নবীজির বাবার কবর কোথায়

ছবি: এআই / প্রথম আলো

হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, “তিনি যখন বনু আদি ইবনে নাজ্জারের দুর্গের দিকে তাকালেন, তা চিনতে পারলেন।” (ইবনে সাদ, আত-তাবাকাতুল কুবরা, ১/১৩৪, দারুল কুতুব আল-ইলমিয়া, বৈরুত, ১৯৯০)

কোন সে দুর্গ? কী কথা নবীজির মনে উঁকি দিয়েছিল সেই দুর্গের দিকে তাকিয়ে? এ পাঠ হয়তো পাঠকের হৃদয়ে অমলিন হয়ে থাকা ছোটকালের কোনো স্মৃতির সঙ্গে মিলে যাবে। হয়তো কয়েকটি দৃশ্যপটও হুবহু এক মনে হবে; কিন্তু একটি বিষয় মিলবে না! মিল-অমিল খুঁজতে খুঁজতে পড়তে থাকুন।

হাশিম ইবন আসিম আল-আসলামি তাঁর পিতার উদ্ধৃতি দিয়ে বলেন, একবার রাসুল (সা.) তাঁর মা আমিনা বিনতি ওয়াহাবের সঙ্গে ছিলেন। যখন তাঁর বয়স ছয় বছরে উপনীত হলো, তিনি তাঁকে নিয়ে তাঁর মামাদের নিকট বেড়ানোর উদ্দেশ্যে মদিনার বনু আদি ইবনি নাজ্জারের উদ্দেশ্যে বের হন।

সঙ্গে ছিলেন উম্মে আইমান (যিনি তাঁকে দুধ খাইয়েছিলেন)। তাঁরা ছিলেন দুটি উটের আরোহী। মা তাঁকে নিয়ে নাবিগার গৃহে অবতরণ করেন এবং তাঁদের নিকট একমাস অবস্থান করেন।

রাসুল (সা.) সেই অবস্থানের কিছু স্মৃতি ধরে রেখেছিলেন। যখন তিনি বনু আদি ইবনে নাজ্জারের দুর্গের দিকে তাকালেন, তা তিনি শনাক্ত করতে পারলেন এবং বললেন, ‘আমি এ দুর্গে উনাইসা নামের এক আনসারি দাসির সঙ্গে খেলা করতাম; আমি মামাবংশের বালকদের সঙ্গে ঘুড়ি ওড়াতাম, যা এখানে এসে পড়েছিল।’

তিনি সেই গৃহের দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘ওই যে, ওখানে আমার মা আমাকে নিয়ে অবতরণ করেছিলেন; আর এই যে এই ঘরে আবদুল্লাহ ইবন আবদুল মুত্তালিবের কবর!’ বনু আদি ইবনি নাজ্জারের পুকুরে আমি সুন্দর সাঁতার কাটতাম। (ইবনে সাদ, আত-তাবাকাতুল কুবরা, ১/১৩৫, দারুল কুতুব আল-ইলমিয়া, বৈরুত, ১৯৯০)

আবদুল মুত্তালিব ব্যবসা উপলক্ষে খেজুর আনয়নের উদ্দেশ্যে আবদুল্লাহকে মদিনা পাঠিয়েছিলেন। অসুস্থ হয়ে তিনি সেখানেই মৃত্যুবরণ করলে নাবিগার বাড়িতে তাঁর কাফন-দাফনের ব্যবস্থা করা হয়।

ইহুদিদের একদল লোক বিভিন্ন চোখে তাঁর দিকে তাকাতো। উম্মে আইমান বলেন, ‘আমি শুনলাম তাদের কেউ একজন বলছে, “এ হচ্ছে এই উম্মতের নবী, এ হচ্ছে তার হিজরতের ভূমি।” তার পুরো কথায় আমি ভয় পেয়ে গেলাম। আমি তাঁকে নিয়ে তাঁর মায়ের কাছে ফিরলাম।’

তাঁরা যখন আবওয়ায় পৌঁছালেন, আমিনা বিনতে ওয়াহাব মৃত্যুবরণ করেন। তাঁর কবর সেখানেই। উম্মে আইমান যে দুটি উটে চড়ে তাঁরা এসেছিলেন, তা নিয়ে মক্কা ফিরলেন। (ইবনে সাদ, আত-তাবাকাতুল কুবরা, ১/১৩৬, দারুল কুতুব আল-ইলমিয়া, বৈরুত, ১৯৯০)

