মিনায় শয়তানকে পাথর কেন নিক্ষেপ করা হয়

শয়তানকে পাথর মারছেন এক হাজিছবি: উইকিপিডিয়া

হজের গুরুত্বপূর্ণ আমলগুলোর একটি হলো ‘রমি’ বা শয়তানকে পাথর নিক্ষেপ করা। জিলহজের ১০, ১১ ও ১২ তারিখে হাজিরা মিনায় অবস্থান করে নির্ধারিত স্থানে ছোট ছোট পাথর নিক্ষেপ করেন।

বাহ্যিকভাবে এটি একটি সাধারণ কাজ মনে হলেও এর অভ্যন্তরে রয়েছে আমাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ও গভীর আধ্যাত্মিক শিক্ষা।

পাথর নিক্ষেপের ইতিহাস

রমি বা পাথর নিক্ষেপের ইতিহাস জড়িয়ে আছে নবী ইব্রাহিমের মহান ত্যাগ ও পরীক্ষার সঙ্গে।

বর্ণনায় এসেছে, মহান আল্লাহ যখন তাঁকে পুত্র ইসমাইলকে কোরবানি করার নির্দেশ দিলেন, তখন শয়তান বিভিন্ন স্থানে এসে তাঁকে এই আদেশ পালন থেকে বিরত রাখার চেষ্টা করে। কখনো ইব্রাহিমকে, কখনো হাজেরাকে, আবার কখনো স্বয়ং ইসমাইলকে প্ররোচিত করতে থাকে।

তখন ইব্রাহিম (আ.) আল্লাহর নির্দেশে শয়তানকে পাথর নিক্ষেপ করে তাড়িয়ে দেন। সেই স্মৃতিকে জীবন্ত রাখতেই আজও হাজিরা মিনার জামারাতে পাথর নিক্ষেপ করেন। (সহিহুত তারগিব, হাদিস: ১১৫৬) 

আল্লাহর হুকুমের সামনে ব্যক্তিগত ইচ্ছা, আবেগ ও যুক্তি গৌণ। ইবাদতের পেছনের সব রহস্য মানুষের বোধগম্য না হলেও মুমিন তা পালন করেন আল্লাহর আদেশ হিসেবে।
আরও পড়ুন

পাথর নিক্ষেপের উদ্দেশ্য

তবে রমির মূল উদ্দেশ্য শয়তানকে বাস্তব অর্থে আঘাত করা নয়। কারণ সেখানে কোনো দৃশ্যমান শয়তান উপস্থিত থাকে না। এটি মানুষের অন্তরের শয়তানি প্রবৃত্তি, কুপ্রবৃত্তি ও পাপ-প্রবণতার বিরুদ্ধে প্রতীকী যুদ্ধ ঘোষণা।

পাথর নিক্ষেপের মাধ্যমে হাজি যেন ঘোষণা করেন, ইব্রাহিম (আ.)-এর মতো আমি আল্লাহর আনুগত্যের পথে বাধা হয়ে দাঁড়ানো সব প্রলোভনকে প্রত্যাখ্যান করছি। আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) বলেন, ‘তোমরা শয়তানকে পাথর নিক্ষেপ করো। তোমরা তোমাদের পূর্বপুরুষ ইব্রাহিমের রীতি অনুসরণ করছ।’ (ইবনে খুজাইমা, হাদিস: ২৯৬৭)

পাপাচারে উদ্বুদ্ধ করা শয়তানের কাজ 

শয়তানের কাজ হলো মানুষকে বিভিন্নভাবে বিভ্রান্ত করা, পাপাচারে উদ্বুদ্ধ করা এবং আল্লাহর স্মরণ থেকে দূরে সরিয়ে রাখা। অহংকার, লোভ, হিংসা, বিদ্বেষ, হারাম উপার্জনের মোহ কিংবা দুনিয়ার চাকচিক্যের মাধ্যমে শয়তান মানুষকে পথভ্রষ্ট করার চেষ্টা করে। শয়তানকে পাথর নিক্ষেপ এসব অপশক্তির বিরুদ্ধে ইমানদার হৃদয়ের প্রতিবাদ।

আরও পড়ুন
রমি বা শয়তানকে পাথর নিক্ষেপের শিক্ষা কেবল মিনার প্রান্তরে সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না, জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রেই তা বাস্তবায়ন করতে হবে।

আল্লাহর নিঃশর্ত আনুগত্য

পাথর নিক্ষেপের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হলো আল্লাহর নির্দেশের প্রতি নিঃশর্ত আনুগত্য। আল্লাহর হুকুমের সামনে ব্যক্তিগত ইচ্ছা, আবেগ ও যুক্তি গৌণ। অনেক ইবাদতের মতো এর পেছনের সব রহস্য মানুষের বোধগম্য না হলেও মুমিন তা পালন করেন আল্লাহর আদেশ হিসেবে।

ইব্রাহিম (আ.) যেমন প্রশ্নহীনভাবে আল্লাহর নির্দেশ মেনে নিয়েছিলেন, তেমনি হাজিরাও পাথর নিক্ষেপের মাধ্যমে সেই আনুগত্যের অনুসরণ করেন। 

ইমানের পথ কখনো সহজ নয়। এ পথে অবিচল থাকতে নফস, সমাজ, পরিবেশ ও শয়তানি প্ররোচনার সঙ্গে প্রতিনিয়ত লড়াই করতে হয়। মিনায় নিক্ষিপ্ত প্রতিটি পাথর যেন এই অঙ্গীকারের প্রতীক যে, আমি অন্যায়ের কাছে মাথা নত করব না, পাপাচারে লিপ্ত হব না এবং সত্যের পথে অটল থাকব।

মুসলমানদের ঐক্যের প্রতীক

এ আমল মুসলিম উম্মাহর ঐক্যের অপূর্ব দৃশ্য তুলে ধরে। পৃথিবীর নানা ভাষা, বর্ণ, শ্রেণি ও সংস্কৃতির মানুষ একই সময়ে, একই স্থানে, একই নিয়মে পাথর নিক্ষেপ করেন। এতে প্রতীয়মান হয়, অন্যায় ও অসত্যের বিরুদ্ধে সংগ্রাম কোনো ব্যক্তি বা জাতির একক বিষয় নয়, এটি সমগ্র মানবজাতির অভিন্ন লড়াই।

আধুনিক বিশ্বে শয়তানের কুমন্ত্রণা ব্যক্তিগত পাপের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। মিডিয়া, সংস্কৃতি, ভোগবাদ, নৈতিক অবক্ষয় ও বিভ্রান্তিকর মতাদর্শের মাধ্যমে তা বিস্তার লাভ করছে প্রতিনিয়ত। তাই রমি বা শয়তানকে পাথর নিক্ষেপের শিক্ষা কেবল মিনার প্রান্তরে সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না, জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রেই তা বাস্তবায়ন করতে হবে।

  • ফয়জুল্লাহ রিয়াদ: মুহাদ্দিস, জামিয়া আরাবিয়া দারুস সুন্নাহ রাজাবাড়ী, দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ

আরও পড়ুন