 

ছবি: পেক্সেলস

সুরা বাকারার ২৫৫ নম্বর আয়াতটিকে আয়াতুল কুরসি বলা হয়। এই আয়াতকে মহানবী (সা.) বলেছেন পবিত্র কোরআনের শ্রেষ্ঠ আয়াত। (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ৮১০)

এই আয়াতে আল্লাহর একত্ববাদ, অসীম ক্ষমতা, জ্ঞান, সার্বভৌমত্ব ও মহিমার এমন বর্ণনা এসেছে, যা একজন মুমিনের ইমানকে দৃঢ় করে এবং হৃদয়ে গভীর প্রশান্তি সৃষ্টি করে।

আয়াতের প্রথম অংশ 

আয়াতুল কুরসি শুরু হয়েছে আল্লাহর পরিচয় দিয়ে। বলা হয়েছে ‘আল্লাহ, তিনি ছাড়া কোনো উপাস্য নেই, তিনি চিরঞ্জীব, সবকিছুর ধারক ও রক্ষক।’

এখানে আল্লাহর দুটি মহান গুণের কথা বলা হয়েছে। ‘আল-হাইয়ু’ তথা চিরঞ্জীব এবং ‘আল-কাইয়ুম’ তথা সমস্ত সৃষ্টির পরিচালক ও রক্ষণাবেক্ষণকারী। পৃথিবীর সবকিছু পরিবর্তনশীল ও ক্ষণস্থায়ী, কিন্তু আল্লাহ অনন্ত, অবিনশ্বর ও সর্বশক্তিমান।

আয়াতের দ্বিতীয় অংশ 

আয়াতের দ্বিতীয় অংশে বলা হয়েছে, ‘তাঁকে কখনো তন্দ্রা বা নিদ্রা স্পর্শ করে না।’ মানুষের জীবনে ক্লান্তি, দুর্বলতা ও বিশ্রামের প্রয়োজন রয়েছে, কিন্তু আল্লাহ–তাআলা সকল অপূর্ণতা থেকে সম্পূর্ণ পবিত্র। আসমান ও জমিনে যা কিছু আছে, সবই তাঁর মালিকানাধীন। কোনো কিছুই তাঁর নিয়ন্ত্রণের বাইরে নয়।

আরও পড়ুন

আয়াতের তৃতীয় অংশ 

তৃতীয় অংশে বলা হয়েছে, ‘আসমান ও জমিনে যা কিছু রয়েছে, সবই তাঁর।’

সাত আসমানের বিস্তৃতি থেকে পৃথিবীর ক্ষুদ্রতম কণিকা পর্যন্ত যা কিছু বিদ্যমান, সবই তাঁর অধিকারভুক্ত। মহাবিশ্বের প্রতিটি নক্ষত্র, প্রতিটি প্রাণ, প্রতিটি অস্তিত্ববান বস্তু তাঁর সৃষ্ট, তাঁরই নিয়ন্ত্রিত এবং রাজত্বের অন্তর্ভুক্ত।

আয়াতের চতুর্থ অংশ 

আয়াতের এ অংশে শাফায়াত বা সুপারিশের বিষয়টিও উল্লেখ করা হয়েছে। বলা হয়েছে, ‘কে আছে এমন, যে সুপারিশ করবে তাঁর কাছে তাঁর অনুমতি ছাড়া?’

আল্লাহর অনুমতি ছাড়া কেউ তাঁর কাছে কারও জন্য সুপারিশ করতে পারবে না। এর মাধ্যমে বোঝা যায়, প্রকৃত ক্ষমতার মালিক একমাত্র আল্লাহ। নবী-রাসুল, ফেরেশতা ও নেককার বান্দাগণও তাঁর ইচ্ছার অধীন।

আয়াতের পঞ্চম অংশ 

‘তিনি তাদের সামনে এবং পেছনে যা আছে, সবকিছুই জানেন।’ সময়ের উন্মুক্ত প্রান্তরে যা প্রকাশিত এবং ইতিহাসের গভীর স্তরে যা গোপন, সবই তাঁর জানা। মানুষের অতীতের বিস্মৃত অধ্যায়, বর্তমানের নীরব স্পন্দন এবং ভবিষ্যতের অদেখা পরিণতি, সবকিছুই তাঁর অসীম জ্ঞানের পরিধিতে সমানভাবে বিদ্যমান।

