সৌদি আরব—ইসলামের পুণ্যভূমি। এখানে রমজান কেবল ক্যালেন্ডারের একটি মাস নয়, বরং এক আত্মিক জাগরণ। মক্কা-মদিনার পবিত্রতা আর আধুনিক শহরগুলোর ব্যস্ততা ছাপিয়ে এ সময় পুরো দেশ যেন এক বিশাল পরিবারে পরিণত হয়।
উত্তরের শীতল হাওয়ার তাবুক থেকে লোহিত সাগরের তীরের ঐতিহাসিক জেদ্দা—ভৌগোলিক দূরত্ব ঘুচিয়ে সৌদি আরবের মানুষকে এক সুতায় গেঁথে রাখে ইফতারের দস্তরখান আর পারস্পরিক সহমর্মিতা।
ইফতারে শুধু এক কাপ কফি
সৌদি আরবে ইফতার শুরু হয় সাদামাটাভাবে, যাকে স্থানীয়রা বলেন ‘ফকুক আল-রিক’ বা রোজা ভাঙার মুহূর্ত। এক গ্লাস পানি, মদিনার বিখ্যাত আজওয়া বা তাজা রুতাব খেজুর আর এক কাপ ‘গাহওয়া’।
মাগরিবের আজান পড়ার সঙ্গে সঙ্গে এই সামান্য আহার শেষে সবাই দ্রুত নামাজের জন্য মসজিদে কাতারবন্দি হন। মূল খাবার খাওয়া হয় নামাজের পর। এই পরিমিতিবোধ সৌদি সংস্কৃতির এক অনন্য বৈশিষ্ট্য।
আমির-ফকির এক কাতারে
সৌদি আরবের রমজানে সবচেয়ে উজ্জ্বল দৃশ্য হলো গণ-ইফতার। রাস্তাঘাট, মসজিদের আঙিনা কিংবা সিগন্যাল পয়েন্ট—সবখানেই থাকে ইফতারের আয়োজন।
বিশেষ করে মক্কার হারাম শরিফ আর মদিনার মসজিদে নববীর ইফতার এক ঐশ্বরিক আবহ তৈরি করে।
সেখানে ধনী-দরিদ্রের কোনো ভেদাভেদ নেই; ভিনদেশি শ্রমিক আর স্থানীয় নাগরিক একই দস্তরখানে বসে ইফতার ভাগ করে নেন।
ট্রাফিক সিগন্যালে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষের গাড়িতে ইফতার পৌঁছে দেওয়া এখানকার তরুণদের প্রিয় এক ইবাদত।
আঞ্চলিক খাবারের স্বাদ
দেশটির বিশাল ভৌগোলিক বৈচিত্র্য খাবারের টেবিলেও প্রতিফলিত হয়। উত্তরের তাবুক অঞ্চলে জনপ্রিয় ‘মনসাফ’ কিংবা মাংস ও গমের সংমিশ্রণে তৈরি ‘মারকুক’।
আবার আরবের মধ্যভাগের নাজদ অঞ্চলে রমজান মানেই ‘জোরিশ’ বা ‘হারিস’ (গম ও মাংসের বিশেষ জাউ)।
জেদ্দার মানুষ ইফতারে ‘ফাউল’ (শিমের ডাল) আর ‘তামিস’ রুটি ছাড়া ভাবতেই পারেন না। আর সারা দেশে সমান জনপ্রিয় ‘কাবসা’ (আরবি বিরিয়ানি) এবং মুচমুচে ‘সাম্বুসা’।
জেদ্দায় সমুদ্রে পাড়ের রাত
রমজানের রাতে জেদ্দার চিত্রটি এক কথায় জাদুকরী। ইউনেস্কো স্বীকৃত ঐতিহাসিক ‘আল-বালাদ’ এলাকাটি এ সময় উৎসবের নগরীতে পরিণত হয়।
৫০০ বছরের পুরনো কোরাল পাথরের তৈরি ভবনগুলোর গায়ে রঙিন আলোকসজ্জা আর বাতাসে ভাজা খাবারের ঘ্রাণ এক অন্যরকম অনুভূতি দেয়।
ইফতারের পর জেদ্দাবাসী ভিড় করেন সমুদ্রের ধারে বা ‘কর্নিশ’ এলাকায়। সেখানে সেহরি পর্যন্ত চলে পারিবারিক আড্ডা, শিশুদের খেলাধুলা আর চায়ের চুমুক।
সৌদি আরবের রমজান মানেই আতিথেয়তা আর ঐতিহ্যের মিশেল। এই মাসে ধূপের সুবাস আর আজানের ধ্বনি যেখানে মিলেমিশে একাকার হয়ে যায় এবং বড়দের শ্রদ্ধা আর ছোটদের স্নেহ জানানোর ব্যাপক রেওয়াজ দেখা যায়।