মানুষ ও পরিবেশের সম্পর্ক: ইসলাম যেভাবে মূল্যায়ন করে

ছবি: পেক্সেলস

আল্লাহ–তাআলা এক সুনির্দিষ্ট ও সুষম নিয়মে এই প্রকৃতি সৃষ্টি করেছেন, যাতে সব উপাদান মিলে একটি নির্ধারিত লক্ষ্য পূরণে কাজ করতে পারে। সৃষ্টির সূচনালগ্নেই তিনি এই সবকিছুকে মানুষের কল্যাণে নিয়োজিত করেছেন এবং মানুষ যেন এর অন্তর্নিহিত রহস্য ও নিয়মগুলো উন্মোচন করতে পারে, সেই পথও সুগম করে দিয়েছেন।

তাই প্রকৃতির কোনো উপাদান থেকে উপকৃত হলেই মুমিনের অন্তরে আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতার ফল্গুধারা বয়ে যায়। কারণ, মানুষ প্রকৃতিকে নিজের শক্তিতে জয় করেনি, বরং মহান আল্লাহই একে মানুষের জন্য অনুগত ও সহজ করে দিয়েছেন।

পবিত্র কোরআনে বিষয়টি চমৎকারভাবে বলা হয়েছে, ‘আর তিনি আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীর সবকিছুকে তোমাদের কল্যাণে নিয়োজিত করেছেন।’ (সুরা জাসিয়া, আয়াত: ১৩)

নিশ্চয়ই আল্লাহ সুন্দর এবং তিনি সৌন্দর্য পছন্দ করেন।
মুসনাদে আহমাদ, হাদিস: ৩৭৮৯

এ বিশ্বাসের কারণে প্রকৃতির কোনো রুদ্ররূপ বা শক্তি দেখে মানুষের মনে কোনো অলীক ভয় বা কুসংস্কারের জন্ম হয় না। একজন মুসলিম একমাত্র আল্লাহর ওপর ইমান আনেন, শুধু তাঁরই ইবাদত করেন এবং তাঁরই কাছে সাহায্য প্রার্থনা করেন।

প্রকৃতি আল্লাহরই অনন্য সৃষ্টি, তাই মানুষ একে ভালোবাসে, এর রহস্য অনুসন্ধান করে। প্রকৃতিও তখন মানুষের কল্যাণে অকাতরে সাড়া দেয়। ফলে মানুষ ও পরিবেশের মধ্যে গড়ে ওঠে এক শাশ্বত বন্ধুত্ব ও সৌহার্দ্যের বন্ধন।

কোরআন ও সুন্নাহর এই শাশ্বত আলোকেই মানুষ ও পরিবেশের পারস্পরিক সম্পর্ককে প্রধানত চারটি মাত্রায় বিন্যস্ত করা যায়:

১. প্রতিনিধিত্বের সম্পর্ক

মানবজাতি সৃষ্টির মাহেন্দ্রক্ষণে মহান আল্লাহ ফেরেশতাদের উদ্দেশে ঘোষণা করেছিলেন, ‘আমি পৃথিবীতে একজন প্রতিনিধি (খলিফা) বানাতে যাচ্ছি।’ (সুরা আল-বাকারা, আয়াত: নম্বর ৩০)

এই ‘খলিফা’ শব্দের ব্যাখ্যায় ইমাম বাগভি লিখেছেন, মানুষ পৃথিবীতে নিজের খেয়ালখুশিমতো পরিবেশ বা প্রকৃতি ব্যবহার করতে পারে না; বরং সে আল্লাহর জমিনে তাঁরই বিধান ও নির্দেশনা বাস্তবায়নের জন্য নিযুক্ত একজন প্রতিনিধি (খলিফা) মাত্র। (আবু মুহাম্মদ বাগভি, মাআলিমুত তানজিল, ১/৭৯, দার ইহইয়া আত–তুরাস আল–আরাবি, বৈরুত, ১৪২০ হি.)

