ক্ষুধা দূরীকরণে ইসলামের বাস্তবমুখী ৫ পদক্ষেপ

ছবি: এএফপি

জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) তথ্য অনুযায়ী, বর্তমান বিশ্বে ৮০ কোটিরও বেশি মানুষ প্রতি রাতে অনাহারে ঘুমাতে যায়। অথচ এক অবিশ্বাস্য বৈপরীত্য হলো, বিশ্বজুড়ে মানুষের প্রয়োজনের চেয়েও উদ্বৃত্ত খাদ্য উৎপাদিত হওয়া সত্ত্বেও বিপুল পরিমাণ খাবার অপচয়ের কারণে নষ্ট হচ্ছে।

এই খাদ্যাভাব কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগের ফল নয়; বরং এটি ত্রুটিপূর্ণ বণ্টনব্যবস্থা, অতিভোগবাদ ও অলসতার এক সম্মিলিত সংকট।

ইসলাম খাদ্য নিরাপত্তাকে শুধু সাধারণ মানবাধিকার হিসেবে দেখেনি; বরং একে মানবজীবনের অস্তিত্ব রক্ষার অন্যতম প্রধান স্তম্ভ ও মহান আল্লাহর দেওয়া শ্রেষ্ঠ পার্থিব নেয়ামত হিসেবে সাব্যস্ত করেছে।

ক্ষুধা নিবারণের যে বাস্তবমুখী রূপরেখা ইসলাম দিয়েছে, তার পাঁচটি মৌলিক দিক তুলে ধরা হলো।

তোমাদের মধ্যে যে ব্যক্তি সকালে নিজ পরিবারে নিরাপদে ওঠে, যার শরীর সুস্থ থাকে এবং যার কাছে সারা দিনের আহারের সংস্থান থাকে—সে যেন সমগ্র পৃথিবীটাই নিজের অধিকারে পেয়ে গেল।
সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ২৩৪৬

১. খাদ্য সংস্থানকে নিরাপত্তার ভিত্তি গণ্য করা

ইসলামি জীবনদর্শনে ক্ষুধা নিবারণ ও খাদ্য নিরাপত্তাকে মহান আল্লাহর অন্যতম শ্রেষ্ঠ অনুগ্রহ হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে।

কোরাইশ জাতিকে দেওয়া আল্লাহর বিশেষ কৃপার কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে কোরআনে বলা হয়েছে, ‘অতএব তারা যেন এই গৃহের (কাবা) রবের ইবাদত করে; যিনি তাদের ক্ষুধা থেকে অন্ন দিয়েছেন এবং ভয় থেকে নিরাপত্তা দান করেছেন।’ (সুরা কুরাইশ, আয়াত: ৩-৪)

দৈনন্দিন খাদ্য সংস্থান নিশ্চিত হওয়া একজন মানুষের জন্য কতটা বড় সম্পদ, তা নবীজির একটি হাদিসে চমৎকারভাবে ফুটে উঠেছে, ‘তোমাদের মধ্যে যে ব্যক্তি সকালে নিজ পরিবারে নিরাপদে ওঠে, যার শরীর সুস্থ থাকে এবং যার কাছে সারা দিনের আহারের সংস্থান থাকে—সে যেন সমগ্র পৃথিবীটাই নিজের অধিকারে পেয়ে গেল।’ (সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ২৩৪৬)

আরও পড়ুন

২. কায়িক শ্রমের মর্যাদা দেওয়া

ইসলামে অলসতা ও অন্যের ওপর বোঝা হয়ে বেঁচে থাকার কোনো সুযোগ নেই। জীবিকা অন্বেষণকে ইসলাম নিছক বৈষয়িক কাজ হিসেবে না দেখে ইবাদতের মর্যাদায় উন্নীত করেছে।

জুমার জামাত শেষ হওয়ার পরপরই জীবিকার সন্ধানে বের হওয়ার তাগিদ দিয়ে কোরআনে বলা হয়েছে, ‘অতঃপর যখন নামাজ সমাপ্ত হবে, তখন তোমরা জমিনে ছড়িয়ে পড়ো এবং আল্লাহর অনুগ্রহ (রিজিক) সন্ধান করো...।’ (সুরা জুমুআ, আয়াত: ১০)