আয়াতের ষষ্ঠ অংশ 

‘তাঁর জ্ঞানের সামান্য অংশও কেউ আয়ত্ত করতে পারে না, তবে তিনি যতটুকু ইচ্ছা করেন ততটুকুই।’

মানুষ জ্ঞানের যত উঁচু শিখরেই আরোহণ করুক না কেন, তা আল্লাহর অসীম জ্ঞানসমুদ্রের একটি বিন্দুরও সমান নয়। তিনি ইচ্ছা না করলে কোনো হৃদয় জ্ঞানের আলোয় উদ্ভাসিত হতে পারে না, আর তিনি যতটুকু উন্মোচন করেন, মানুষ কেবল ততটুকুই উপলব্ধি করতে সক্ষম হয়। তাঁর জ্ঞানের মহাসমুদ্রের সামনে মানববুদ্ধি এক বিনম্র তরঙ্গমাত্র।

আরও পড়ুন

আয়াতের সপ্তম অংশ 

‘তাঁর কুরসি আসমান ও জমিনকে পরিব্যাপ্ত করে আছে।’

সাত আসমানের সুবিশাল বিস্তার এবং পৃথিবীর সমস্ত প্রান্তর তাঁর কুরসির ব্যাপ্তির মধ্যে সমাহিত। নক্ষত্রপুঞ্জের অনন্ত মিছিল, গ্যালাক্সির অপরিসীম বিস্তার এবং সৃষ্টির প্রতিটি স্তর তাঁর মহিমার সামনে ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র। তাঁর কুরসির ব্যাপ্তি মহাবিশ্বের সীমাকে অতিক্রম করে তাঁর অসীম ক্ষমতা ও পরাক্রমের অতুলনীয় নিদর্শন হয়ে আছে।

আয়াতের অষ্টম অংশ 

‘আসমান ও জমিনের সংরক্ষণ ও পরিচালনা তাঁকে ক্লান্ত করে না।’

অসংখ্য নক্ষত্রের গতি, গ্রহমালার আবর্তন, সাগরের জোয়ার-ভাটা, জীবনের স্পন্দন, সমগ্র মহাবিশ্বের নিয়ন্ত্রণ ও রক্ষণাবেক্ষণ তাঁর জন্য বিন্দুমাত্র ক্লান্তির কারণ হয় না।

তিনি এমন এক পরম প্রতিপালক, যার ক্ষমতার সামনে কোনো দায়িত্বই ভারী নয় এবং কোনো কর্মই দুরূহ নয়। বিশ্বজগতের অনন্ত ব্যবস্থাপনা তাঁর অসীম শক্তির তুলনায় অত্যন্ত সহজ ও স্বাভাবিক।

আয়াতের শেষ অংশ 

‘আর তিনি সর্বোচ্চ, সর্বমহান।’

তিনি মর্যাদায় সর্বোচ্চ, মহিমায় অতুলনীয় এবং পরাক্রমে অনন্য। সকল শ্রেষ্ঠত্ব, গৌরব ও মহত্ত্বের চূড়ান্ত অধিকারী একমাত্র তিনি। তাঁর সত্তা সকল সীমাবদ্ধতার ঊর্ধ্বে এবং তাঁর মহিমা সকল কল্পনার অতীত।

আয়াতুল কুরসির ফজিলতও অপরিসীম। হাদিসে এসেছে, ‘যে ব্যক্তি প্রত্যেক ফরজ নামাজের পর আয়াতুল কুরসি পাঠ করে, তার জান্নাতে প্রবেশের পথে মৃত্যু ছাড়া আর কোনো বাধা থাকে না।’ (সুনানে কুবরা লিন নাসায়ি, হাদিস: ৯৯২৮)

অন্য হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, রাতে ঘুমানোর আগে এটি পাঠ করলে আল্লাহর পক্ষ থেকে একজন রক্ষক নিযুক্ত হয় এবং শয়তান তার কাছে আসতে পারে না। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৩২৭৫)

তাই এই মহান আয়াতের তিলাওয়াত মুসলমানদের দৈনন্দিন আমলের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হওয়া উচিত।

  • ফয়জুল্লাহ রিয়াদ : মুহাদ্দিস, জামিয়া আরাবিয়া দারুস সুন্নাহ রাজাবাড়ী, দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ

আরও পড়ুন