পবিত্র ঈদুল আজহার মূল বাণী হলো আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে নিজের ভেতরের পশুত্ব ও অহংকারকে কোরবানি করা। তবে দুঃখজনক হলেও সত্য, প্রতিবছর কোরবানির ঈদ এলে পশুর প্রতি একধরনের সামষ্টিক অসচেতনতা ও নিষ্ঠুরতা আমাদের সমাজে লক্ষ্য করা যায়।
হাটে পশুকে নির্মমভাবে পেটানো, ট্রাকে গাদাগাদি করে আনা, কিংবা জবাইয়ের সময় অপ্রয়োজনীয় কষ্ট দেওয়া—আমাদের প্রতিদিনের চিত্রে পরিণত হয়েছে। অথচ ইসলাম শুধু মানুষের প্রতি নয়, বরং অবলা পশুর প্রতিও দয়া ও মানবিক আচরণের কঠোর নির্দেশ দিয়েছে।
কোরবানির ইবাদত কবুল হওয়ার জন্য পশুর প্রতি শরিয়তি শিষ্টাচার বজায় রাখা অত্যন্ত জরুরি।
শরীর পুরোপুরি ঠাণ্ডা হচ্ছে এবং প্রাণ সম্পূর্ণভাবে চলে যাচ্ছে, ততক্ষণ পর্যন্ত তার হাত-পা কাটা বা চামড়া আলাদা করা যাবে না।
অবলা পশুর অধিকার
ইসলামের দৃষ্টিতে পশুর ওপর সাধ্যের অতিরিক্ত বোঝা চাপানো বা তাকে শারীরিক কষ্ট দেওয়া মারাত্মক গুনাহের কাজ। কোরবানি করার অর্থ এই নয় যে জবাইয়ের আগ পর্যন্ত পশুটির ওপর যেকোনো ধরনের নিষ্ঠুরতা চালানো যাবে।
রাসুল (সা.) পশুর প্রতি দয়া করার ব্যাপারে এতটাই সংবেদনশীল ছিলেন যে, তিনি একদা অভুক্ত একটি উট দেখে তার মালিককে ডেকে সতর্ক করেছিলেন। তিনি বলেছেন, “তোমরা এই নির্বাক পশুদের ব্যাপারে আল্লাহকে ভয় করো” (সুনান আবু দাউদ, হাদিস: ২৫৪৮)
সুতরাং, কোরবানির পশুকে হাটে বা বাড়িতে যত্ন সহকারে রাখা, সময়মতো খাদ্য ও আশ্রয় দেওয়া প্রতিটি মুসলিমের অন্যতম ধর্মীয় দায়িত্ব।
জবাইয়ের আগের শিষ্টাচার
কোরবানির পশুকে জবাই করার পূর্বে ছুরি ভালোভাবে ধার দিয়ে নেওয়া শরিয়তের একটি গুরুত্বপূর্ণ বিধান, যাতে পশুর কম কষ্ট হয়। ভোঁতা ছুরি দিয়ে জবাই করা বা জবাইয়ের সময় পশুকে অহেতুক টেনেহিঁচড়ে কষ্ট দেওয়া ইসলামে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ।
রাসুল (সা.) বলেছেন, “যখন তোমরা জবাই করবে, তখন উত্তম পন্থায় জবাই করো; তোমাদের প্রত্যেকে যেন তার ছুরি ধারালো করে নেয় এবং তার জবাইকৃত পশুকে আরাম দেয়।” (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১৯৫৫)
যখন তোমরা জবাই করবে, তখন উত্তম পন্থায় জবাই করো; তোমাদের প্রত্যেকে যেন তার ছুরি ধারালো করে নেয় এবং তার জবাইকৃত পশুকে আরাম দেয়।