বনু নাজ্জারের সঙ্গে নবীপরিবারের সম্পর্ক

বনু নাজ্জারের সঙ্গে নবীপরিবারের সম্পর্ক গভীর। এটি বনু মাখজুমের একটি শাখা। নবীপরিবারের সঙ্গে অন্তত তিন পুরুষের সম্বন্ধ রয়েছে এ গোত্রের। নবীজির দাদা আবদুল মুত্তালিবের পিতা হাশেম এ গোত্রেই বিয়ে করেন। তিনি ফিলিস্তিনের গাজা শহরের ব্যবসা পরিচালনা করতেন এবং সেখানে মৃত্যুবরণ করলে তাঁকে গাজাতেই দাফন করা হয়।

বনু নাজ্জার আবদুল মুত্তালিবের নানার গোষ্ঠী এবং সিরিয়ায় আসা-যাওয়া ও ব্যবসার পথে বনু হাশিমের বিশ্রামস্থল। ব্যবসার উদ্দেশ্যে আবদুল্লাহ সিরিয়া গিয়েছিলেন। এক কোরাইশ কাফেলার সঙ্গে মক্কা প্রত্যাবর্তনের পথে তিনি অসুস্থ হয়ে মদিনায় অবতরণ করেন।

কারও মতে, আবদুল মুত্তালিব ব্যবসা উপলক্ষে খেজুর আনয়নের উদ্দেশ্যে আবদুল্লাহকে মদিনা পাঠিয়েছিলেন। অসুস্থ হয়ে তিনি সেখানেই মৃত্যুবরণ করলে নাবিগার বাড়িতে তাঁর কাফন-দাফনের ব্যবস্থা করা হয়। (সাফিউর রহমান মুবারকপুরি, আর-রাহিক আল-মাখতুম, পৃষ্ঠা ৪২, মাকতাবা দারুস সালাম, রিয়াদ, ২০০৫)

আরও পড়ুন

ইতিহাসবিদ তাবারি উল্লেখ করেছেন, ‘আবু জায়েদ আন-নাজ্জারি বলেন, আবদুল্লাহ ইবন আবদিল মুত্তালিবের কবর নাবিগার গৃহে।’ আবদুল আজিজ ইবন ইমরান বলেন, ‘নাবিগার গৃহে প্রবেশ করে বামের দিকে দ্বিতীয় ঘরটির দোরগোড়ায় আবদুল্লাহর কবর।’ (আত-তাবারি, তারিখুল উমাম ওয়াল মুলুক, ২/২৫০, দারুল মাআরিফা, বৈরুত, ২০০৩)

আমাদের খুঁজে বের করতে হবে, নবীজির স্মৃতিবিজড়িত ‘আন-নাবিগা গৃহ’ মদিনার ঠিক কোন এলাকায় এবং বনু নাজ্জারের দুর্গই–বা কোনটি?

‘নাজ্জার’ শব্দের অর্থ কাঠুরিয়া—যিনি কুঠার দিয়ে গাছপালা কেটে খড়ি তৈরি করেন। বনু নাজ্জারের কোনো এক পূর্বপুরুষ কুঠার দিয়ে তাঁর ভাইয়ের হাত কেটে দেওয়ায় সে থেকে বংশের নাম ‘আন-নাজ্জার’ হয়ে যায। (ইবনে আমিন বাগদাদি, সাবায়িক আজ-জাহাব ফি মারিফাতি আনসাবিল আরব, পৃষ্ঠা ৮৫, দারুল কুতুব আল-ইলমিয়া, বৈরুত, ১৯৮৮)

ইবনে হাজার আসকালানিও অনুরূপ কথা বলেছেন (ফাতহুল বারি, ৭/১২০, দারুল মাআরিফা, বৈরুত, ১৯৬০)। তবে মুহাম্মদ আশ-শানকিতি বলেন, তাঁদের পূর্বপুরুষ সিজার বা কাঁচি দ্বারা খতনা করেছেন কিংবা কাউকে আঘাত করেছেন, তাই তাঁদের বংশীয় নাম ‘আন-নাজ্জার’ হয়ে যায়। (আশ-শানকিতি, শুরুকু আনওয়ারিল মিনান আল-কুবরা আল-ইলাহিয়্যা, পৃষ্ঠা ১৪৪৩, দারুল ফিকর, বৈরুত, ২০০৮)

মদিনায় প্রবেশ করে রাসুলের উটনী যে স্থানে প্রথম বসে পড়ে, সেই স্থানটিই হলো পরবর্তীতে মসজিদে নববীর স্থান। স্থানটির মালিক ছিলেন দুজন ইয়াতিম বালক সাহল ও সোহায়েল ইবনে রাফি ইবনে আমর। তাঁরা ছিলেন বনু নাজ্জারের।