প্রমাণ হিসেবে সুরা সোয়াদের ২৬ নম্বর আয়াতের উদ্ধৃতি দেওয়া যায়, যেখানে আল্লাহ নবী দাউদ (আ.)-কে সম্বোধন করে বলেছেন, ‘হে দাউদ, আমি তোমাকে পৃথিবীতে প্রতিনিধি করেছি, অতএব তুমি মানুষের মধ্যে সত্যের সঙ্গে বিচার করো।’

এই প্রতিনিধিত্বের কারণে মানুষ পৃথিবীর মালিক নয় বটে, কিন্তু সে একজন আমানতদার ও অভিভাবক। মানুষকে আমানতের হক যথাযথভাবে আদায় করতে হবে।

এই খেলাফতের ধারণার মধ্যেই পরিবেশের সঙ্গে মানুষের মূল মনস্তাত্ত্বিক সম্পর্কটি নিহিত। এটি মানুষের স্বেচ্ছাচারী মনোভাবকে খর্ব করে তাকে পরিবেশ রক্ষায় পরম দায়িত্বশীল করে তোলে।

আরও পড়ুন

২. পরিবেশের উন্নয়ন ও আবাদ করা

পরিবেশের সঙ্গে মানুষের দ্বিতীয় সম্পর্কটি হলো এর উন্নয়ন, পরিচর্যা ও আবাদ করা। পবিত্র কোরআনে বর্ণিত হয়েছে, হজরত সালেহ (আ.) তাঁর জাতিকে উদ্দেশ করে বলেছিলেন, ‘তিনি তোমাদের পৃথিবী থেকে সৃষ্টি করেছেন এবং তোমাদের তা আবাদ করার দায়িত্ব দিয়েছেন।’ (সুরা হুদ, আয়াত: ৬১)

বিখ্যাত তাবেয়ি জায়েদ ইবনে আসলামের মতে, আল্লাহ মানুষকে ঘরবাড়ি নির্মাণ, বৃক্ষরোপণ এবং নিজেদের প্রয়োজনীয় জনপদ গড়ে তোলার নির্দেশ দিয়েছেন।

অন্য এক ব্যাখ্যায় বলা হয়, আল্লাহ মানুষকে চাষাবাদ, বৃক্ষরোপণ ও জলাশয় খননের মাধ্যমে পৃথিবীকে সুশোভিত ও বাসযোগ্য করার জ্ঞান ও প্রেরণা দান করেছেন। (কুরতুবি, আল-জামি লি-আহকামিল কুরআন, ৯/৫৬, দার আল–কুতুব আল–মিসরিয়্যা, কায়রো, ১৯৬৪ খ্রি.)

মুফাসসির আল-জামাখশারি এই আবাদ বা উন্নয়নকে চার ভাগে ভাগ করেছেন—ওয়াজিব (আবশ্যক), মানদুব (উত্তম), মুবাহ (সাধারণ) এবং মাকরুহ (অপছন্দনীয়)।

তিনি একটি ঐতিহাসিক উপাখ্যান উল্লেখ করে লিখেছেন যে পারস্যের রাজারা প্রবাদের মতো দীর্ঘ জীবন লাভ করতেন, অথচ তাঁরা প্রজাদের ওপর জুলুমও করতেন।

সেই সময়ের একজন নবী আল্লাহর কাছে তাঁদের এই দীর্ঘায়ুর রহস্য জানতে চাইলে আল্লাহ ওহির মাধ্যমে জানান, ‘তারা আমার জমিনকে আবাদ করেছে, ফলে আমার বান্দারা স্বাচ্ছন্দ্যে বেঁচে থাকার সুযোগ পেয়েছে।’ (জামাখশারি, আল-কাশশাফ, ৩/১০১, দার আল–কুতুব আল–আরাবি, বৈরুত, ১৪০৭ হি.)

রঙিন আর সুবাসিত ফুল কি শুধু মৌমাছিকে আকর্ষণ করার জন্যই তৈরি? মৌমাছি তো একটি অতি সাধারণ বা অনাড়ম্বর ফুলেও বসতে পারত, তবে কেন প্রকৃতিতে রঙের এই বিপুল সমারোহ?

