পৃথিবী মুমিনের জন্য এক পরীক্ষাকেন্দ্র। এই পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে পারলেই আদমসন্তান পরকাল–জীবনে সফল হবে। তাদের ঠিকানা হবে চিরস্থায়ী জান্নাত। কিন্তু পথে তার সবচেয়ে বড় শত্রু হলো দুনিয়ার মোহ বা পার্থিব জীবনের প্রবল আকর্ষণ।
ক্ষণস্থায়ী এই জগতের জাঁকজমক মানুষকে এমনভাবে আচ্ছন্ন করে ফেলে যে তারা ভুলে যায় তার আসল গন্তব্য। ভুলে যায় আখেরাতের প্রস্তুতির কথা। তাই বনি আদমের শত্রুর তালিকায় প্রথম ও অন্যতম প্রধান হলো দুনিয়ার অলীক মোহ।
ক্ষণস্থায়ী ধোঁকার ঘর
ইসলামে প্রাত্যহিক জীবনের প্রয়োজনীয় কাজকর্ম বর্জন করতে বলা হয়নি, বরং দুনিয়াকে চূড়ান্ত লক্ষ্য বানিয়ে ফেলা এবং এর অন্ধ মোহে পড়ে আখেরাত ভুলে যাওয়াকে কঠিনভাবে সতর্ক করা হয়েছে।
পবিত্র কোরআনে আল্লাহ–তাআলা বলেন, ‘পার্থিব জীবন তো ধোঁকার সামগ্রী ছাড়া আর কিছুই নয়।’ (সুরা আলে ইমরান, আয়াত: ১৮৫)
আল্লাহর কসম, আমি তোমাদের জন্য দারিদ্র্যের আশঙ্কা করি না। বরং আমি আশঙ্কা করি যে তোমাদের কাছে দুনিয়ার প্রাচুর্য এমনভাবে আসবে, যেমন এসেছিল তোমাদের পূর্ববর্তীদের কাছে। তখন তোমরা তা লাভ করার জন্য পরস্পরে এমনভাবে প্রতিযোগিতা শুরু করবে, যেমন তারা করেছিল। আর এ ধনসম্পদ তাদের যেভাবে ধ্বংস করেছিল তোমাদেরও সেভাবেই ধ্বংস করে দেবে।সহিহ বুখারি, হাদিস: ৪০১৫
দুনিয়ার মোহ কেন মানুষের শত্রু
দুনিয়া নিজে কোনো পাপের বস্তু নয়; বরং এর প্রতি মানুষের অনিয়ন্ত্রিত ভালোবাসা ও পরকালকে ভুলে যাওয়ার প্রবণতাই একে শত্রুতে পরিণত করেছে। যে ব্যক্তি দুনিয়াকে আল্লাহর আনুগত্যের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করে, তার জন্য দুনিয়া কল্যাণকর।
কিন্তু যে তার সৌন্দর্যে মজে গিয়ে আখেরাতের পাথেয় সংগ্রহে অবহেলা করে, এই দুনিয়াই তার ধ্বংসের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। এ জন্যই পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে, ‘আর তোমরা পার্থিব জীবনকে প্রাধান্য দাও, অথচ আখেরাতই হচ্ছে উৎকৃষ্ট ও স্থায়ী।’ (সুরা আ’লা, আয়াত: ১৬-১৭)
সব পাপের মূল দুনিয়ার আকর্ষণ
আখেরাতের চেয়ে দুনিয়ার আকর্ষণ বেশি থাকা হতভাগার আলামত। এই আকর্ষণ হাজারো পাপের পথ খুলে দেয়। তখন মানুষ হালাল-হারামের সীমা অতিক্রম করতে দ্বিধা করে না।