আনসারদের মধ্যে বনু নাজ্জারের গৃহগুলো অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, “আনসারদের গৃহের মধ্যে সর্বোত্তম হচ্ছে বনু নাজ্জারের ঘর, এরপর বনু আবদুল আশহালের, এরপর বনু হারিস ইবনু খাজরাজের, এরপর বনু সাইদার ঘর। তাছাড়া প্রত্যেক আনসারীর গৃহেই কল্যাণ বিরাজ করছে।” (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৩৭৬০)।

বনু নাজ্জারের গৃহগুলো হচ্ছে বনু মুগালাহ, বনু আদি ইবন মালিক, বনু জুদাইলাহ, বনু মুয়াবিয়া ইবন আমর, বনু হাসহাস ইবন মালিক, বনু দিনার, বনু মাজিন, বনু মাবজুল, বনু মানদুল ইত্যাদি গৃহসমূহ।

যাঁরা নাজ্জারি হিসেবে প্রসিদ্ধ ছিলেন, তাঁদের মধ্যে আবূ আইয়ুব আনসারি, হাসান ইবন সাবিত ও মায়ের দিক থেকে আনাস বিন মালিক (রা.) অন্যতম। এাঁদের গৃহ ছিল বর্তমান মসজিদে নববীর আশেপাশে।

মদিনায় আগমন ও মসজিদে নববির ভিত্তি

হিজরতের সময় কুবায় ১৭ দিন অবস্থানের পর নবীজি (সা.) মদিনায় প্রবেশের পূর্বে বনু নাজ্জারকে সংবাদ দিলেন। নবীজির উট কাসওয়া আল্লাহর নির্দেশনায় যে স্থানে থামে, তার নিকটবর্তী বাড়ি ছিল আবু আইয়ুব আনসারির গৃহ। নবীজি (সা.) সাত মাস এ বাড়িতে অবস্থান করেন।

মদিনায় প্রবেশ করে রাসুলের উটনী যে স্থানে প্রথম বসে পড়ে, সেই স্থানটিই হলো পরবর্তীতে মসজিদে নববীর স্থান। স্থানটির মালিক ছিলেন দুজন ইয়াতিম বালক সাহল ও সোহায়েল ইবনে রাফি ইবনে আমর। তাঁরা ছিলেন বনু নাজ্জারের। এটি তখন তাঁদের খেজুর শুকানোর চাতাল ছিল। (ইবনে হিশাম, আস-সিরাতুন নাবাবিয়্যা, ১/৪৯৫, দারুল কুতুব আল-ইলমিয়া, বৈরুত, ২০০১)

আরও পড়ুন

নবীজি (সা.) দশ দিনার মূল্যে স্থানটি ক্রয় করলেন। অতঃপর তার আশপাশের মুশরিকদের কবরগুলো উঠিয়ে ফেলা হয় এবং ভগ্নস্তূপগুলো সরিয়ে স্থানটি সমতল করা হয়। গারক্বাদের খেজুরগাছগুলো উঠিয়ে সেগুলোকে কিবলার দিকে সারিবদ্ধভাবে পুঁতে দেওয়া হয়। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৪২৮)

বর্ণিত আছে, বিলাল ইবনে রিবাহ (রা.) বনি নাজ্জারের কোনো এক নারীর গৃহের ছাদে দাঁড়িয়ে আজান দিয়েছিলেন। কেননা, মসজিদে নববীর নিকটে তাঁর গৃহটিই ছিল সুউচ্চ। (আল-বাগভি, শারহুস সুন্নাহ, ২/২৭২, আল-মাকতাব আল-ইসলামি, দামেস্ক, ১৯৮৩)

সম্ভবত মসজিদে নববির পাশে ‘আল-বাকি’ গোরস্থান সংলগ্ন একটি মসজিদ ছিল—যা ‘মাসজিদ দার আন–নাবিগা’ নামে পরিচিত ছিল। হিজরি তৃতীয় শতকের গ্রন্থকার আমর ইবনে শাব্বাহ একটি বর্ণনা উল্লেখ করেছেন, ‘আমর ইবনে ইয়াহিয়া ইবন উমারা আল-মাজিনি তাঁর পিতার উদ্ধৃতি দিয়ে বলেন, নবীজি (সা.) মাসজিদ দার আন–নাবিগায় (নাবিগার গৃহের মসজিদ) নামাজ পড়েছিলেন এবং বনি আদ্দির মসজিদে অজু করেছেন।’ (আমর ইবনে শাব্বাহ, তারিখুল মাদিনা, ১/৪০০, দারুল ফিকর, বৈরুত, ১৯৯৬)