অপর আয়াতে এসেছে: ‘তিনিই তো তোমাদের জন্য জমিনকে সুগম করে দিয়েছেন; অতএব তোমরা এর দিগন্ত-প্রান্তরে বিচরণ করো এবং তাঁর দেওয়া রিজিক আহার করো।’ (সুরা মুলক, আয়াত: ১৫)

পরিশ্রম করে পরিবারের মুখে আহার তুলে দেওয়াকে আল্লাহর পথে জিহাদের সমতুল্য মর্যাদা দেওয়া হয়েছে। 

একবার এক কর্মঠ যুবককে পাশ দিয়ে যেতে দেখে সাহাবিরা মন্তব্য করলেন, ‘হায়, এই যুবকের শক্তি ও যৌবন যদি আল্লাহর রাস্তায় ব্যয় হতো!’ তখন রাসুল (সা.)  তাঁদের দৃষ্টিভঙ্গি সংশোধন করে বললেন, ‘সে যদি তার ছোট সন্তানদের জীবিকার জন্য বের হয়ে থাকে, তবে সে আল্লাহর পথেই রয়েছে; সে যদি তার বৃদ্ধ পিতা-মাতার ভরণপোষণের জন্য বের হয়ে থাকে, তবে সে আল্লাহর পথেই রয়েছে; আর সে যদি অন্যের কাছে হাত পাতা থেকে নিজেকে বাঁচাতে বের হয়, তবে সে আল্লাহর পথেই রয়েছে।’ (ইমাম তাবারানি, হাদিস: ২৮২)

অনেকে ‘আল্লাহর ওপর ভরসা’ করাকে অলস বসে থাকার বাহানা বানান। অথচ ইসলামে তাওয়াক্কুল হলো সর্বোচ্চ সাধ্য ব্যয় করে কাজ করার পর ফলাফলের দায়িত্ব আল্লাহর ওপর সঁপে দেওয়া।

নিজের হাতের উপার্জনকে সর্বোত্তম আখ্যা দিয়ে নবীজি (সা.) বলেছেন, ‘নিজ হাতের উপার্জিত খাদ্যের চেয়ে উত্তম খাদ্য কেউ কখনো গ্রহণ করেনি। আল্লাহর নবী দাউদ (আ.) নিজ হাতে শ্রম দিয়ে উপার্জন করে আহার করতেন।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ২০৭২)

এমনকি ভিক্ষাবৃত্তির অবমাননা থেকে বাঁচাতে তিনি কাঠ কেটে বিক্রি করাকে অন্যের কাছে হাত পাতার চেয়ে বহুগুণ সম্মানজনক বলেছেন। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ১৪৭১)

৩. পাখির মতো সক্রিয় জীবিকা অন্বেষণ

অনেকে ‘আল্লাহর ওপর ভরসা’ করাকে অলস বসে থাকার বাহানা বানান। অথচ ইসলামে তাওয়াক্কুল হলো সর্বোচ্চ সাধ্য ব্যয় করে কাজ করার পর ফলাফলের দায়িত্ব আল্লাহর ওপর সঁপে দেওয়া।

রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘তোমরা যদি আল্লাহর ওপর যথাযথভাবে তাওয়াক্কুল করতে, তবে পাখিদের যেভাবে রিজিক দেওয়া হয় তোমাদেরও সেভাবে রিজিক দেওয়া হতো; তারা সকালে শূন্য পেটে বাসা থেকে বের হয়ে যায় এবং সন্ধ্যায় ভরা পেটে নীড়ে ফিরে আসে।’ (সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ২৩৪৪)

পাখিরা কখনো বাসায় বসে অলস সময় কাটায় না; ডানা মেলে আহারের সন্ধানে বের হওয়ার মাধ্যমেই তাদের ক্ষুধা নিবারণ হয়।

আরও পড়ুন

৪. শ্রমিকের ন্যায্য পারিশ্রমিক

ক্ষুধা দূর করতে হলে উৎপাদনপ্রক্রিয়ায় যুক্ত মেহনতি মানুষের পারিশ্রমিক নিশ্চিত করা জরুরি। শ্রমিকের ঘাম ও অধিকার হরণকারী সমাজের বিরুদ্ধে স্বয়ং আল্লাহ তাআলা যুদ্ধের ঘোষণা দিয়েছেন।

