কেন আল্লাহই প্রকৃত রিজিকদাতা

ছবি: ফ্রিপিক

মহাবিশ্বের দিকে তাকালে একটি চিরন্তন সত্য চোখে পড়ে—প্রতিটি সৃষ্টি তার অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে বাহ্যিক কিছু উপাদানের ওপর নির্ভরশীল। ইসলামের পরিভাষায় এই জীবনধারণের উপাদানকেই বলা হয় ‘রিজিক’।

দেখতে মনে হয়, মানুষ নিজের মেধা ও পরিশ্রম দিয়ে রিজিক উপার্জন করছে। কিন্তু কার্যকারণের গভীরে প্রবেশ করলে দেখা যায়, মানুষের প্রচেষ্টা কেবল একটা বাহ্যিক মাধ্যম; রিজিকের প্রকৃত উৎস আল্লাহ।

মানুষের বাহ্যিক চেষ্টার নিজস্ব কোনো স্বাধীন ক্ষমতা নেই, যা অবলম্বন করলেই রিজিকপ্রাপ্তি নিশ্চিত হবে। যদি তা-ই হতো, তবে কোনো পরিশ্রম কখনো বৃথা যেত না।

উপকরণ আর মূল চালিকা শক্তি

একজন কৃষক মাটিতে বীজ বপন করেন; কিন্তু সেই নিষ্প্রাণ বীজে প্রাণ সঞ্চার করা, কোষ বিভাজনের মাধ্যমে চারাগাছে রূপান্তরিত করা, নির্দিষ্ট নিয়মে ফলের জিনগত কোড সক্রিয় রাখা—এতে কৃষকের কোনো অবদান নেই।

উদ্ভিদের সালোকসংশ্লেষণের জন্য দরকার সূর্যের আলো, মাটির খনিজ আর সঠিক জলবায়ু। এই পুরো মহাজাগতিক ব্যবস্থাটা মানুষ তৈরি করেনি। মানুষ কেবল তৈরি উপাদান ব্যবহার করে মাত্র।

এভাবে ভাবলে স্পষ্ট হয়—মানুষের বাহ্যিক চেষ্টার নিজস্ব কোনো স্বাধীন ক্ষমতা নেই, যা অবলম্বন করলেই রিজিকপ্রাপ্তি নিশ্চিত হবে। যদি তা-ই হতো, তবে কোনো পরিশ্রম কখনো বৃথা যেত না।

আরও পড়ুন

অথচ দেখা যায়, প্রতিকূল পরিস্থিতিতে হাজারো চেষ্টা ব্যর্থ হয়, আবার কখনো সামান্য শ্রমেই মাঠ ভরে ওঠে। মানুষের এই উদ্যম আল্লাহর দেওয়া একটা ব্যবস্থাপনা মাত্র; তার অন্তরালে আসল চালিকা শক্তি আল্লাহর ইচ্ছা।

মানুষের নিয়ন্ত্রণের সীমা

হাদিসে কুদসিতে আল্লাহ বলেছেন, ‘হে আমার বান্দাগণ, আমি যাকে অন্ন দিয়েছি সে ছাড়া তোমরা সবাই ক্ষুধার্ত। সুতরাং তোমরা আমার কাছে খাদ্য চাও, আমি তোমাদের খাদ্য দেব।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২৫৭৭)

এই একটি বাক্যেই রিজিকের পুরো দর্শন এসে যায়।

আল্লাহর রিজিকদাতা হওয়ার সবচেয়ে বড় প্রমাণ তার সর্বজনীনতা। তিনি কেবল বিশ্বাসীদের নয়, যারা তাকে অস্বীকার করে তাদেরও জীবনোপকরণ দেন।

আধুনিক প্রযুক্তি, নিখুঁত পরিকল্পনা আর সর্বোচ্চ পরিশ্রমের পরেও একটা প্রাকৃতিক দুর্যোগ, অনাবৃষ্টি বা বন্যায় কোটি কোটি টাকার ফসল নষ্ট হয়ে যায়। রিজিকের সমীকরণে এমন বহু বিষয় আছে, যা সম্পূর্ণ মানুষের নিয়ন্ত্রণের বাইরে।