৩. প্রকৃতির সৌন্দর্য উপভোগ

গাছপালা, ফলমূল, পশুপাখি, সাগর-পাহাড় আর আকাশের তারকারাজি—এই সবকিছু সৃষ্টির পেছনে মানুষের কেবল অন্ন-বস্ত্র বা জাগতিক প্রয়োজন মেটানোই আল্লাহর একমাত্র উদ্দেশ্য নয়, বরং এর পেছনে রয়েছে এক মনস্তাত্ত্বিক ও নান্দনিক উদ্দেশ্য, যা মানুষের মনে অনাবিল আনন্দ ও আত্মিক সজীবতা জোগায়।

আল্লাহ বলেন, ‘যিনি আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবী সৃষ্টি করেছেন এবং আকাশ থেকে তোমাদের জন্য বর্ষণ করেন পানি, অতঃপর তা দ্বারা আমি মনোরম উদ্যান সৃষ্টি করি, যার বৃক্ষাদি উৎপাদন করার ক্ষমতা তোমাদের নেই।’ (সুরা নামল, আয়াত: ৬০)

প্রকৃতির এই নান্দনিক রূপ আসলে আল্লাহর তৈরি একটি শাশ্বত নিয়মের অংশ, যাকে ‘সৌন্দর্যের ইলাহি নিয়ম’ বলা যায়। আল্লাহ চান তাঁর বান্দারাও যেন সুন্দর রুচিবোধের অধিকারী হয়। রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ সুন্দর এবং তিনি সৌন্দর্য পছন্দ করেন।’ (মুসনাদে আহমাদ, হাদিস: ৩৭৮৯)

সৌন্দর্য হলো প্রকৃতির সহজাত অলংকার। মানুষের জীবন স্থূল প্রয়োজন মেটানোতেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং তা প্রতিনিয়ত এক নিখুঁত নান্দনিকতার দিকে ধাবিত হয়। রঙিন আর সুবাসিত ফুল কি শুধু মৌমাছিকে আকর্ষণ করার জন্যই তৈরি? মৌমাছি তো একটি অতি সাধারণ বা অনাড়ম্বর ফুলেও বসতে পারত, তবে কেন প্রকৃতিতে রঙের এই বিপুল সমারোহ?

আসলে সব জৈবিক প্রয়োজন হয়তো একটি সাধারণ ফুল দিয়েই মিটে যেত, কিন্তু এই অপরূপ রূপবৈচিত্র্য কেবলই সুন্দরের পরম বহিঃপ্রকাশ। আল্লাহ আমাদের আত্মিক খোরাকের জন্য এতে অনন্য রূপমাধুরী দিয়েছেন।

আরও পড়ুন

৪. সৃষ্টিতাত্ত্বিক চিন্তাভাবনা

আমাদের চারপাশের এই পরিবেশ আল্লাহর অস্তিত্ব, তাঁর অসীম ক্ষমতা এবং নিখুঁত কর্মদক্ষতার এক জীবন্ত ও বাঙ্‌ময় দলিল। এটি তাঁর দয়া, করুণা এবং একত্বের সবচেয়ে বড় বৈষয়িক প্রমাণ।

পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে, ‘আর তিনিই তাঁর রহমতের (বৃষ্টির) আগে সুসংবাদবাহীরূপে বাতাস পাঠান এবং আমি আকাশ থেকে পবিত্র পানি বর্ষণ করি, যেন তা দ্বারা মৃত ভূখণ্ডকে জীবিত করি এবং আমার সৃষ্ট বহু জীবজন্তু ও মানুষকে তা পান করাই।’ (সুরা আল-কুরআন, আয়াত: ৪৮-৫০)

একইভাবে মানুষের হেদায়েত ও কল্যাণের জন্য পাহাড়, নদী আর তারকারাজির ভূমিকা নিয়ে অন্যত্র এসেছে, ‘এবং তিনি পৃথিবীতে সুদৃঢ় পর্বত স্থাপন করেছেন যেন তা তোমাদের নিয়ে হেলে না পড়ে এবং নদী ও পথ তৈরি করেছেন যাতে তোমরা গন্তব্যে পৌঁছাতে পারো... যদি তোমরা আল্লাহর নেয়ামত গণনা করো, তবে তার সংখ্যা নির্ণয় করতে পারবে না।’ (সুরা নাহল, আয়াত: ১৫-১৮)

