ইতিহাসের পাতায় ১৪ রমজান দিনটি বড় বড় সাম্রাজ্যের পতন এবং গণমানুষের প্রতিরোধের জীবন্ত সাক্ষী। এই দিনে উমাইয়া খেলাফতের সূর্য অস্তমিত হয়, মিসরের জেগে ওঠে সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী গণঅভ্যুত্থান।
উমাইয়া খেলাফতের পতন
১৩২ হিজরির ১৪ রমজান (৭৫০ খ্রিষ্টাব্দ) মুসলিম বিশ্বের রাজনৈতিক মানচিত্র চিরতরে বদলে যায়। ঐতিহাসিক ‘জাব যুদ্ধে’র চূড়ান্ত বিজয়ের পর আব্বাসীয় সেনাপতি আব্দুল্লাহ ইবনে আলীর নেতৃত্বে আব্বাসীয় বাহিনী উমাইয়াদের রাজধানী দামেস্কে প্রবেশ করে। (ইবনে কাসির, আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ১০/৪৩, ১৯৮৮)
দীর্ঘ দেড় মাস অবরোধের পর উমাইয়াদের প্রতিরক্ষা বুহ্য ভেঙে পড়ে এবং আব্বাসীয়দের কালো পতাকা দামেস্কে উড্ডীন হয়। এর মাধ্যমে দীর্ঘ ৯০ বছরের উমাইয়া শাসনের অবসান ঘটে এবং খেলাফতের কেন্দ্র সিরিয়া থেকে ইরাকে স্থানান্তরিত হয়। (সুয়ুতি, তারিখুল খুলাফা, পৃষ্ঠা ২১৫, ২০০৪)
সুলতান তুমান বাই–এর অভিষেক
৯২২ হিজরির ১৪ রমজান (১৫১৬ খ্রিষ্টাব্দ) মামলুক সাম্রাজ্যের অন্তিম লগ্নে সুলতান তুমান বাই মিসরের সিংহাসনে আরোহণ করেন। (ইবনে আসির, আল-কামিল ফিত তারিখ, ৯/১৮০, ১৯৮৭)
মারজ দাবিক যুদ্ধে সুলতান ঘৌরির মৃত্যুর পর তুমান বাই দায়িত্ব গ্রহণ করেন। অটোমান সুলতান প্রথম সেলিমের বিশাল বাহিনীর সামনে তিনি যে অদম্য প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিলেন, তা মিসরের ইতিহাসে তাঁকে এক ‘ফিদায়ি’ বা আত্মত্যাগী বীরের মর্যাদা দিয়েছে।
পরে কায়রোর রাজপথে বীরত্বপূর্ণ যুদ্ধের পর তাঁকে ‘বাব জুওয়াইলা’য় ফাঁসি দেওয়া হয়, যা মিসরে মামলুক শাসনের চূড়ান্ত সমাপ্তি ঘটায়।
নেপোলিয়নের বিরুদ্ধে আল–আজহারের প্রতিরোধ
১২১৩ হিজরির ১৪ রমজান (১৭৯৮ খ্রিষ্টাব্দ) নেপোলিয়ন বোনাপার্টের মিসর দখলের কয়েক মাস পর আজহার বিশ্ববিদ্যালয়ের নেতৃত্বে কায়রোর সাধারণ মানুষ ফরাসি বাহিনীর বিরুদ্ধে গণঅভ্যুত্থান শুরু করে
ফরাসিদের অতিরিক্ত কর এবং ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাতের প্রতিবাদে এই বিদ্রোহ ছড়িয়ে পড়ে। নেপোলিয়ন মোকাত্তাম পাহাড় থেকে আজহার মসজিদের ওপর কামানের গোলা বর্ষণ করেন এবং ফরাসি ঘোড়সওয়ার বাহিনী মসজিদের পবিত্র চত্বরে প্রবেশ করে।
এই ঘটনাটি মিসরে ফরাসি বিরোধী দীর্ঘস্থায়ী সংগ্রামের সূচনা করেছিল।
সুলতান হাসান: স্থাপত্যের অনন্য কারিগর
৭৪৮ হিজরির ১৪ রমজান (১৩৪৭ খ্রিষ্টাব্দ) সুলতান নাসির হাসান ইবনে কালাউন মাত্র ১৩ বছর বয়সে সিংহাসনে বসেন। (ইবনে কাসির, আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ১৪/২১০, ১৯৮৮)
যদিও তাঁর শাসনামল ছিল রাজনৈতিক অস্থিরতায় পূর্ণ, তবুও তিনি কায়রোতে ‘সুলতান হাসান মসজিদ ও মাদ্রাসা’ নির্মাণ করে ইতিহাস সৃষ্টি করেন। এই স্থাপনাটিকে স্থাপত্যবিদরা ‘ইসলামি স্থাপত্যের পিরামিড’ বলে অভিহিত করেন। এর বিশালতা এবং কারুকার্য আজও মামলুক যুগের শ্রেষ্ঠত্বের জানান দেয়। (ইমাম জাহাবি, সিয়ারু আলামিন নুবালা, ২৩/৩০০, ১৯৮৫)
ইমাম মারাগি ও ইবনে আতাউল্লাহ (রহ.)
১৩৬৪ হিজরির ১৪ রমজান (১৯৪৫ খ্রিষ্টাব্দ) আজহারের প্রধান শেখ মুহাম্মদ মোস্তফা আল-মারাগি ইন্তেকাল করেন। তিনি মিসরের রাজা ফারুকের অন্যায্য দাবির মুখে দাঁড়িয়ে ঘোষণা করেছিলেন, “মারাগি আল্লাহর হালাল করা বিষয়কে হারাম করার ক্ষমতা রাখে না।”
তাঁর এই আপোষহীন মনোভাব তাঁকে ইতিহাসের পাতায় অমর করে রেখেছে।
এর আগে ৭০৯ হিজরির ১৪ রমজান (১৩০৯ খ্রিষ্টাব্দ) বিদায় নেন বিখ্যাত সুফি সাধক ইবনে আতাউল্লাহ আল-ইসকান্দারি। (ইমাম জাহাবি, সিয়ারু আলামিন নুবালা, ১৯/৪৯৪, ১৯৮৫)
তাঁর কালজয়ী গ্রন্থ ‘আল-হিকাম’ আজও আধ্যাত্মিক জগতের পাথেয় হিসেবে সারা বিশ্বের দরগাহ ও মাদ্রাসাসমূহে পঠিত হয়।