ইসলামি ইতিহাসে লক্ষাধিক সাহাবির মধ্যে এমন কয়েকজন রয়েছেন, যাঁদের মর্যাদা আল্লাহ অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছেন। তাঁদেরই একজন হলেন মদিনার আনসার সাহাবিদের অন্যতম শ্রেষ্ঠ নেতা হজরত সাদ ইবনে মুয়াজ (রা.)।
তাঁর মৃত্যুর পর এমন এক অভাবনীয় ঘটনা ঘটেছিল, যা অন্য কোনো সাহাবির ক্ষেত্রে শোনা যায় না। তাঁর মৃত্যুতে স্বয়ং মহান আল্লাহর আরশ কেঁপে উঠেছিল। মাত্র ছয় থেকে সাত বছরের ইসলামি জীবনে তিনি এমন কী অসামান্য ত্যাগ স্বীকার করেছিলেন, যার কারণে আসমানি জগতে এই তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছিল?
আল্লাহর আরশ কেঁপে ওঠার হাদিস
মহানবী (সা.) সুস্পষ্ট ভাষায় সাদ ইবনে মুয়াজের এই অতুলনীয় মর্যাদার কথা ঘোষণা করেছেন। সাহাবি জাবের (রা.) বলেন, নবীজি বলেছেন, ‘সাদ ইবনে মুয়াজের মৃত্যুতে দয়াময় আল্লাহর আরশ কেঁপে উঠেছে।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৩৮০৩)
ইমাম নববি (রহ.) এই হাদিসের চমৎকার ব্যাখ্যা দিয়ে লিখেছেন, আল্লাহর আরশ কেঁপে ওঠার মানে হলো, সাদের আত্মাকে স্বাগত জানানোর জন্য আরশ বহনকারী ফেরেশতারা আনন্দে উদ্বেলিত হয়েছিলেন এবং তাঁর আগমনে আসমানি জগতে এক বিশাল আনন্দোৎসবের সৃষ্টি হয়েছিল। (আন-নববি, আল-মিনহাজ শারহু সহিহ মুসলিম, ১৫/১১, দারু ইহইয়াইত তুরাস আল-আরাবি, বৈরুত, ১৩৯২ হিজরি)
তাঁর জানাজা দুনিয়ার সাধারণ কোনো জানাজা ছিল না। আসমান থেকে অগণিত ফেরেশতা তাঁর জানাজায় অংশ নিতে পৃথিবীতে নেমে এসেছিলেন।
৭০ হাজার ফেরেশতার জানাজায় অংশগ্রহণ
তাঁর জানাজা দুনিয়ার সাধারণ কোনো জানাজা ছিল না। আসমান থেকে অগণিত ফেরেশতা তাঁর জানাজায় অংশ নিতে পৃথিবীতে নেমে এসেছিলেন।
মহানবী (সা.) তাঁর জানাজার নামাজ পড়ানোর পর সাহাবিদের উদ্দেশ করে বলেছিলেন, ‘নিশ্চয়ই এই পুণ্যবান বান্দার জন্য আসমানের দরজাসমূহ খুলে দেওয়া হয়েছে এবং তার জানাজায় এমন ৭০ হাজার ফেরেশতা উপস্থিত হয়েছে, যারা এর আগে কখনো পৃথিবীতে অবতরণ করেনি।’ (সুনানে নাসায়ি, হাদিস: ২০৫৫)
বেহেশতে তাঁর রুমাল দুনিয়ার চেয়েও দামি
সাদের মর্যাদা আল্লাহর কাছে এতটাই বেশি ছিল যে মহানবী (সা.) তাঁর বেহেশতি পোশাকের সৌন্দর্য দুনিয়াবাসীর সামনে উপমা হিসেবে তুলে ধরেছিলেন। একবার নবীজির কাছে একটি দৃষ্টিনন্দন রেশমি পোশাক উপহার হিসেবে এল। সাহাবিরা এর কোমলতা ও সৌন্দর্য দেখে অবাক হয়ে গেলেন।
অল্প সময়ে বদর, ওহুদ ও খন্দকের যুদ্ধে তিনি নবীজির ছায়াসঙ্গী হিসেবে যেভাবে পাহাড়ের মতো অটল ছিলেন, তা তাঁকে এই অনন্য মর্যাদা এনে দিয়েছে।
তখন নবীজি বললেন, ‘তোমরা কি এর কোমলতা দেখে বিস্মিত হচ্ছো? বেহেশতে সাদ ইবনে মুয়াজের রুমালগুলো এর চেয়েও অনেক বেশি সুন্দর ও উত্তম।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৩৮০২)
মাত্র ৬ বছরের ইসলামি জীবন
সাদ ইবনে মুয়াজ (রা.) ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেছিলেন হিজরতের মাত্র এক বছর আগে এবং ইন্তেকাল করেন পঞ্চম হিজরিতে খন্দকের যুদ্ধের পরপরই। অর্থাৎ, তিনি মুসলিম হিসেবে জীবন যাপন করেছেন মাত্র ছয় থেকে সাত বছর।
কিন্তু এই অল্প সময়ে বদর, ওহুদ ও খন্দকের যুদ্ধে তিনি নবীজির ছায়াসঙ্গী হিসেবে যেভাবে পাহাড়ের মতো অটল ছিলেন, তা তাঁকে এই অনন্য মর্যাদা এনে দিয়েছে। খন্দকের যুদ্ধে তিনি একটি তিরের আঘাতে মারাত্মকভাবে আহত হন এবং সেই আঘাতেই শাহাদাত বরণ করেন।
ইবনে কাসির (রহ.) লিখেছেন, খন্দকের যুদ্ধের মতো চরম সংকটের মুহূর্তে ইসলাম ও মুসলমানদের সুরক্ষায় সাদ ইবনে মুয়াজ (রা.) যে নিঃস্বার্থ আত্মত্যাগ ও বুদ্ধিমত্তার পরিচয় দিয়েছিলেন, তা তাঁকে আল্লাহর কাছে শহীদদের কাতারে সর্বোচ্চ সম্মানে ভূষিত করেছে। (ইবনে কাসির, আল-বিদায়াহ ওয়ান নিহায়াহ, ৪/১৩২, দারুল হিজর, কায়রো, ১৯৯৭)
সাদ ইবনে মুয়াজের জীবন আমাদের জন্য এক শিক্ষণীয় বিষয়। জীবনের দৈর্ঘ্য বা ইবাদতের পরিমাণই কেবল শেষ কথা নয়; বরং ইমানের গভীরতা, নিখাদ সততা এবং ধর্মের প্রতি নিঃস্বার্থ আত্মত্যাগই আল্লাহর কাছে মানুষের আসল মর্যাদা নির্ধারণ করে।
এহসান সিরাজ : আলেম ও লেখক