আমিই প্রচুর পানি বর্ষণ করি, অতঃপর জমিকে চমৎকারভাবে বিদীর্ণ করি এবং তাতে উৎপন্ন করি শস্য, আঙুর, শাকসবজি, জয়তুন, খেজুর এবং ঘন উদ্যান ও ফলমূল।
কোরআন, সুরা আবাসা ২৫-৩১

আল্লাহ–তাআলা পরিবেশের এই চাক্ষুষ প্রমাণের মাধ্যমেই নিজের ‘রুবুবিয়্যাত’ আমাদের সামনে তুলে ধরেছেন। এ জন্যই তিনি আমাদের বারবার প্রকৃতির দিকে তাকিয়ে চিন্তা ও গবেষণা করার আহ্বান জানিয়েছেন।

আল্লাহ বলেন, ‘তিনিই সূর্যকে দীপ্তিময় এবং চন্দ্রকে আলোকময় করেছেন এবং তার মনজিলগুলো (কক্ষপথ) নির্ভুলভাবে নির্ধারণ করেছেন...আল্লাহ এসব নিরর্থক সৃষ্টি করেননি, বরং সত্যতার সঙ্গেই সৃষ্টি করেছেন।’ (সুরা ইউনুস, আয়াত: ৫)

আবার বলা হয়েছে, ‘তারা কি নিজেদের মনে ভেবে দেখে না যে আল্লাহ আকাশমণ্ডলী, পৃথিবী এবং এই দুইয়ের মধ্যবর্তী সবকিছু সত্যতার সঙ্গেই সৃষ্টি করেছেন?’ (সুরা আর-রুম, আয়াত: ৮)

আল্লাহর মহিমান্বিত শক্তির প্রমাণ মেলে সুরা আর-রাদের ১২-১৩ নম্বর আয়াতেও—‘তিনিই তোমাদের ভয় ও আশার সঞ্চার করতে বিদ্যুৎ দেখান এবং ভারী মেঘমালা সৃষ্টি করেন। আর বজ্র তাঁর প্রশংসার সঙ্গে তসবিহ পাঠ করে।’

আবার সুরা আবাসা’র ২৫-৩১ নম্বর আয়াতে মানুষের জীবনোপকরণের নিখুঁত ব্যবস্থার বিবরণ দিয়ে বলা হয়েছে, ‘আমিই প্রচুর পানি বর্ষণ করি, অতঃপর জমিকে চমৎকারভাবে বিদীর্ণ করি এবং তাতে উৎপন্ন করি শস্য, আঙুর, শাকসবজি, জয়তুন, খেজুর এবং ঘন উদ্যান ও ফলমূল।’

অতএব, আমাদের চারপাশের এই দৃশ্যমান পরিবেশের মহিমান্বিত আয়োজনেই লুকিয়ে আছে স্রষ্টাকে চেনার চাবিকাঠি। যত বেশি আমরা তা নিয়ে ভাবব, সত্যের আলো আমাদের সামনে তত বেশি উন্মোচিত হবে।

পবিত্র কোরআনে বর্ণিত হয়েছে, ‘আমি ওদের জন্য আমার নির্দেশনাবলি বিশ্বজগতে এবং ওদের নিজেদের মধ্যে প্রকাশ করব, যাতে ওদের কাছে স্পষ্ট হয়ে যায় যে এটি সত্য।’ (সুরা ফুসসিলাত, আয়াত: ৫৩)

মোট কথা, ইসলাম মানুষ ও পরিবেশের মধ্যে এমন একটি অবিচ্ছেদ্য ও পরিপূরক সম্পর্ক তৈরি করেছে, যা মানুষের ইমান ও চেতনাকে শাণিত করে। মানুষ যত বেশি প্রকৃতিকে জানবে, স্রষ্টার প্রতি তার বিশ্বাস ও আত্মসমর্পণ তত সুদৃঢ় হবে।

  • ইফতিখারুল হক হাসনাইন : গবেষক ও প্রবন্ধকার

আরও পড়ুন