হাদিসে কুদসিতে মহান আল্লাহ ঘোষণা করেছেন, কেয়ামতের দিন আমি তিন শ্রেণির মানুষের বিরুদ্ধে স্বয়ং প্রতিপক্ষ হব; তার মধ্যে একজন হলো সেই ব্যক্তি, যে কোনো শ্রমিককে কাজে নিযুক্ত করে তার কাছ থেকে পূর্ণ কাজ আদায় করে নেয়, অথচ তার ন্যায্য পারিশ্রমিক পরিশোধ করে না।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ২২২৭)

শ্রমিকের পারিশ্রমিক আটকে রাখা বা তাদের শোষণ করাই প্রকারান্তরে তাদের পরিবারকে ক্ষুধার মুখে ঠেলে দেয়।

৫. অপচয় রোধ ও পরিমিত খাদ্যাভ্যাস

বিশ্বের বর্তমান খাদ্যসংকটের বড় কারণ উৎপাদনের ঘাটতি নয়, বরং সম্পদের অপচয় ও অতিভোজন। ইসলাম অপচয়কে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করেছে। কোরআনে বলা হয়েছে, ‘...তোমরা আহার করো ও পান করো, কিন্তু অপচয় কোরো না; নিশ্চয়ই আল্লাহ অপচয়কারীদের ভালোবাসেন না।’ (সুরা আরাফ, আয়াত: ৩১)

অতিরিক্ত অপচয়কারীকে শয়তানের ভাই আখ্যা দেওয়া হয়েছে। (সুরা ইসরা, আয়াত: ২৭)

পেটের চেয়ে নিকৃষ্ট কোনো পাত্র মানুষ ভর্তি করে না। মেরুদণ্ড সোজা রাখার মতো কয়েক লোকমা খাবারই মানুষের জন্য যথেষ্ট। যদি খেতেই হয়, তবে পেটের এক-তৃতীয়াংশ খাবারের জন্য, এক-তৃতীয়াংশ পানির জন্য এবং বাকি এক-তৃতীয়াংশ শ্বাস-প্রশ্বাসের জন্য খালি রাখা উচিত।
সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ২৩৮০

স্বাস্থ্যসম্মত ও পরিমিত খাদ্যাভ্যাসের নির্দেশ দিয়ে রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘পেটের চেয়ে নিকৃষ্ট কোনো পাত্র মানুষ ভর্তি করে না। মেরুদণ্ড সোজা রাখার মতো কয়েক লোকমা খাবারই মানুষের জন্য যথেষ্ট। যদি খেতেই হয়, তবে পেটের এক-তৃতীয়াংশ খাবারের জন্য, এক-তৃতীয়াংশ পানির জন্য এবং বাকি এক-তৃতীয়াংশ শ্বাস-প্রশ্বাসের জন্য খালি রাখা উচিত।’ (সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ২৩৮০)

এমনকি খাদ্য নষ্ট রোধে কোনো প্রাণীকে অপ্রয়োজনে হত্যা করাও নিষিদ্ধ; রাসুল (সা.) শিকারকৃত পাখির আহারযোগ্য অংশ অপচয় না করার কড়া নির্দেশ দিয়েছেন। (সুনানে নাসায়ি, হাদিস: ৪৩৪৯)

ক্ষুধামুক্ত বিশ্ব গড়ার জন্য ইসলাম এক সুষম ও সার্বিক কর্মপরিকল্পনা দিয়েছে—যেখানে অলসতার পরিবর্তে সক্রিয় শ্রমকে ধর্মীয় মর্যাদা দেওয়া হয়েছে, শ্রমিকের অর্থনৈতিক অধিকারকে সুরক্ষিত করা হয়েছে এবং থালার শেষ দানাটি পর্যন্ত অপচয় করা থেকে সতর্ক করা হয়েছে।

মানবিক সহমর্মিতা, হালাল উপার্জনের মেহনত এবং পরিমিতিবোধকে জীবনের অভ্যাস বানিয়ে নিলেই ক্ষুধা ও দারিদ্র্যের মতো বৈশ্বিক সংকট থেকে সমাজ চিরতরে মুক্তি পেতে পারে।

আরও পড়ুন