এছাড়া এক পশুর সামনে অন্য পশুকে জবাই করা কিংবা পশুকে শোয়ানোর পর তার সামনে ছুরি ধার দেওয়াও চরম মকরুহ ও ধর্মীয় নির্দেশের পরিপন্থী। ইবনে ওমর (রা.) বলেন, “আল্লাহর রাসুল নির্দেশ দিয়েছেন যেন পশুর সামনে ছুরি ধার দেওয়া না হয় এবং একটি পশুকে অন্য পশুর আড়ালে জবাই করা হয়।” (ইবনে মাজাহ, হাদিস: ৩১৭২)
এক পশুর সামনে অন্য পশু নয়
আমাদের দেশে পাড়া-মহল্লায় বা একই বাড়ির আঙিনায় লাইনে দাঁড় করিয়ে একটি পশুর চোখের সামনে অন্য পশুকে জবাই করার দৃশ্য খুব সাধারণ। এই বিষয়টি পশুর মনে তীব্র ভয় ও মানসিক যন্ত্রণার সৃষ্টি করে, যা ইসলামের ত্যাগের মহিমার সাথে সাংঘর্ষিক।
ইসলামের বিধান হলো, একটি পশুকে অন্য পশুর সামনে জবাই করা এবং পশুর চোখের সামনে ছুরি ধার দেওয়া মকরুহ (ধর্মীয় নীতির পরিপন্থী)। (বুরহানুদ্দিন আল-মারগিনানি, আল-হেদায়া, ৪/৩৫৭, ইদারাতুল কুরআন, করাচি, ১৯৯৬)
তাই পশুকে এমন স্থানে জবাই করা উচিত যেখানে অন্য পশুদের দৃষ্টি পৌঁছায় না।
জবাইয়ের পরের শিষ্টাচার
জবাই করার পর অনেকে তাড়াহুড়ো করে পশুর চামড়া ছাড়ানো বা পা কাটার কাজ শুরু করে দেন, যা অত্যন্ত অমানবিক। যতক্ষণ না পশুর শরীর পুরোপুরি ঠাণ্ডা হচ্ছে এবং প্রাণ সম্পূর্ণভাবে চলে যাচ্ছে, ততক্ষণ পর্যন্ত তার হাত-পা কাটা বা চামড়া আলাদা করা যাবে না।
ইসলামে পশুর প্রাণ সম্পূর্ণভাবে নিস্তেজ হওয়ার আগে তার ঘাড় মটকানো বা চামড়া ছাড়ানো নিষিদ্ধ, কারণ এতে পশুকে অতিরিক্ত কষ্ট দেওয়া হয়। (ইবনুল আবিদিন, ফাতাওয়ায়ে শামি, ৬/২৯৬, দারুল ফিকর, বৈরুত, ১৯৯২)
পশুর প্রতি সর্বোচ্চ মানবিকতা ও শরিয়তি শিষ্টাচার বজায় রেখে আমাদের কোরবানিকে একটি বিশুদ্ধ ইবাদতে পরিণত করি।
পশুর প্রতি দয়া খোদাভীতির অংশ
কোরবানি কোনো যান্ত্রিক বা লৌকিক মাংস কাটার উৎসব নয়। এটি একটি আত্মিক ইবাদত, যার মূল ভিত্তি হলো দয়া, খোদাভীতি ও শিষ্টাচার। আল্লাহ-তাআলা পস্পষ্ট ঘোষণা করেছেন, “আল্লাহর কাছে পৌঁছায় না এগুলোর গোশত এবং রক্ত, বরং পৌঁছায় তোমাদের তাকওয়া।” (সুরা হজ, আয়াত: ৩৭)
পশুর প্রতি নিষ্ঠুরতা প্রদর্শন করে কখনো আল্লাহর দরবারে তাকওয়া প্রদর্শন করা সম্ভব নয়। তাই আসুন, এই ঈদে পশুর প্রতি সর্বোচ্চ মানবিকতা ও শরিয়তি শিষ্টাচার বজায় রেখে আমাদের কোরবানিকে একটি বিশুদ্ধ ইবাদতে পরিণত করি।