যেভাবে গড়ে ওঠে ইসলামের প্রথম বিদ্যালয়

ছবি: ফ্রিপিক

ইসলামি দাওয়াতের ইতিহাসে হিজরতপূর্ব মদিনা ছিল একটি উর্বর ভূমি, যেখানে ইমানের বীজ বপন করা হয়েছিল অত্যন্ত সুশৃঙ্খল ও প্রাতিষ্ঠানিক উপায়ে।

নবুয়তের ত্রয়োদশ বর্ষে মদিনার আউস ও খাজরাজ গোত্রের নেতারা যখন ইসলামের সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়ে নবীজির (সা.) কাছে চিঠি পাঠান, তখন তাঁদের প্রধান দাবি ছিল এমন একজন শিক্ষক পাঠানো, যিনি তাঁদের পবিত্র কোরআন শিক্ষা দেবেন এবং ইসলামের মৌলিক বিধান ও জীবনদর্শন বুঝিয়ে দেবেন।

মদিনায় ইসলামের প্রথম শিক্ষানিকেতন

মদিনাবাসীর আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে মহানবী (সা.) প্রখর মেধা ও বাগ্মিতার অধিকারী তরুণ সাহাবি মুসআব ইবনে ওমায়ের (রা.)-কে মদিনায় পাঠান। মুসআব (রা.) মদিনায় গিয়ে যে শিক্ষা কার্যক্রম শুরু করেন, তাকেই তাত্ত্বিকভাবে ইসলামের প্রথম মাদ্রাসা হিসেবে অভিহিত করা হয়। তাঁর আন্তরিক প্রচেষ্টার ফলে মদিনার ঘরে ঘরে খুব দ্রুতই ইসলামের আলো পৌঁছে যায়। (নুরুদ্দিন আলী ইবনে ইব্রাহিম আল-হালাবি, আস-সিরাতুল হালবিয়্যাহ, ১/৪০৩)

বায়আতে আকাবা

পরের বছর হজের মৌসুমে মুসআব (রা.)-এর দাওয়াতের ফসল হিসেবে মদিনা থেকে ৭৩ জন পুরুষ ও ২ জন মহিলার এক বিশাল কাফেলা মক্কায় উপস্থিত হয়। নবুয়তের প্রতিকূল পরিবেশে এই কাফেলার সঙ্গে নবীজির (সা.) সাক্ষাতের স্থান নির্ধারিত হয় মক্কার উপকণ্ঠ আকাবা নামক স্থানে, গভীর রাতে, নীবর পরিবেশে। ইসলামের ইতিহাসে যেটাকে আকাবার দ্বিতীয় শপথ বলা হয়।

এই মজলিশে নবীজি (সা.)-এর সঙ্গে তাঁর চাচা আব্বাসও উপস্থিত ছিলেন, যিনি তখনো ইসলাম গ্রহণ না করলেও ভাতিজার নিরাপত্তার বিষয়ে ছিলেন অত্যন্ত সচেতন। তিনি মদিনার কাফেলাকে সম্বোধন করে বলেন,

আরও পড়ুন

‘এ হচ্ছে আমার ভাতিজা মুহাম্মাদ। সর্বদা আপন গোত্রে সম্মান ও নিরাপত্তার সঙ্গে বসবাস করে আসছে। আপনারা যাঁরা তাঁকে মদিনায় নিয়ে যেতে চাইছেন, তাঁরা ভেবে দেখুন, যদি আপনারা তাঁর সঙ্গে কৃত অঙ্গীকার যথাযথভাবে পালন করতে পারেন এবং শত্রুদের হাত থেকে তাঁকে পূর্ণ নিরাপত্তা দিতে পারেন, তবে এ দায়িত্ব গ্রহণে এগিয়ে আসুন। অন্যথায় তাঁকে তাঁর নিজের গোত্রেই থাকতে দিন।’

ইমানের অগ্নিপরীক্ষা ও চূড়ান্ত শপথ

জবাবে মদিনার কাফেলাপ্রধান বলেন, ‘নিশ্চয় আমরা এই দায়িত্ব নিচ্ছি এবং তাঁর সঙ্গে কৃত বায়আতের পূর্ণ বাস্তবায়নই আমাদের একমাত্র কাম্য।’