বনু নাজ্জারের বংশগুলো, বিশিষ্ট ব্যক্তি ও তাঁদের গৃহ, মসজিদে নববীর স্থান, বিলালের আজান, বনু নাজ্জারের মসজিদ ইত্যাদি থেকে স্পষ্ট প্রতীয়মান হয় যে বনু নাজ্জারের বসতি ছিল বর্তমান মসজিদে নববীর এলাকাতেই।

পরে মুসলিমেরা আরও ৫৬টি দুর্গ তৈরি করেন, যার ফলে মোট সংখ্যা হয় ১২৮টি! এর মধ্যেই ছিল বনু নাজ্জারের সেই দুর্গ, যেখানে নবীজির বাবার কবর অবস্থিত ছিল।

দুর্গের ইতিহাস ও বাবার কবর

এই এলাকায় নবীজির বাবার কবর কোথায়—যার দিকে হয়তো তিনি মসজিদে নববির কোনো এক জায়গায় দাঁড়িয়ে তাকিয়েছিলেন? কোথায় সেই ‘উতুম আদ্দি ইবনি আন-নাজ্জার’?

‘উতুম’ মানে দুর্গ, যা চারদিক ঘেরাও করে কিছুটা উঁচুতে নির্মিত হতো। এটি ছিল ইহুদিদের পদ্ধতি। তারা মদিনায় এ রকম ৫৯টি দুর্গ তৈরি করে। আরবরা তাদের অনুসরণে আরও ১৩টি দুর্গ বানান। (আহমদ ইয়াসিন আল-খাইয়ারি, তারিখুল মাদিনা আল-মুনাওয়ারা, পৃষ্ঠা ৪০, মাকতাবাতুদ দার, মদিনা, ১৯৯৩)

মদিনায় নবীজি যখন আসেন, তখন এর মোট সংখ্যা ছিল ৭২টি। নবীজি (সা.) এসব দুর্গ ধ্বংসে নিষেধ করেন এবং এগুলোকে মদিনার সৌন্দর্য ঘোষণা করেন। (বায়হাকি, দাওয়াউল নুবুওয়াহ, ২/১১০, দারুল বাজি, বৈরুত, ১৯৮৫)

পরে মুসলিমেরা আরও ৫৬টি দুর্গ তৈরি করেন, যার ফলে মোট সংখ্যা হয় ১২৮টি! এর মধ্যেই ছিল বনু নাজ্জারের সেই দুর্গ, যেখানে নবীজির বাবার কবর অবস্থিত ছিল।

হয়তো নবীজির ঘোষণার কারণে শতাব্দীর পর শতাব্দী মদিনার প্রায় ১২৮টি দুর্গে কেউ হাত দেয়নি। কিন্তু সময়ের আবর্তনে সেসব মাটির সঙ্গে মিশে যেতে থাকে। পরবর্তী সময়ে মদিনার উন্নয়নের প্রয়োজনে বিভিন্ন সড়ক তৈরির সময় এসব দুর্গ বিলীন হয়ে যায়। একটি সূত্র থেকে জানা যায়, ১৯৭৯ সালে ‘বাকি’ গোরস্থান বিস্তৃত করার প্রয়োজনে সেই দুর্গটি ভেঙে ফেলা হয় এবং বাবার কবরটি গোরস্থানের অন্তর্ভুক্ত করা হয়।

আলোচনা শেষ করা যাক মা আমিনার অত্যন্ত মর্মস্পর্শী ভাষায় আবৃত্তি করা শোকগাথা দিয়ে, “বাতহার ভূমি হাশিমের পুত্রকে হারালো; বিলাপের মাঝে সমাধিতে সুখস্বপ্নে সে পরিতৃপ্ত! মৃত্যু তাকে ঢাকলো আর সে তাতে সাড়া দিল। জনতার মাঝে ইবন হাশিমকেও মৃত্যু ছাড়লো না! গোধূলিতে লোকেরা তাঁর খাটিয়া বহন করছিল; তার বন্ধুরা ভিড়ের ভেতর প্রেম নিবেদন করছিল। মৃত্যু ও মৃত্যুর উপসর্গ তার অস্তিত্বকে বিলীন করেছে; কিন্তু তিনি দানশীল ও অতিশয় কোমল ছিলেন।” (ইবনে সাদ, আত-তাবাকাতুল কুবরা, ১/১৩৬, দারুল কুতুব আল-ইলমিয়া, বৈরুত, ১৯৯০)

  • ড. মুহাম্মদ তাজাম্মুল হক : অধ্যাপক, ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়

আরও পড়ুন