এই অনিয়ন্ত্রিত বিষয়গুলো যাঁর ইশারায় পরিচালিত হয়, যুক্তির বিচারে তিনিই রিজিকের প্রকৃত মালিক।

সর্বজনীন অনুগ্রহ

আল্লাহর রিজিকদাতা হওয়ার সবচেয়ে বড় প্রমাণ তার সর্বজনীনতা। তিনি কেবল বিশ্বাসীদের নয়, যারা তাকে অস্বীকার করে তাদেরও জীবনোপকরণ দেন। পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে, ‘ভূপৃষ্ঠে বিচরণকারী এমন কোনো প্রাণী নেই, যার রিজিকের দায়িত্ব আল্লাহ নেননি।’ (সুরা হুদ, আয়াত: ৬)

আরও পড়ুন

যে জড়বাদী মনে করে তার প্রাচুর্য কেবলই তার মেধার ফল, সে আসলে একটি যৌক্তিক বিভ্রান্তিতে আছে। কারণ, তার চিন্তা করার মেধা, কাজ করার শারীরিক সুস্থতা, এমনকি যে সমাজে সে অর্থ উপার্জন করছে, এগুলোর কোনোটাই সে নিজে তৈরি করেনি। সম্পদকে নিজের কৃতিত্ব ভেবে অহংকার করা তাই একটা দার্শনিক ভুলও বটে।

পক্ষান্তরে, একজন মুমিন বিশ্বাস করে যে তার ক্ষুদ্রতম রিজিকটুকুও আল্লাহর পক্ষ থেকে আসা নেয়ামত। এই বিশ্বাসটা তার সব কাজকে একটা ভিন্ন মাত্রা দেয়—সে উপার্জন করে এবং সেই উপার্জন আল্লাহর নির্দেশিত পথে ব্যয় করে; এভাবে জীবিকার প্রতিটি পদক্ষেপ তার জন্য ইবাদতে পরিণত হতে পারে।

যুক্তি, পর্যবেক্ষণ ও দর্শন—সব পথ শেষ পর্যন্ত একটি জায়গায় এসে মেলে: মানুষ রিজিকের সংগ্রাহক হতে পারে, কিন্তু স্রষ্টা নয়।

সংকট: একটি পরীক্ষা

মানুষের একটি সাধারণ দুর্বলতা হলো, অভাব বা কষ্টের মুহূর্তে সে অধৈর্য হয়ে পড়ে এবং ভাবে আল্লাহ তাকে ছেড়ে দিয়েছেন।

পবিত্র কোরআন এই মনস্তত্ত্বটা চমৎকারভাবে ধরেছে, ‘মানুষের অবস্থা এই যে যখন তার প্রতিপালক তাকে মর্যাদা ও অনুগ্রহ দান করেন, তখন সে বলে, আমার প্রতিপালক আমাকে সম্মানিত করেছেন। আর যখন তার রিজিক সংকুচিত করে দেন, তখন সে বলে, আমার প্রতিপালক আমাকে হেয় করেছেন।’ (সুরা ফাজর, আয়াত: ১৫-১৬)

এই দুটো প্রতিক্রিয়াই আসলে অপরিপক্ব। প্রাচুর্য মানে আল্লাহর সন্তুষ্টি, আর সংকট মানে তার বিরাগ—এই ভাবনা সঠিক নয়। সংকট অনেক সময় আল্লাহর একটা পরীক্ষা, যেখানে তিনি দেখতে চান বান্দা তার দিকে রুজু করে কি না। এই ক্ষণিক কষ্টের ভেতরে হয়তো লুকিয়ে থাকে বড় কোনো কল্যাণ।

সারকথা: যুক্তি, পর্যবেক্ষণ ও দর্শন—সব পথ শেষ পর্যন্ত একটি জায়গায় এসে মেলে: মানুষ রিজিকের সংগ্রাহক হতে পারে, কিন্তু স্রষ্টা নয়। এই সত্যটা উপলব্ধিতে এলে আল্লাহর প্রতি নির্ভরতা স্বাভাবিকভাবেই বাড়ে, আর সেই নির্ভরতাই মুমিনের মানসিক প্রশান্তির মূল উৎস।

  • মুফতি ইউসুফ এমদাদী : শিক্ষক, মারকাযু ফয়জিল কুরআন আল-ইসলামী, ঢাকা

আরও পড়ুন