মহানবী (সা.) সাহাবিদের দুনিয়ার আকর্ষণ সম্পর্কে সতর্ক করে বলেছেন, ‘আল্লাহর কসম, আমি তোমাদের জন্য দারিদ্র্যের আশঙ্কা করি না। বরং আমি আশঙ্কা করি যে তোমাদের কাছে দুনিয়ার প্রাচুর্য এমনভাবে আসবে, যেমন এসেছিল তোমাদের পূর্ববর্তীদের কাছে। তখন তোমরা তা লাভ করার জন্য পরস্পরে এমনভাবে প্রতিযোগিতা শুরু করবে, যেমন তারা করেছিল। আর এ ধনসম্পদ তাদের যেভাবে ধ্বংস করেছিল তোমাদেরও সেভাবেই ধ্বংস করে দেবে।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৪০১৫)
দুনিয়া হলো সেতুর মতো, যা পার হওয়ার জন্য, স্থায়ী বসতি গড়ার জন্য নয়। এখানে সুরম্য প্রাসাদ নির্মাণের স্বপ্নে বিভোর হয়ে গেলে তার শৃঙ্খলে বন্দী হওয়া ছাড়া উপায় নেই।
দুনিয়ার রঙিন পর্দা
দুনিয়ার রূপ-রস ও চটক মানুষকে পরকালের জবাবদিহি থেকে উদাসীন করে দেয়। ফলে মানুষ ক্ষণিকের সুখের জন্য অনন্তকালের চিরস্থায়ী জীবনকে বাজি ধরে বসে। বাহ্যিক এই সামান্য সুখের আশায় স্থায়ী নিবাসের মহাসুখ জলাঞ্জলি দিয়ে দেয়।
পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে, ‘পার্থিব জীবন তো খেলাধুলা ও তামাশা ছাড়া কিছুই নয়। আর যারা তাকওয়া অবলম্বন করে, তাদের জন্য আখিরাতের আবাসই উত্তম। তোমরা কি বোঝো না?’ (সুরা আনআম, আয়াত: ৩২)
আত্মরক্ষার পাথেয়
দুনিয়ার মোহ থেকে বাঁচার জন্য ইসলাম সন্ন্যাসবাদ বা সংসার ত্যাগের শিক্ষা দেয়নি। বরং দিয়েছে ‘জুহদ’ বা আসক্তিহীনতার পাঠ। বাইরে দুনিয়ার সম্পদ থাকুক কিন্তু অন্তরে যেন আল্লাহর ভালোবাসা ছাড়া আর কিছুই স্থান না পায়।
হাদিস শরিফে এসেছে, ‘এক সাহাবি রাসুলের কাছে এসে বললেন, ‘আমাকে এমন আমলের কথা বলুন, যা করলে আল্লাহ–তাআলা আমাকে ভালোবাসবেন এবং লোকেরাও আমাকে ভালোবাসবে। মহানবী (সা.) বললেন, তুমি দুনিয়ার প্রতি আসক্তিহীন হও, আল্লাহ তোমাকে ভালোবাসবেন। আর মানুষের কাছে যা আছে তার প্রতি অনাসক্ত হও, মানুষ তোমাকে ভালোবাসবে।’ (সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদিস: ৪১০২)
দুনিয়া হলো সেতুর মতো, যা পার হওয়ার জন্য, স্থায়ী বসতি গড়ার জন্য নয়। এখানে সুরম্য প্রাসাদ নির্মাণের স্বপ্নে বিভোর হয়ে গেলে তার শৃঙ্খলে বন্দী হওয়া ছাড়া উপায় নেই।
তাই বুদ্ধিমান মুমিনের কাজ হলো দুনিয়াকে আখিরাতের ফসল ফলানোর খেত হিসেবে ব্যবহার করা এবং এর চাকচিক্য ও অন্ধ মোহ থেকে নিজেকে মুক্ত রাখা।
মাহমুদ হাসান ফাহিম : শিক্ষক, বাইতুল আকরাম মসজিদ ও মাদ্রাসা কমপ্লেক্স, টঙ্গী