এ কথা শুনে এই অঙ্গীকার ও বায়আতকে দৃঢ় করার উদ্দেশ্যে আসআদ ইবনে জুরারা (রা.) দাঁড়িয়ে বলেন, ‘হে মদিনাবাসী, একটু অপেক্ষা করো। তোমরা কি বুঝতে পারছ আজ তোমরা কোন বিষয়ে বায়আত করতে যাচ্ছ? বুঝে নাও, এই বায়আত গোটা আরব ও অনারবের বিরোধিতা এবং মোকাবিলার অঙ্গীকার। যদি তোমরা এটাকে পূরণ করতে পারো, তবেই বায়আত সম্পাদন করো। অন্যথায় নিজেদের অপারগতা প্রকাশ করে দাও।’ এ কথা শুনে সবাই একবাক্যে বলে ওঠেন, ‘আমরা কোনো অবস্থাতেই এ বায়আত থেকে পিছু হটব না।’

এরপর তাঁরা বলেন, ‘আল্লাহর রাসুল, আমরা যদি এই অঙ্গীকার পূরণ করি, তাহলে আমরা কী প্রতিদান পাব?’ তিনি বলেন, ‘আল্লাহর সন্তুষ্টি ও জান্নাত।’ এ কথা শুনে সবাই বলে ওঠেন, ‘আমরা এতেই সন্তুষ্ট আছি। আপনি আপনার পবিত্র হাত বাড়িয়ে দিন, আমরা বায়আত করব।’ তিনি তখন হাত বাড়ান আর সবাই তাঁর বায়আতলাভে ধন্য হন।

আল্লাহই ভালো জানেন, রাসুল (সা.)-এর শুভদৃষ্টি আর সামান্য কয়েকটি কথা ওই লোকগুলোর ওপর যে কী পরিমাণ প্রভাব ফেলেছিল, মাত্র কিছু সময়ের সাহচর্যের বরকতেই পার্থিব সব সম্পর্ক এবং সম্মান ও সম্পদের মোহ অন্তর থেকে বেরিয়ে সেখানে শুধু এক আল্লাহর ভালোবাসার রং এতটাই গাঢ় হয়ে ওঠে যে জানমাল, মানসম্মান সবকিছু এর বিনিময়ে ত্যাগ করতে তাঁরা প্রস্তুত হয়ে যান। আর এর ছাপ তাঁদের পরবর্তী প্রজন্ম পর্যন্ত অব্যাহত থাকে। (ইবনে হিশাম, আস-সিরাতুন নববিয়্যাহ, ১/৪৩৮)

আরও পড়ুন

ত্যাগের পরাকাষ্ঠা

এই বায়আতের চেতনা সাহাবিদের পরবর্তী প্রজন্ম পর্যন্ত কতটা প্রবল ছিল, তার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হলো উম্মু আম্মারার সন্তান হুবাইব (রা.)-এর শাহাদত। ভণ্ড নবী মুসায়লিমা কাজ্জাব তাঁকে বন্দী করে নিষ্ঠুর নির্যাতন চালায়।

সে তাঁর শরীরের প্রতিটি অঙ্গ এক এক করে কেটে বিচ্ছিন্ন করে ফেলে এবং বারবার জিজ্ঞেস করে, ‘তুমি কি মুহাম্মদ (সা.)-এর নবুয়তে বিশ্বাস করো?’ হুবাইব (রা.) শরীরের প্রতিটি কণা বিলীন হয়ে যাওয়ার আগপর্যন্ত অবিচল কণ্ঠে নবীজি (সা.)-এর নবুয়তের সাক্ষ্য দিয়ে গেছেন, কিন্তু মিথ্যার সঙ্গে আপস করেননি। (আস-সিরাতুল হালবিয়্যাহ, ১/৪০৯)

সাংগঠনিক কাঠামো

শপথ গ্রহণ শেষে নবীজি (সা.) এক অনন্য সাংগঠনিক প্রজ্ঞার পরিচয় দেন। তিনি উপস্থিত ৭৩ জন পুরুষ ও ২ জন মহিলার এই কাফেলা থেকে ১২ জনকে নাকিব বা প্রতিনিধি হিসেবে মনোনীত করেন, যাঁরা মদিনায় ইসলামের প্রচার ও প্রসারের দায়িত্বশীল হিসেবে কাজ করবেন। (ইবনুল আসির, আল-কামিল ফিত তারিখ, ১/৫১৬, আস-সিরাতুল হালবিয়্যাহ, ১/৪১১)

আরও পড়ুন